ক্ষমতার অপব্যবহার, নিয়োগ বাণিজ্য ও দুর্নীতির মাধ্যমে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে বাংলাদেশ পুলিশের উপ-পরিদর্শক (এসআই) মোঃ মাহফুজুর রহমান মিল্টন এবং খুলনা ইস্টার্ন জুট মিলের সহকারী পাট-ক্রয় কর্মকর্তা ইমরান মোল্লার বিরুদ্ধে বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। অভিযোগে তাঁদের নামে-বেনামে বিপুল সম্পদ গড়ে তোলার দাবি করা হয়েছে। এদিকে এসব অভিযোগের পর মোল্লাহাট উপজেলার গাংনী ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য হাবিবুর রহমান হাবিবকে জড়িয়ে ‘হাবিব বাহিনী’র তাণ্ডবের অভিযোগে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে পাল্টা অভিযোগ তুলেছেন ইউপি সদস্য হাবিব।
অভিযোগকারীর দাবি, সাধারণ পুলিশ কনস্টেবল থেকে এসআই পদে উন্নীত হয়ে মিল্টন বর্তমানে বিপুল বিত্তবৈভবের মালিক হয়েছেন। তাঁর সম্পদের তালিকায় নিজ গ্রামে প্রায় এক কোটি টাকা মূল্যের বাড়ি, যশোর পুলিশ লাইনের পাশে চারতলা ভবন, প্রায় দেড় কোটি টাকা মূল্যের পাঁচ কাঠা জমি, খুলনার টুটপাড়ায় প্রায় দুই কোটি টাকা মূল্যের বাড়ি ও জমি, সোনাডাঙ্গা কেডিএ আবাসিক এলাকায় ফ্ল্যাট এবং ঢাকার বসুন্ধরা এলাকায় একটি ফ্ল্যাট রয়েছে।
এ ছাড়া তাঁর স্ত্রীর ব্যবহারের জন্য প্রায় ২০ ভরি স্বর্ণ, তাঁর নামে ড্রাগ ও ঠিকাদারি লাইসেন্স এবং বিভিন্ন ব্যবসা ও সম্পদ থাকার অভিযোগ করা হয়েছে।
অন্যদিকে ইমরান মোল্লার বিরুদ্ধে রূপসা থানার বামনডাঙ্গা বাজারে ‘সাবিহা এন্টারপ্রাইজ’ নামে রড-সিমেন্ট ও মোবাইল ব্যাংকিংয়ের তিনটি দোকান, ওই বাজারে প্রায় ২০ লাখ টাকা মূল্যের জমি, গাংনী বাজারে ইসলামী ব্যাংকের এজেন্ট শাখা ‘মোল্লা এন্টারপ্রাইজ’ এবং মোল্লাহাটে প্রায় ৩০ লাখ টাকা মূল্যের এক বিঘা জমি কেনার অভিযোগ করা হয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, অভিযুক্তরা নিজেদের নামে সম্পদ গড়ার পাশাপাশি আত্মীয়-স্বজনের নামে ব্যাংকে অর্থ, বাড়ি-জমি ও অন্যান্য সম্পদ করেছেন। একটি প্রাইভেট কার থাকার কথাও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
লিখিত অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০১৭ সালের আগস্ট থেকে ২০১৮ সালের আগস্ট পর্যন্ত যশোর পুলিশ লাইনে কর্মরত থাকার সময় এসআই মিল্টন নিয়োগ বাণিজ্যসহ বিভিন্ন অনৈতিক লেনদেনে জড়িয়েছিলেন। অন্যদিকে ইমরান মোল্লার বিরুদ্ধে খুলনা ইস্টার্ন জুট মিলে পাট ক্রয় ও সংরক্ষণে অনিয়মের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ করা হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের সত্যতা তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। অভিযোগকারীর বক্তব্য অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে।
অভিযোগকারীর পক্ষে ফাহিমুল ইসলামের স্বাক্ষরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি), দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান এবং বাগেরহাট জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত আবেদন দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। আবেদনে অভিযোগগুলোর সুষ্ঠু তদন্ত, অবৈধভাবে অর্জিত সম্পদ থাকলে তা শনাক্ত করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে।
