৪০ কোটি টাকার পানি প্রকল্প সচলের আশ্বাস, ১৪ দিনের মাথায় পচা দিঘিতে ফের বড়শি উৎসব
বাগেরহাট
পৌরবাসীর সুপেয় পানির সংকট নিরসনে প্রায় ৪০ কোটি টাকা
ব্যয়ে নির্মিত সারফেস ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট দীর্ঘদিন ধরে অচল পড়ে আছে। প্রকল্পটি সচল করতে উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছিলেন জেলা প্রশাসক। তবে সেই আশ্বাসের পরও প্রকল্প চালুর দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি। এরই মধ্যে পানি সরবরাহ প্রকল্পের জলাধার হিসেবে ব্যবহারের কথা থাকা পচা দিঘিতে ১৪ দিনের মাথায়
আবারও শুরু হয়েছে বড়শি দিয়ে মাছ শিকারের আয়োজন।বৃহস্পতিবার
(১৭ সেপ্টেম্বর) দুপুর থেকে শুরু হওয়া এ আয়োজন চলবে
শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যা
পর্যন্ত। আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, এবার ৩৭টি সাধারণ ঘাটে প্রতি ঘাটে ১৭ হাজার টাকা
করে নেওয়া হয়েছে। এর বাইরে আরও
১০টি ‘’
ঘাট রয়েছে বলে জানা গেছে। ফলে এবারের আয়োজনেও উল্লেখযোগ্য অঙ্কের অর্থ লেনদেন হচ্ছে।এর
আগে গত ৩ ও
৪ সেপ্টেম্বর দুই দিনব্যাপী বড়শি দিয়ে মাছ শিকারের আয়োজন করা হয়েছিল। তখন দিঘির চারপাশে ১০৮টি ঘাটে মাছ শিকারের ব্যবস্থা করা হয় এবং প্রতিটি
ঘাটের জন্য ২৫ হাজার টাকা
করে নেওয়া হয়েছিল। আয়োজকদের দাবি, দুই দিনে শত মণের বেশি
বিভিন্ন প্রজাতির মাছ শিকার করেন সৌখিন মাছ শিকারিরা। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে মাছ শিকারিরা এ আয়োজনে অংশ
নেন।এর
মাত্র ১৪ দিনের মাথায়
আবারও একই দিঘিতে বড়শি দিয়ে মাছ শিকারের আয়োজন হওয়ায় পানি সরবরাহ প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।প্রকল্প
সূত্রে জানা যায়, প্রায় ৪০ কোটি টাকা
ব্যয়ে নির্মিত সারফেস ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্টের নির্মাণকাজ ২০২১ সালের জুনে শেষ হয়। এরপর কয়েক মাস পরীক্ষামূলকভাবে পানি সরবরাহ করা হলেও পরে প্রকল্পটির কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। দীর্ঘদিন অচল থাকায় ওভারহেড ট্যাংক, পাম্প হাউস, পাইপলাইন ও ট্রিটমেন্ট প্লান্টসহ
বিভিন্ন অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।পরিকল্পনা
অনুযায়ী, ভৈরব নদ থেকে প্রায়
চার কিলোমিটার পাইপলাইনের মাধ্যমে পানি এনে পচা দিঘিতে সংরক্ষণ করার কথা ছিল। পরে ওই পানি ট্রিটমেন্ট
প্লান্টে পরিশোধন করে ওভারহেড ট্যাংকের মাধ্যমে বাগেরহাট পৌর এলাকার বিভিন্ন ওয়ার্ডে সরবরাহ করার কথা। কিন্তু প্রকল্প বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হয়নি।সরেজমিনে
দেখা যায়, দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা পানি প্রকল্পের বিভিন্ন স্থাপনা অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে। পাম্প হাউসের একটি অংশের চাল ও জানালা ক্ষতিগ্রস্ত।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নিরাপত্তার অভাবে প্রকল্পের ভেতরের বৈদ্যুতিক তার, জেনারেটরের তার, পাম্পের তারসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম চুরি হয়ে গেছে।স্থানীয়
