দৃশ্যটি দেখে মনে হতে পারে আশি কিংবা নব্বই দশকের কোনো ছবি। কিন্তু এটি ২০২৬ সালের অক্টোবরের দৃশ্য। স্মার্টফোন, ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগেও কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ীতে টেলিভিশন ঘিরে গ্রামবাসীর আড্ডার পুরোনো অভ্যাস এখনো টিকে আছে।
উপজেলার নাওডাঙ্গা ইউনিয়নের প্রত্যন্ত পূর্বফুলমতি গ্রামের একটি পাড়ার দোকানে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামতেই দেখা মেলে এমন চিত্রের। স্থানীয় ১০ থেকে ১২ জন মানুষ দোকানে বসে টেলিভিশনে বিভিন্ন অনুষ্ঠান দেখছেন। কেউ মনোযোগ দিয়ে সিনেমা-নাটক দেখছেন, আবার কেউ অনুষ্ঠান দেখার ফাঁকে গল্প-আড্ডায় মেতে উঠছেন। দিনের কাজ শেষে চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে তাঁদের এই সময় কাটানোয় ফিরে আসে গ্রামবাংলার চিরচেনা পরিবেশ।
পূর্বফুলমতি গ্রামের কৃষক গোলাম রব্বানী (৬৫) ও হযরত আলী (৬০) জানান, সারাদিনের কাজ শেষে তাঁরা বাড়ির পাশের ছোরাফ আলীর দোকানে এসে চা-বিস্কুট খান এবং টেলিভিশনে পুরোনো দিনের সিনেমা ও নাটক দেখেন। কখনো রাত ৮টা, আবার কখনো ৯টা পর্যন্ত চলে তাঁদের আড্ডা।
তাঁরা বলেন, “মোবাইল আছে, তবে ছেলে ও নাতিরাই বেশি ব্যবহার করে। মোবাইলে অনুষ্ঠান দেখলে তেমন তৃপ্তি পাই না। এখানে ১০-১২ জন একসঙ্গে বসে টেলিভিশন দেখি। পাশাপাশি গল্প করি, একে অন্যের সুখ-দুঃখের কথা ভাগাভাগি করি। এতে খুব ভালো লাগে।
বালাতাড়ি এলাকার কাসেম আলী (৫৮) বলেন, বাড়িতে টেলিভিশন থাকলেও একা দেখার চেয়ে দোকানে পরিচিত সবার সঙ্গে বসে খেলা, সিনেমা, নাটক ও খবর দেখতে বেশি আনন্দ লাগে। কুরুষাফেরুষা এলাকার হযরত আলী (৫০) বলেন, মোবাইল ফোনে সবাই নিজের মতো ব্যস্ত থাকেন। কিন্তু টেলিভিশন দেখতে বসলে একসঙ্গে অনুষ্ঠান উপভোগ ও আলোচনা করা যায়।
দোকানমালিক ছোরাফ আলী (৫৩) জানান, প্রতিদিন সকাল ৬টায় দোকান খোলেন এবং রাত ১০টার দিকে বন্ধ করেন। বিকেল ৫টার পর লোকসমাগম বাড়তে থাকে। সন্ধ্যায় দোকানটি প্রায় ভরে যায়। প্রতিদিন গড়ে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকার বেচাকেনা হয় তাঁর। চা-বিস্কুট বিক্রির পাশাপাশি টেলিভিশন ঘিরে মানুষের আড্ডা তাঁর দোকানের আলাদা পরিচয় হয়ে উঠেছে।
ফুলবাড়ীর জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক আমিনুল ইসলাম বলেন, একসময় সন্ধ্যার পর পাড়া-মহল্লায় ২০-৩০ জন মানুষ একসঙ্গে আড্ডা দিতেন। রাত ৮টার দিকে দলবেঁধে কারও বাড়িতে গিয়ে সাদা-কালো টেলিভিশনে ‘ইত্যাদি’, ‘আলিফ লায়লা’সহ জনপ্রিয় অনুষ্ঠান দেখতেন। এখন সেই সংস্কৃতি অনেকটাই হারিয়ে গেলেও প্রত্যন্ত এলাকায় এর কিছুটা অস্তিত্ব রয়েছে।
নাওডাঙ্গা স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ আব্দুল হানিফ সরকার বলেন, স্মার্টফোনের ব্যাপক ব্যবহারে সম্মিলিত আড্ডা কমে গেছে। তবে প্রবীণ ও খেটে খাওয়া মানুষের একসঙ্গে বসে টেলিভিশন দেখা সামাজিক বন্ধনেরই বহিঃপ্রকাশ। তাঁদের এ অভ্যাস গ্রামীণ সম্প্রীতির ঐতিহ্যকে এখনো বাঁচিয়ে রেখেছে।

শুক্রবার, ০৯ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৯ অক্টোবর ২০২৬