এদিকে সম্প্রতি ‘হাবিব বাহিনী’র তাণ্ডবে খুলনা-বাগেরহাট সীমান্তবর্তী এলাকার মানুষ অতিষ্ঠ—এমন শিরোনামে একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়। ওই প্রতিবেদনে ইউপি সদস্য হাবিবুর রহমান হাবিবকে ‘হাবিব বাহিনী’র প্রধান হিসেবে উল্লেখ করে হামলা, নির্যাতন, হুমকি, বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়ে থাকা এবং তাঁর বিরুদ্ধে প্রায় ডজনখানেক মামলা ও সাধারণ ডায়েরির কথা বলা হয়।
তবে প্রকাশিত ওই সংবাদের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ইউপি সদস্য হাবিবুর রহমান হাবিব। তাঁর দাবি, ‘হাবিব বাহিনী’ নামে কোনো বাহিনী নেই। তিনি গাংনী গ্রামের বাসিন্দা এবং পরপর দুইবার ইউপি সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। স্থানীয় মানুষের সঙ্গে তাঁর সামাজিক যোগাযোগ রয়েছে। তাঁর সঙ্গে থাকা কিংবা তাঁর ডাকে সামাজিক কাজে মানুষ অংশ নিলেই সেটিকে ‘বাহিনী’ হিসেবে প্রচার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
হাবিবের দাবি, তাঁকে নিয়ে প্রকাশিত সংবাদে তাঁর বক্তব্য যথাযথভাবে তুলে ধরা হয়নি। এতে তাঁর সামাজিক ও রাজনৈতিক ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে। প্রকাশিত সংবাদের বিষয়ে তিনি আইনজীবীর মাধ্যমে নোটিশ দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলেও জানান।
ইউপি সদস্য হাবিব বলেন আমাকে জড়িয়ে প্রকাশিত সংবাদটি পরিকল্পিতভাবে করা হয়েছে বলে আমি মনে করি। ‘হাবিব বাহিনী, নামে কোনো বাহিনী নেই। আমি পরপর দুইবার ইউপি সদস্য নির্বাচিত হয়েছি। এলাকার মানুষ আমাকে ভালোবাসেন, তাই সামাজিক কাজে বা আমার ডাকে তাঁরা পাশে থাকেন। এর সঙ্গে কোনো বাহিনীর সম্পর্ক নেই। আমার বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ মিথ্যা ও বানোয়াট।
আমার সঙ্গে রাজনৈতিক বিরোধ রয়েছে। আমার দাবি, দীর্ঘদিন ধরে একটি পক্ষ রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে এলাকার মানুষকে হয়রানি করে আসছে। বর্তমানে তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ ওঠায় সেগুলো সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হচ্ছে। এখন এসব অভিযোগ থেকে দৃষ্টি সরাতে ‘হাবিব বাহিনীর গল্প সাজানো হচ্ছে বলে আমার ধারণা।
যারা বলছেন, আমার কারণে তারা গ্রামে আসতে পারেন না, তাঁদের বিষয়ে আমার বক্তব্য হলো—কেউ রাজনৈতিক মামলার কারণে দেশের বাইরে বা এলাকায় অনুপস্থিত থাকলে তার দায় আমার বা গ্রামবাসীর নয়। আমার কারণে কারও ক্ষতি হয়েছে, এমন অভিযোগের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ থাকলে তা যাচাই করা হোক।
বাড়িঘর ভাঙচুরের অভিযোগও আমি অস্বীকার করছি। আমার অভিযোগ, কয়েকজনকে দিয়ে বক্তব্য দেওয়ানো হয়েছে এবং তাঁদের প্রভাবিত করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।
