বিপ্লবী বার্তা
রমজান মানেই ইফতারে এক গ্লাস ঠান্ডা শরবত। আর সেই শরবতের প্রাণ হলো লেবু। কিন্তু রমজানের শুরুতেই যখন প্রতি পিস লেবুর দাম ২৫–৩০ টাকায় পৌঁছে যায়, তখন মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের পরিবারের জন্য এটি প্রায় বিলাসপণ্যে পরিণত হয়। প্রতিদিনের ইফতারে লেবু ব্যবহার করা তখন অনেকের পক্ষেই অসম্ভব।
কিন্তু প্রশ্ন হলো লেবু ছাড়া কি ইফতার অসম্পূর্ণ? একদমই নয়। বরং একটু সচেতন পরিকল্পনা আর বিকল্প ব্যবহারের মাধ্যমে ইফতারকে আরও পুষ্টিকর, বৈচিত্র্যময় ও সাশ্রয়ী করা সম্ভব। চলুন জেনে নেওয়া যাক লেবুর বিকল্প হিসেবে কী কী খাওয়া যেতে পারে এবং সেগুলো কীভাবে স্বাস্থ্যকরভাবে ইফতারে যুক্ত করা যায়।
তেঁতুল
তেঁতুল দিয়ে শরবত বা চাটনি দুটিই ইফতারের সঙ্গে মানানসই। তেঁতুলে আছে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও হালকা ল্যাক্সেটিভ উপাদান, যা কোষ্ঠকাঠিন্য কমাতে সহায়ক। রোজার সময় হজমে সমস্যা হলে এটি উপকারী হতে পারে। ইফতারে রাখতে পারেন তেঁতুলের শরবত। এমনকি ছোলা বা মুড়ির মিশ্রণে তেঁতুলের টক-মিষ্টি সসও ব্যবহার করতে পারেন।
টমেটো
লেবুর মতো সরাসরি শরবতে ব্যবহার না করলেও, টমেটো দিয়ে টক স্বাদ আনা যায় অনেক পদে। টমেটোতে রয়েছে ভিটামিন সি ও লাইকোপেন, যা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে। ইফতারের সময় টমেটো কুচি করে সালাদে ব্যবহার করুন। টমেটোর রস দিয়ে হালকা স্যুপ বানানো যেতে পারে। ডাল বা চাটে টক স্বাদের জন্য টমেটো ভালো বিকল্প।
বিলম্বী বা কমলালেবু জাতীয় ফল
যদি লেবুর দাম বেশি হয়, তখন মৌসুমি অন্যান্য টক ফলের দিকে নজর দেওয়া যেতে পারে। কমলালেবু বা মাল্টা দিয়ে শরবত তৈরি করলে স্বাদে ভিন্নতা আসে। যদিও দাম কিছুটা বেশি হতে পারে, তবে একটি ফল দিয়েই কয়েকজনের জন্য শরবত তৈরি সম্ভব।
ভিনেগার
রান্নাঘরে থাকা সাদা ভিনেগার বা আপেল সিডার ভিনেগার অল্প পরিমাণে ব্যবহার করে সালাদে টক স্বাদ আনা যায়। তবে ভিনেগার ব্যবহারে সতর্ক থাকতে হবে, অতিরিক্ত ব্যবহার পেটে জ্বালাপোড়া তৈরি করতে পারে। সবসময় পানি মিশিয়ে ব্যবহার করাই ভালো।
দই
লেবুর বিকল্প হিসেবে দই হতে পারে সবচেয়ে পুষ্টিকর উপায়। দইয়ে রয়েছে প্রোবায়োটিক, যা হজমে সহায়ক এবং দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকার পর পেটের জন্য আরামদায়ক। ইফতারের জন্য টক দই দিয়ে লাচ্ছি তৈরি করতে পারেন। এছাড়া ছোলা, শসা ও পেঁয়াজের সঙ্গে দই মিশিয়ে চাট বানাতে পারেন। এমনকি বোরহানি বা ঘোল ইফতারে দারুণ প্রশান্তি দেয়।
আনারস বা বেল
এসময় বাজারে গেলেই চোখ পড়বে মৌসুমি ফল আনারস ও বেল এর ওপর। এই সময়ে বেল বা আনারসের শরবত হতে পারে লেবুর চেয়ে বেশি কার্যকর। বেলের শরবত পেট ঠান্ডা রাখে। আনারসের শরবত সতেজতা আনে এবং প্রাকৃতিক মিষ্টতা দেয়।
কাঁচা আম
গ্রীষ্মের শুরু মানেই বাজারে কাঁচা আমের আগমন। টক স্বাদে ভরপুর কাঁচা আম লেবুর একটি চমৎকার বিকল্প হতে পারে। কাঁচা আম কুচি করে লবণ-চিনি দিয়ে শরবত বানানো যায়। ডাল বা সালাদে টক স্বাদ আনতে কাঁচা আম কুচি ব্যবহার করা যায়। আমপান্না জাতীয় পানীয় তৈরি করে ইফতারে পরিবেশন করা যেতে পারে।
কাঁচা আমে রয়েছে ভিটামিন সি, যা রোজার সময় শরীরের ক্লান্তি কমাতে সাহায্য করে। এছাড়া হজমে সহায়ক এবং গরমে শরীর ঠান্ডা রাখতেও কার্যকর।
পুষ্টির ভারসাম্যই আসল
লেবু মূলত ভিটামিন সি-এর উৎস। কিন্তু মনে রাখতে হবে শুধু লেবু নয়, অনেক ফল ও সবজিতেই ভিটামিন সি আছে। কাঁচা আম, পেয়ারা, কমলালেবু, এমনকি কাঁচা মরিচেও ভিটামিন সি পাওয়া যায়। অর্থাৎ লেবু না থাকলেও পুষ্টির ঘাটতি হবে এমন ভাবার কোনো কারণ নেই। বরং বৈচিত্র্য আনলে খাবারের মান আরও ভালো হয়।
রমজান আত্মসংযমের মাস। এই মাসে বাজারের বাড়তি দামের চাপ অনেক সময় মানসিক অস্বস্তিও তৈরি করে। কিন্তু একটু সচেতনতা ও সৃজনশীলতায় সেই চাপ অনেকটাই কমানো যায়। লেবুর দাম বাড়লেও ইফতারের আনন্দ থেমে থাকে না। বরং নতুন স্বাদ, নতুন উপায়ে ইফতারকে আরও স্বাস্থ্যকর ও বৈচিত্র্যময় করা যায়। কারণ রমজানের আসল শিক্ষা শুধু ভোগে নয়; সংযমে, বুদ্ধিমত্তায় আর ভাগাভাগিতে।

