টিনের ঘরের আলো ঐশী: অভাব ডিঙিয়ে জাবির ভর্তি পরীক্ষায় মেধাতালিকায় তৃতীয়
ছবিঃ বিপ্লবীবার্তা

দুপুরের খাবার খেতে বসেছিলেন ফারহানা সুলতানা ঐশী। হঠাৎ ফোন বেজে উঠল। ওপাশ থেকে কোচিংয়ের পরিচালক জানালেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার ফল দিয়েছে। মুখের খাবার আর গলা থেকে নামলো না, দ্রুত ফোন হাতে নিয়ে অনলাইনে ফলাফল খুঁজতে শুরু করলেন। তালিকার শুরুতে নাম না দেখে বুকটা ধড়ফড় করে উঠল। কিন্তু তালিকার একদম শেষের দিকে তাকাতেই চোখ আটকে গেল। নিজের নামের পাশে জ্বলজ্বল করছে মেধাক্রম ‘০৩’।


কথাগুলো বলছিলেন যশোর সরকারি এম এম কলেজের সাবেক শিক্ষার্থী ফারহানা সুলতানা ঐশী। এবারের জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের ভর্তি পরীক্ষায় ‘ই’ ইউনিটে (বিজনেজ স্টাডিজ অনুষদ) ৩য় স্থান অধিকার করেছেন তিনি। বাবার স্বল্প আয় আর সংসারের অভাবকে জয় করে ঐশীর এই সাফল্য এখন তার গ্রামের মানুষের মুখে মুখে।


ঐশী বিপ্লবী বার্তা'কে  জানান, ফলাফলের তালিকায় নিজের মেধাক্রম দেখে ​বিশ্বাস করতে পারছিলাম না।  কয়েকবার নিজের রোল নাম্বার দেখে মিলিয়ে নিশ্চিত হয়ে আনন্দে আত্মহারা হয়ে যাই। খাবার খাওয়া শেষ না করেই প্রথমেই ফোন করলাম মাকে। আমার মা সারাক্ষণ ছায়ার মতো আমার পাশে ছিলেন। তাকেই প্রথম শোনালাম বিজয়ের এই খবর।


যশোর সদরের তরফ নওয়াপাড়া গ্রামের এক টিনশেড বাড়িতে বেড়ে ওঠা ঐশীর। বাবা মেহেদী হাসান স্থানীয় একটি দোকানের ককর্মচারী। মা রাফেজা খাতুন গৃহিণী। বাবার সামান্য আয়ে সংসার চালাতেই যেখানে হিমশিম খেতে হয়, সেখানে মেয়ের বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ার স্বপ্ন ছিল এক বড় চ্যালেঞ্জ।


​ঐশীর বাবা মেহেদী হাসান বলেন, ‘আমি সামান্য দোকানের কর্মচারী। আমার এই স্বল্প আয়ে সংসার চালাতেই অনেক কষ্ট হয়। তবে আমি সব সময় চেয়েছি মেয়েটা মানুষের মতো মানুষ হোক। আত্মীয়স্বজনরা সাহায্য করেছেন, আমিও সাধ্যমতো চেষ্টা করেছি। অনেক কষ্ট করেছি, কিন্তু মেয়ের পড়ার জন্য কখনো জমি বিক্রি বা ঋণ করতে হয়নি। আজ ওর খুশিতে আমার সব কষ্ট দূর হয়ে গেছে।’


অর্থনৈতিক অনটনের মধ্যেও ঐশী কখনো হতাশ হননি, যার মূল কারণ তার মা। ঐশী বলেন, ‘এই পুরো যাত্রায় আমার মা আমাকে সবচেয়ে বেশি মানসিক শক্তি জুগিয়েছেন। কোচিংয়ের পরীক্ষায় ভালো করলেও আমার নিজের ওপর আত্মবিশ্বাস কম ছিল। কিন্তু মা বলতেন, ‘তুমি অনেক ভালো করবে’। এডমিশনের প্রস্তুতির পুরো সময়টা মা আমাকে নিজের হাতে খাইয়ে দিতেন, যেন আমার পড়ার সময় নষ্ট না হয়।’


অর্থের অভাবে পড়াশোনা যেন বন্ধ না হয়, সেজন্য ঐশী নিজেই উদ্যোগী ছিলেন। কোচিংয়ের বইগুলো বিনামূল্যে পেয়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু খাতা-কলম বা অন্যান্য শিক্ষা উপকরণ কেনার টাকা বাবাকে দিতে হয়নি। এসএসসিতে পাওয়া বৃত্তির টাকা এবং নিজে টিউশনি করে যা পেতেন, তা দিয়েই নিজের পড়ার খরচ চালিয়েছেন তিনি। এছাড়া কলেজের শিক্ষকরাও তাকে কোনো পারিশ্রমিক ছাড়াই বাংলা ও ইংরেজি পড়িয়েছেন।​


ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি কীভাবে নিয়েছিলেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমার দিনের শুরু হতো ভোর ৫টায়। ভোরের শান্ত পরিবেশে মুখস্থ পড়াগুলো সেরে নিতাম। সকাল ১০টায় কোচিং, দুপুরে ফিরে খাওয়া-দাওয়ার পর আবার পড়তে বসা। সব মিলিয়ে দিনে ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা পড়াশোনা করতাম। কখনো ঘণ্টা মেপে পড়িনি। তবে নিয়মিত রুটিন মেনে চলেছি। লক্ষ্য ছিল একটাই, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে একটা পড়তে হবে।’


যশোর সরকারি এম এম কলেজ থেকে ২০২৫ সালে এইচএসসি পরীক্ষাতেই জিপিএ-৫ এবং ট্যালেন্টপুলসহ বৃত্তি পেয়েছেন ঐশী। ​ভবিষ্যতে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগে পড়তে চান তিনি। স্বপ্ন দেখেন পড়াশোনা শেষ করে বিসিএস দিয়ে পররাষ্ট্র ক্যাডারে যোগ দেবেন। দেশের সেবা করার পাশাপাশি ঘুচাতে চান বাবা-মায়ের সব কষ্ট।