আমার বিরুদ্ধে মোল্লাহাট থানায় একটি মামলা রয়েছে বলে আমি জানি। অথচ প্রকাশিত সংবাদে প্রায় ডজনখানেক মামলা থাকার কথা বলা হয়েছে। আমার বক্তব্য যথাযথভাবে প্রকাশ না করায় আমি আইনজীবীর মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যমকে নোটিশ দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছি। আমার বক্তব্য যাচাই না করে একপক্ষের অভিযোগের ভিত্তিতে সংবাদ প্রকাশ করা হলে তার প্রতিকার চাইব।
প্রকাশিত প্রতিবেদনে হাবিবের বিরুদ্ধে প্রায় ডজনখানেক মামলা ও সাধারণ ডায়েরির কথা বলা হলেও হাবিব পক্ষের দাবি, তাঁর বিরুদ্ধে প্রকৃত মামলার সংখ্যা এর চেয়ে অনেক কম। তাঁদের দাবি, মোল্লাহাট থানার তথ্য অনুযায়ী তাঁর বিরুদ্ধে তিনটি মামলা রয়েছে।
তবে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) ও মামলা এক বিষয় নয়। মামলার প্রকৃত সংখ্যা, ধারা এবং বর্তমান অবস্থা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট থানার নথি যাচাই প্রয়োজন।
হাবিব পক্ষের লোকজন বাড়িঘর ভাঙচুরের অভিযোগও অস্বীকার করেছেন। তাঁদের দাবি, বিভিন্ন বক্তব্যে বাড়িঘর ভাঙচুরের যে চিত্র তুলে ধরা হয়েছে, বাস্তবতার সঙ্গে তার মিল নেই।
অন্যদিকে স্থানীয় আরেক পক্ষের দাবি, একটি পুরোনো দোকান ও স্থাপনা ভাঙচুর করা হয়েছে। তাঁদের ভাষ্য, স্থাপনাটি দীর্ঘদিন ধরে ওবায়দুল মোল্লার রাইস মিল হিসেবে ব্যবহৃত হতো। পরে সেটি ভেঙে সেখানে টিনশেড নির্মাণ করা হয়েছে।
ওবায়দুল মোল্লা বলেন, পুরোনো দোকানটি প্রায় ২০ থেকে ২৫ বছর ধরে রাইস মিল হিসেবে ব্যবহৃত হতো। আমাদের অভিযোগ, স্থাপনাটি ভেঙে সেখানে টিনশেড নির্মাণ করা হয়েছে। ঘটনাস্থলে এখনো ভাঙচুরের চিহ্ন রয়েছে। বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটনের দাবি জানাই।
এ অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে ঘটনাস্থলের আলামত, পুরোনো ও বর্তমান ছবি, জমি ও স্থাপনার কাগজপত্র এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয় বাসিন্দা কালাম শেখ বলেন, আমি এই গ্রামেরই মানুষ। ‘হাবিব বাহিনী’ নামে কোনো বাহিনী আছে, এমন কথা আগে কখনো শুনিনি। প্রকাশিত ভিডিও ও সাক্ষাৎকার দেখে অবাক হয়েছি। আমার জানামতে, এখানে এ নামে কোনো বাহিনী নেই।
নারী ইউপি সদস্য আছিয়া বেগম বলেন, হাবিবের জনপ্রিয়তা রয়েছে, এলাকার মানুষ তাঁকে ভালোবাসেন। তিনি দুইবার ইউপি সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। তাঁর সঙ্গে মানুষের চলাফেরা ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণকে ‘বাহিনী’ হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে বলে আমি মনে করি। হাবিবের কারণে নয়, বরং অন্য পক্ষের বিরোধের কারণে অনেক সমস্যা তৈরি হয়েছে বলে আমার দাবি।
হাবিব পক্ষের অভিযোগ, এসআই মিল্টন ও ইমরান মোল্লার বিরুদ্ধে সম্পদ ও দুর্নীতির অভিযোগ তুলে সরকারি দপ্তরে আবেদন করার পরই হাবিবকে ‘বাহিনীপ্রধান’ হিসেবে উপস্থাপন করে সংবাদ প্রকাশ করা হয়েছে। তাঁদের দাবি, দুর্নীতির অভিযোগ আড়াল করা এবং হাবিবের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার উদ্দেশ্যেই এ ধরনের প্রচারণা চালানো হচ্ছে।
