ইরানে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভ এখন চরম সহিংসতায় রূপ নিয়েছে। গত কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় এই গণ-আন্দোলনে নিরাপত্তা বাহিনীর সাথে বিক্ষোভকারীদের দফায় দফায় সংঘর্ষে ইরানজুড়ে সৃষ্টি হয়েছে এক বিভীষিকাময় পরিস্থিতি। হাসপাতালের মর্গে লাশের জায়গা হচ্ছে না, আহতদের চাপে হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা।
তেহরানসহ বিভিন্ন শহরের অন্তত তিনটি হাসপাতালের চিকিৎসকরা বিবিসির কাছে পরিস্থিতির ভয়াবহতা বর্ণনা করেছেন। তারা জানিয়েছেন, অনেক তরুণের মাথা ও বুকে সরাসরি গুলি লেগেছে। তেহরানের একটি হাসপাতালের চিকিৎসকের ভাষ্যমতে, “হাসপাতালগুলোতে তিল ধারণের ঠাঁই নেই। প্রতিনিয়ত শরীরে গুলি ও রাবার বুলেটের ক্ষত নিয়ে মানুষ আসছে।”
সবচেয়ে ভয়াবহ চিত্র দেখা গেছে রাশত্ শহরের পুরসিনা হাসপাতালে। শুক্রবার এক রাতেই সেখানে ৭০ জনের মরদেহ নিয়ে আসা হয়। মর্গে জায়গা না থাকায় মরদেহগুলো একটির ওপর আরেকটি স্তূপ করে রাখা হয়েছে, এমনকি হাসপাতালের প্রার্থনা কক্ষেও লাশের সারি দেখা গেছে। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, অনেক রোগী হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই মারা যাচ্ছেন।
জরুরি পরিস্থিতির কারণে ইরানের অনেক হাসপাতালে সাধারণ অস্ত্রোপচার ও রোগী ভর্তি বন্ধ রাখা হয়েছে। ছুটিতে থাকা চিকিৎসকদের ছুটি বাতিল করে কাজে ডেকে পাঠানো হয়েছে। মধ্য ইরানের কাশান শহরের চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, নিরাপত্তা বাহিনীর ছোঁড়া শর্টগানের গুলিতে অনেক বিক্ষোভকারীর চোখ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এমনকি গুরুতর আহতদের জরুরি চিকিৎসা (সিপিআর) দেওয়ার মতো সময় ও সুযোগও পাওয়া যাচ্ছে না।
অভিযোগ উঠেছে, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নিহতদের মরদেহ হস্তান্তরের বিনিময়ে স্বজনদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের অর্থ (প্রায় ৭ হাজার মার্কিন ডলার সমপরিমাণ) দাবি করছে।
২০২২ সালে মাহসা আমিনির মৃত্যুর পর শুরু হওয়া আন্দোলনের পর এটিই ইরানের সবচেয়ে বড় বিক্ষোভ। অর্থনৈতিক সংকট, মুদ্রার অবমূল্যায়ন এবং দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতির প্রতিবাদে দুই সপ্তাহ আগে ব্যবসায়ীদের ডাকা কর্মসূচি থেকে এই আন্দোলনের সূত্রপাত। বর্তমানে এটি ১শো'র বেশি শহরে ছড়িয়ে পড়েছে।
মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্যমতে, সরকারি বাহিনীর হামলায় ইতোমধ্যে কয়েকশ বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অন্তত ১৪ জন সদস্য প্রাণ হারিয়েছেন বলে জানা গেছে।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি এই বিক্ষোভের জন্য সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করেছেন। তিনি বলেছেন, “বিক্ষোভকারীরা মার্কিন প্রেসিডেন্টকে খুশি করার চেষ্টা করছে। লক্ষাধিক শহীদের রক্তে গড়া এই ইসলামী প্রজাতন্ত্র কোনো হুমকিতে পিছু হটবে না।”
অন্যদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন, “ইরান এখন স্বাধীনতা চায়। যুক্তরাষ্ট্র তাদের সহায়তা করতে পুরোপুরি প্রস্তুত।” ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রধান উরসুলা ভন ডের লেন এবং জাতিসংঘও ইরানে চলমান এই ‘সহিংস দমন-পীড়নের’ তীব্র নিন্দা জানিয়েছে।
উল্লেখ্য, গত বৃহস্পতিবার থেকে ইরানে ইন্টারনেট সংযোগ প্রায় বিচ্ছিন্ন রয়েছে। স্টারলিংক স্যাটেলাইটের মাধ্যমে চিকিৎসকরা বহির্বিশ্বের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করছেন। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর জন্য ইরানের ভেতর থেকে সংবাদ সংগ্রহ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে, ফলে নিহতের প্রকৃত সংখ্যা আরও অনেক বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