বাসিন্দা আব্দুল সালাম তালুকদার বলেন,এই পাম্পের তো
সবকিছু চোরে নিয়ে গেছে। ভেতরের জেনারেটরের তার নেই, পাম্পের তার নেই, সার্ভিস লাইনের তারও নেই। বহুদিন ধরে এটি বন্ধ পড়ে আছে। ঘরের চাল নেই, পেছনের জানালা ভাঙা। তাই চোর ঢুকে সব নিয়ে যায়।সরেজমিনে
দিঘির পানিতে পলিথিন, খাবারের প্যাকেট, সিগারেটের প্যাকেট, পানির বোতল, ওয়ানটাইম প্লেটসহ বিভিন্ন ধরনেরবর্জ্য ভাসতে দেখা যায়। স্থানীয়দের অভিযোগ, মাছ চাষ ও বড়শি দিয়ে
মাছ শিকারের কারণে দিঘির পানির স্বাভাবিক গুণাগুণ নষ্ট হচ্ছে।নাম
প্রকাশে অনিচ্ছুক এক স্থানীয় বাসিন্দা
বলেন, আগে পানিতে মাছ দেখা যেত, পানি এত পরিষ্কার ছিল।
এখন পানিতে গন্ধ থাকায় রান্না করতে পারি না। কিছুদিন আগে এখানে বড়শি দিয়ে মাছ ধরা হয়েছে। এরপর পানি পরিষ্কারের জন্য চুন বা প্রয়োজনীয় কোনো
ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।স্থানীয়দের
আরও অভিযোগ, দিঘিটি দীর্ঘমেয়াদি ইজারা দেওয়ার কারণে পানি সরবরাহ প্রকল্পের কাজে ব্যবহার করা যাচ্ছে না। তারা দ্রুত প্রকল্পটি চালু করে দিঘিটিকে পানি সরবরাহের কাজে ব্যবহারের উপযোগী করার দাবি জানিয়েছেন।পচা
দিঘির ইজারাদার ও আওয়ামী লীগ
নেতা মোঃ আলমগীর হোসেন দিঘির পানিতে সার, কীটনাশক বা ক্ষতিকর কোনো
রাসায়নিক ব্যবহারের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।তিনি
বলেন,এখানে সরকার যদি ওয়াটার প্লান্ট করে, তাহলে আমাদের যারা আছি আমরাও চলে যাব। আমরা আসলে এখানে পানির কোনো ক্ষতি করি না। কোনো কেমিক্যাল ব্যবহার করি না। প্রতিবছর সরকার ২১ লাখ টাকা
রেভিনিউ নেয় এখানে মৎস্য চাষ করার জন্য। সরকার যদি আমাদের চুক্তি বাতিল করে, আমরা চলে যাব।”তিনি
আরও বলেন, পানি সরবরাহ প্রকল্প বাস্তবায়নে সরকার সিদ্ধান্ত নিলে ইজারাদার হিসেবে তারা দিঘি ছেড়ে দিতে প্রস্তুত।এর
আগে বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে বাগেরহাট জেলা প্রশাসক গোলাম মোঃ বাতেন বলেন ,পচা দিঘিটি ছয় বছরের জন্য
ইজারা দেওয়া হয়েছে। তবে পৌরসভার পানি সরবরাহ প্রকল্প চালুর স্বার্থে ইজারার মেয়াদ কমিয়ে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে।পৌরসভার একটি প্রকল্প আছে। সেটির জন্য ইজারার মেয়াদ কমিয়ে আনা গেলে প্রকল্পটি শুরু করা যাবে। কিন্তু সেখানে যিনি ইজারাদার আছেন তার কাছ থেকে আসলে সহায়তা পাওয়া যাচ্ছে না। পরে আমি কথা বলে দেখব বিষয়টি।জেলা
প্রশাসকের এমন বক্তব্যের পরও ১৪ দিনের মাথায়
একই দিঘিতে আবারও বড়শি দিয়ে মাছ শিকারের আয়োজন হওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে—প্রায় ৪০ কোটি টাকা
ব্যয়ে নির্মিত পানি প্রকল্পটি কবে চালু হবে এবং পানি সংরক্ষণের জন্য নির্ধারিত পচা দিঘিটি কবে প্রকল্পের কাজে ফিরবে?পৌরবাসীর
দাবি, প্রকল্পটির বর্তমান অবস্থা দ্রুত কারিগরি মূল্যায়ন করে প্রয়োজনীয় সংস্কার করতে হবে। একই সঙ্গে পচা দিঘির ইজারা ও ব্যবহার পুনর্বিবেচনা
করে এটিকে পানি সরবরাহ প্রকল্পের উপযোগী রাখতে হবে। দীর্ঘদিনের সুপেয় পানির সংকট নিরসনে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ চান তারা।