তবে দুর্নীতির অভিযোগ এবং হাবিব বাহিনী সংক্রান্ত সংবাদ-এই দুটি ঘটনার মধ্যে সরাসরি যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা সঠিক ভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
স্থানীয়দের একাংশের দাবি, দুর্নীতির অভিযোগ, সম্পদের হিসাব, হাবিবের বিরুদ্ধে করা মামলা এবং ‘হাবিব বাহিনী’র অভিযোগ-সবকিছু নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হোক। অভিযোগগুলো সত্য হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি অবৈধ সম্পদ থাকলে তা আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
অন্যদিকে হাবিব পক্ষের দাবি, কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য, মামলা-সংক্রান্ত নথি এবং সরকারি তথ্য যাচাই করা উচিত।
অভিযোগের বিষয়ে ইমরান মোল্লার সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি রিসিভ করেননি।
এ বিষয়ে মোল্লাহাট থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোঃ শাহাদাৎ হোসেন বলেন, হাবিব বাহিনী নামে কোনো বাহিনী আছে, এমন কোনো তথ্য আমাদের কাছে নেই। তাঁর বিরুদ্ধে পূর্বের তিনটি মামলা আছে। আদার্স সেকশনে সেটা আমরা খোঁজখবর নিচ্ছি। থানায় ওরকম কোনো মামলা হয়নি আমার জানা মতে।

সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১২ অক্টোবর ২০২৬
ক্ষমতার অপব্যবহার, নিয়োগ বাণিজ্য ও দুর্নীতির মাধ্যমে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে বাংলাদেশ পুলিশের উপ-পরিদর্শক (এসআই) মোঃ মাহফুজুর রহমান মিল্টন এবং খুলনা ইস্টার্ন জুট মিলের সহকারী পাট-ক্রয় কর্মকর্তা ইমরান মোল্লার বিরুদ্ধে বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। অভিযোগে তাঁদের নামে-বেনামে বিপুল সম্পদ গড়ে তোলার দাবি করা হয়েছে। এদিকে এসব অভিযোগের পর মোল্লাহাট উপজেলার গাংনী ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য হাবিবুর রহমান হাবিবকে জড়িয়ে ‘হাবিব বাহিনী’র তাণ্ডবের অভিযোগে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে পাল্টা অভিযোগ তুলেছেন ইউপি সদস্য হাবিব।
অভিযোগকারীর দাবি, সাধারণ পুলিশ কনস্টেবল থেকে এসআই পদে উন্নীত হয়ে মিল্টন বর্তমানে বিপুল বিত্তবৈভবের মালিক হয়েছেন। তাঁর সম্পদের তালিকায় নিজ গ্রামে প্রায় এক কোটি টাকা মূল্যের বাড়ি, যশোর পুলিশ লাইনের পাশে চারতলা ভবন, প্রায় দেড় কোটি টাকা মূল্যের পাঁচ কাঠা জমি, খুলনার টুটপাড়ায় প্রায় দুই কোটি টাকা মূল্যের বাড়ি ও জমি, সোনাডাঙ্গা কেডিএ আবাসিক এলাকায় ফ্ল্যাট এবং ঢাকার বসুন্ধরা এলাকায় একটি ফ্ল্যাট রয়েছে।
এ ছাড়া তাঁর স্ত্রীর ব্যবহারের জন্য প্রায় ২০ ভরি স্বর্ণ, তাঁর নামে ড্রাগ ও ঠিকাদারি লাইসেন্স এবং বিভিন্ন ব্যবসা ও সম্পদ থাকার অভিযোগ করা হয়েছে।