দৃশ্যটি দেখে মনে হতে পারে আশি কিংবা নব্বই দশকের কোনো ছবি। কিন্তু এটি ২০২৬ সালের অক্টোবরের দৃশ্য। স্মার্টফোন, ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগেও কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ীতে টেলিভিশন ঘিরে গ্রামবাসীর আড্ডার পুরোনো অভ্যাস এখনো টিকে আছে।
উপজেলার নাওডাঙ্গা ইউনিয়নের প্রত্যন্ত পূর্বফুলমতি গ্রামের একটি পাড়ার দোকানে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামতেই দেখা মেলে এমন চিত্রের। স্থানীয় ১০ থেকে ১২ জন মানুষ দোকানে বসে টেলিভিশনে বিভিন্ন অনুষ্ঠান দেখছেন। কেউ মনোযোগ দিয়ে সিনেমা-নাটক দেখছেন, আবার কেউ অনুষ্ঠান দেখার ফাঁকে গল্প-আড্ডায় মেতে উঠছেন। দিনের কাজ শেষে চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে তাঁদের এই সময় কাটানোয় ফিরে আসে গ্রামবাংলার চিরচেনা পরিবেশ।
পূর্বফুলমতি গ্রামের কৃষক গোলাম রব্বানী (৬৫) ও হযরত আলী (৬০) জানান, সারাদিনের কাজ শেষে তাঁরা বাড়ির পাশের ছোরাফ আলীর দোকানে এসে চা-বিস্কুট খান এবং টেলিভিশনে পুরোনো দিনের সিনেমা ও নাটক দেখেন। কখনো রাত ৮টা, আবার কখনো ৯টা পর্যন্ত চলে তাঁদের আড্ডা।
তাঁরা বলেন, “মোবাইল আছে, তবে ছেলে ও নাতিরাই বেশি ব্যবহার করে। মোবাইলে অনুষ্ঠান দেখলে তেমন তৃপ্তি পাই না। এখানে ১০-১২ জন একসঙ্গে বসে টেলিভিশন দেখি। পাশাপাশি গল্প করি, একে অন্যের সুখ-দুঃখের কথা ভাগাভাগি করি। এতে খুব ভালো লাগে।
বালাতাড়ি এলাকার কাসেম আলী (৫৮) বলেন, বাড়িতে টেলিভিশন থাকলেও একা দেখার চেয়ে দোকানে পরিচিত সবার সঙ্গে বসে খেলা, সিনেমা, নাটক ও খবর দেখতে বেশি আনন্দ লাগে। কুরুষাফেরুষা এলাকার হযরত আলী (৫০) বলেন, মোবাইল ফোনে সবাই নিজের মতো ব্যস্ত থাকেন। কিন্তু টেলিভিশন দেখতে বসলে একসঙ্গে অনুষ্ঠান উপভোগ ও আলোচনা করা যায়।
দোকানমালিক ছোরাফ আলী (৫৩) জানান, প্রতিদিন সকাল ৬টায় দোকান খোলেন এবং রাত ১০টার দিকে বন্ধ করেন। বিকেল ৫টার পর লোকসমাগম বাড়তে থাকে। সন্ধ্যায় দোকানটি প্রায় ভরে যায়। প্রতিদিন গড়ে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকার বেচাকেনা হয় তাঁর। চা-বিস্কুট বিক্রির পাশাপাশি টেলিভিশন ঘিরে মানুষের আড্ডা তাঁর দোকানের আলাদা পরিচয় হয়ে উঠেছে।
ফুলবাড়ীর জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক আমিনুল ইসলাম বলেন, একসময় সন্ধ্যার পর পাড়া-মহল্লায় ২০-৩০ জন মানুষ একসঙ্গে আড্ডা দিতেন। রাত ৮টার দিকে দলবেঁধে কারও বাড়িতে গিয়ে সাদা-কালো টেলিভিশনে ‘ইত্যাদি’, ‘আলিফ লায়লা’সহ জনপ্রিয় অনুষ্ঠান দেখতেন। এখন সেই সংস্কৃতি অনেকটাই হারিয়ে গেলেও প্রত্যন্ত এলাকায় এর কিছুটা অস্তিত্ব রয়েছে।
নাওডাঙ্গা স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ আব্দুল হানিফ সরকার বলেন, স্মার্টফোনের ব্যাপক ব্যবহারে সম্মিলিত আড্ডা কমে গেছে। তবে প্রবীণ ও খেটে খাওয়া মানুষের একসঙ্গে বসে টেলিভিশন দেখা সামাজিক বন্ধনেরই বহিঃপ্রকাশ। তাঁদের এ অভ্যাস গ্রামীণ সম্প্রীতির ঐতিহ্যকে এখনো বাঁচিয়ে রেখেছে।

আপনার মতামত লিখুন