অন্যদিকে ইমরান মোল্লার বিরুদ্ধে রূপসা থানার বামনডাঙ্গা বাজারে ‘সাবিহা এন্টারপ্রাইজ’ নামে রড-সিমেন্ট ও মোবাইল ব্যাংকিংয়ের তিনটি দোকান, ওই বাজারে প্রায় ২০ লাখ টাকা মূল্যের জমি, গাংনী বাজারে ইসলামী ব্যাংকের এজেন্ট শাখা ‘মোল্লা এন্টারপ্রাইজ’ এবং মোল্লাহাটে প্রায় ৩০ লাখ টাকা মূল্যের এক বিঘা জমি কেনার অভিযোগ করা হয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, অভিযুক্তরা নিজেদের নামে সম্পদ গড়ার পাশাপাশি আত্মীয়-স্বজনের নামে ব্যাংকে অর্থ, বাড়ি-জমি ও অন্যান্য সম্পদ করেছেন। একটি প্রাইভেট কার থাকার কথাও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
লিখিত অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০১৭ সালের আগস্ট থেকে ২০১৮ সালের আগস্ট পর্যন্ত যশোর পুলিশ লাইনে কর্মরত থাকার সময় এসআই মিল্টন নিয়োগ বাণিজ্যসহ বিভিন্ন অনৈতিক লেনদেনে জড়িয়েছিলেন। অন্যদিকে ইমরান মোল্লার বিরুদ্ধে খুলনা ইস্টার্ন জুট মিলে পাট ক্রয় ও সংরক্ষণে অনিয়মের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ করা হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের সত্যতা তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। অভিযোগকারীর বক্তব্য অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে।
অভিযোগকারীর পক্ষে ফাহিমুল ইসলামের স্বাক্ষরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি), দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান এবং বাগেরহাট জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত আবেদন দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। আবেদনে অভিযোগগুলোর সুষ্ঠু তদন্ত, অবৈধভাবে অর্জিত সম্পদ থাকলে তা শনাক্ত করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে।
এদিকে সম্প্রতি ‘হাবিব বাহিনী’র তাণ্ডবে খুলনা-বাগেরহাট সীমান্তবর্তী এলাকার মানুষ অতিষ্ঠ—এমন শিরোনামে একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়। ওই প্রতিবেদনে ইউপি সদস্য হাবিবুর রহমান হাবিবকে ‘হাবিব বাহিনী’র প্রধান হিসেবে উল্লেখ করে হামলা, নির্যাতন, হুমকি, বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়ে থাকা এবং তাঁর বিরুদ্ধে প্রায় ডজনখানেক মামলা ও সাধারণ ডায়েরির কথা বলা হয়।
তবে প্রকাশিত ওই সংবাদের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ইউপি সদস্য হাবিবুর রহমান হাবিব। তাঁর দাবি, ‘হাবিব বাহিনী’ নামে কোনো বাহিনী নেই। তিনি গাংনী গ্রামের বাসিন্দা এবং পরপর দুইবার ইউপি সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। স্থানীয় মানুষের সঙ্গে তাঁর সামাজিক যোগাযোগ রয়েছে। তাঁর সঙ্গে থাকা কিংবা তাঁর ডাকে সামাজিক কাজে মানুষ অংশ নিলেই সেটিকে ‘বাহিনী’ হিসেবে প্রচার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
হাবিবের দাবি, তাঁকে নিয়ে প্রকাশিত সংবাদে তাঁর বক্তব্য যথাযথভাবে তুলে ধরা হয়নি। এতে তাঁর সামাজিক ও রাজনৈতিক ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে। প্রকাশিত সংবাদের বিষয়ে তিনি আইনজীবীর মাধ্যমে নোটিশ দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলেও জানান।
ইউপি সদস্য হাবিব বলেন আমাকে জড়িয়ে প্রকাশিত সংবাদটি পরিকল্পিতভাবে করা হয়েছে বলে আমি মনে করি। ‘হাবিব বাহিনী, নামে কোনো বাহিনী নেই। আমি পরপর দুইবার ইউপি সদস্য নির্বাচিত হয়েছি। এলাকার মানুষ আমাকে ভালোবাসেন, তাই সামাজিক কাজে বা আমার ডাকে তাঁরা পাশে থাকেন। এর সঙ্গে কোনো বাহিনীর সম্পর্ক নেই। আমার বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ মিথ্যা ও বানোয়াট।
আমার সঙ্গে রাজনৈতিক বিরোধ রয়েছে। আমার দাবি, দীর্ঘদিন ধরে একটি পক্ষ রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে এলাকার মানুষকে হয়রানি করে আসছে। বর্তমানে তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ ওঠায় সেগুলো সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হচ্ছে। এখন এসব অভিযোগ থেকে দৃষ্টি সরাতে ‘হাবিব বাহিনীর গল্প সাজানো হচ্ছে বলে আমার ধারণা।
যারা বলছেন, আমার কারণে তারা গ্রামে আসতে পারেন না, তাঁদের বিষয়ে আমার বক্তব্য হলো—কেউ রাজনৈতিক মামলার কারণে দেশের বাইরে বা এলাকায় অনুপস্থিত থাকলে তার দায় আমার বা গ্রামবাসীর নয়। আমার কারণে কারও ক্ষতি হয়েছে, এমন অভিযোগের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ থাকলে তা যাচাই করা হোক।
বাড়িঘর ভাঙচুরের অভিযোগও আমি অস্বীকার করছি। আমার অভিযোগ, কয়েকজনকে দিয়ে বক্তব্য দেওয়ানো হয়েছে এবং তাঁদের প্রভাবিত করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।
আমার বিরুদ্ধে মোল্লাহাট থানায় একটি মামলা রয়েছে বলে আমি জানি। অথচ প্রকাশিত সংবাদে প্রায় ডজনখানেক মামলা থাকার কথা বলা হয়েছে। আমার বক্তব্য যথাযথভাবে প্রকাশ না করায় আমি আইনজীবীর মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যমকে নোটিশ দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছি। আমার বক্তব্য যাচাই না করে একপক্ষের অভিযোগের ভিত্তিতে সংবাদ প্রকাশ করা হলে তার প্রতিকার চাইব।
প্রকাশিত প্রতিবেদনে হাবিবের বিরুদ্ধে প্রায় ডজনখানেক মামলা ও সাধারণ ডায়েরির কথা বলা হলেও হাবিব পক্ষের দাবি, তাঁর বিরুদ্ধে প্রকৃত মামলার সংখ্যা এর চেয়ে অনেক কম। তাঁদের দাবি, মোল্লাহাট থানার তথ্য অনুযায়ী তাঁর বিরুদ্ধে তিনটি মামলা রয়েছে।
তবে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) ও মামলা এক বিষয় নয়। মামলার প্রকৃত সংখ্যা, ধারা এবং বর্তমান অবস্থা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট থানার নথি যাচাই প্রয়োজন।
হাবিব পক্ষের লোকজন বাড়িঘর ভাঙচুরের অভিযোগও অস্বীকার করেছেন। তাঁদের দাবি, বিভিন্ন বক্তব্যে বাড়িঘর ভাঙচুরের যে চিত্র তুলে ধরা হয়েছে, বাস্তবতার সঙ্গে তার মিল নেই।
অন্যদিকে স্থানীয় আরেক পক্ষের দাবি, একটি পুরোনো দোকান ও স্থাপনা ভাঙচুর করা হয়েছে। তাঁদের ভাষ্য, স্থাপনাটি দীর্ঘদিন ধরে ওবায়দুল মোল্লার রাইস মিল হিসেবে ব্যবহৃত হতো। পরে সেটি ভেঙে সেখানে টিনশেড নির্মাণ করা হয়েছে।
ওবায়দুল মোল্লা বলেন, পুরোনো দোকানটি প্রায় ২০ থেকে ২৫ বছর ধরে রাইস মিল হিসেবে ব্যবহৃত হতো। আমাদের অভিযোগ, স্থাপনাটি ভেঙে সেখানে টিনশেড নির্মাণ করা হয়েছে। ঘটনাস্থলে এখনো ভাঙচুরের চিহ্ন রয়েছে। বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটনের দাবি জানাই।
এ অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে ঘটনাস্থলের আলামত, পুরোনো ও বর্তমান ছবি, জমি ও স্থাপনার কাগজপত্র এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয় বাসিন্দা কালাম শেখ বলেন, আমি এই গ্রামেরই মানুষ। ‘হাবিব বাহিনী’ নামে কোনো বাহিনী আছে, এমন কথা আগে কখনো শুনিনি। প্রকাশিত ভিডিও ও সাক্ষাৎকার দেখে অবাক হয়েছি। আমার জানামতে, এখানে এ নামে কোনো বাহিনী নেই।
নারী ইউপি সদস্য আছিয়া বেগম বলেন, হাবিবের জনপ্রিয়তা রয়েছে, এলাকার মানুষ তাঁকে ভালোবাসেন। তিনি দুইবার ইউপি সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। তাঁর সঙ্গে মানুষের চলাফেরা ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণকে ‘বাহিনী’ হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে বলে আমি মনে করি। হাবিবের কারণে নয়, বরং অন্য পক্ষের বিরোধের কারণে অনেক সমস্যা তৈরি হয়েছে বলে আমার দাবি।
হাবিব পক্ষের অভিযোগ, এসআই মিল্টন ও ইমরান মোল্লার বিরুদ্ধে সম্পদ ও দুর্নীতির অভিযোগ তুলে সরকারি দপ্তরে আবেদন করার পরই হাবিবকে ‘বাহিনীপ্রধান’ হিসেবে উপস্থাপন করে সংবাদ প্রকাশ করা হয়েছে। তাঁদের দাবি, দুর্নীতির অভিযোগ আড়াল করা এবং হাবিবের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার উদ্দেশ্যেই এ ধরনের প্রচারণা চালানো হচ্ছে।
তবে দুর্নীতির অভিযোগ এবং হাবিব বাহিনী সংক্রান্ত সংবাদ-এই দুটি ঘটনার মধ্যে সরাসরি যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা সঠিক ভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
স্থানীয়দের একাংশের দাবি, দুর্নীতির অভিযোগ, সম্পদের হিসাব, হাবিবের বিরুদ্ধে করা মামলা এবং ‘হাবিব বাহিনী’র অভিযোগ-সবকিছু নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হোক। অভিযোগগুলো সত্য হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি অবৈধ সম্পদ থাকলে তা আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
অন্যদিকে হাবিব পক্ষের দাবি, কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য, মামলা-সংক্রান্ত নথি এবং সরকারি তথ্য যাচাই করা উচিত।
অভিযোগের বিষয়ে ইমরান মোল্লার সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি রিসিভ করেননি।
এ বিষয়ে মোল্লাহাট থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোঃ শাহাদাৎ হোসেন বলেন, হাবিব বাহিনী নামে কোনো বাহিনী আছে, এমন কোনো তথ্য আমাদের কাছে নেই। তাঁর বিরুদ্ধে পূর্বের তিনটি মামলা আছে। আদার্স সেকশনে সেটা আমরা খোঁজখবর নিচ্ছি। থানায় ওরকম কোনো মামলা হয়নি আমার জানা মতে।

আপনার মতামত লিখুন