ছবিঃ বিপ্লবী বার্তা
পাহাড়ের কোল ঘেঁষে থাকা ক্যাম্পাসে ভোরের প্রথম আলো এবং কুয়াশার নরম চাদরে মোড়ানো ঠান্ডা বাতাস মিশে যখন শীতের হালকা শিহরণ ছড়িয়ে দেয়, তখন হাঁটতে হাঁটতে মনে হয়, এ যেন চিরচেনা বিশ্ববিদ্যালয় নয়, কোনো শিল্পীর আঁকা ছবির পোস্টকার্ড। শীতের সকালে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় এমনই রুপ নিয়ে জেগে ওঠে।
গোলচত্বর থেকে ফ্যাকাল্টিতে যাওয়ার পথে শিউলি ফুলের সাদা-কমলা ছড়ানো বিছানা যেনো শীতকে আরো আপন করে তোলে। রাতভর ঝরে পড়া শিউলিদের ভোরের আলোয় আরও উজ্জ্বল মনে হয়, আর সেই ঘ্রাণে সকালের পথচলাটাও হয়ে ওঠে অন্যরকম। শিক্ষার্থীরা ক্লাসের পথে হাঁটতে হাঁটতে মাঝে মাঝেই থেমে যায়, কেউ ছবি তুলে, কেউবা চুপচাপ মুহূর্তটুকু অনুভব করে। কেউ আবার নিচু হয়ে দু’একটি শিউলি ফুল কুঁড়িয়ে নিয়ে কানের পাশে বা খোঁপায় গুঁজে নেয়, এই এতোটুকু সাজ'ই যেনো শীতের প্রথম আনন্দ বহুগুণ বাড়িয়ে তুলে। ক্যাম্পাসের লালন চত্বরে ভোরের কুয়াশার মধ্যে শিক্ষার্থীদের হাতে খেজুরের রস ভর্তি গ্লাস মনে করিয়ে দেয় প্রাচীন সব খাদ্যাভ্যাস এবং ঐতিহ্যের কথা, আমাদের মানবসভ্যতা টিকে থাকার সাথে প্রকৃতির দানের যোগসূত্রের কথা।
পাহাড়, কুয়াশা আর শিউলি মিলে এই সময়টা ক্যাম্পাসকে দেয় এক স্বপ্নিল সৌন্দর্য, যা প্রতিদিনের ব্যস্ততার মাঝেও মন ছুঁয়ে যায়। এই ঋতুতে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় শুধু শিক্ষাঙ্গন নয়, হয়ে ওঠে প্রকৃতির নীরব কবিতা।
এভাবেই প্রকৃতির নরম ছোঁয়ায় দিনের শুরু হলেও কিছুক্ষণের মধ্যেই কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় জেগে ওঠে নিজস্ব ছন্দে। ফ্যাকাল্টি ভবনের সামনে গা-ছাড়া আড্ডা, হাতে কফির কাপ, শেষ মুহূর্তের প্রেজেন্টেশন রিভিউ, সব মিলিয়ে ব্যস্ততার শুরু যেনো একটু একটু করে স্পষ্ট হয়। দশটার পর পুরো ক্যাম্পাসে নেমে আসে তালময় গতি, ক্লাস পাল্টানোর ভীড়, ল্যাবে ঢোকার তাড়াহুড়ো, লাইব্রেরির নীরব মনোযোগ, আর হল-ডাইনিং ও ক্যাফেটেরিয়ায় দুপুরের আড্ডা। বিকেলের দিকে এই গতি আরও রঙ বদলায়, কেউ প্র্যাকটিক্যালে, কেউ খেলাধুলায়, কেউ আবার সাংস্কৃতিক ও বিতর্কচর্চায়। শিক্ষক-গবেষকদের অফিস ও ল্যাবেও তখন চলছে সমান ব্যস্ততা।
দিনের শেষে সূর্য ডুবে গেলে ক্যাম্পাস ধীরে ধীরে নীরব হয়ে আসে, কিন্তু সেই নীরবতার মাঝেও থাকে এক ভিন্ন ধরনের উচ্ছ্বাস। কোথাও মাঠের পাশে চলছে ব্যাডমিন্টনের টুপটাপ শব্দ, আলো-ছায়ার খেলায় উড়ছে শাটল। আবার কোথাও কোথাও দেখা মেলে বন্ধুদের আয়োজনে ছোট্ট বারবিকিউ পার্টির ধোঁয়া, হাসি আর গানের সুরে ভরে ওঠে শীতের রাত।
শহিদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত হল ও সূনীতি–শান্তি হলের সামনে তখন আরেক দৃশ্য। পিঠার দোকানের পাশে জমে ওঠে গল্পের আসর, ভাপা, চিতইয়ের উষ্ণ স্বাদে শীতের রাত যেন আরও মধুর হয়ে ওঠে। এর পাশাপাশি ক্যাম্পাসের আশপাশের চায়ের স্টলগুলোতেও শিক্ষার্থীদের আড্ডা জমে ওঠে ধোঁয়া উঠা চায়ের কাপ, টোস্ট বিস্কুট আর হাসি, গল্পে ভরে থাকে সেই কোণগুলো।
পাহাড়ের গায়ে সন্ধ্যার কুয়াশা নামতেই পুরো পরিবেশ যেন রূপ নেয় নতুন এক সৌন্দর্যে, শান্ত অথচ প্রাণময়। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই কর্মব্যস্ত দিনগুলো তাই শুধু পড়াশোনার গল্প নয় এটি আনন্দ, বন্ধুত্ব, শীতের পিঠার উষ্ণতা, চায়ের দোকানের আড্ডা, আর ভোর থেকে রাত পর্যন্ত চলমান এক জীবন্ত তারুণ্যের স্পন্দন।
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষার্থী মাইমুনা পরশ বলেন, 'জীবনের যোগ–বিয়োগের সময়টাতেই যেন শীত ফিরে আসে। ক্যাম্পাসে আগমনী হাওয়ার ছোঁয়া, পাতা ঝরা, বন্ধুদের আড্ডা আর পিঠার দোকানের ভিড় সব মিলিয়ে শীত মানেই এক বিশেষ আমেজ। এক কাপ চায়ের সাথে জমে ওঠা গল্প আর বছরের শেষের এবং নতুন বছরের শুরুর মুহূর্তগুলোই শীতকে মনে রাখার মতো করে তোলে।'
'সেমিস্টার শেষের স্বস্তির মুহূর্তটিকে স্মরণীয় করে তুলতেই হঠাৎ পরিকল্পনায় বন্ধুরা আয়োজন করেছিল এক ছোট্ট বারবিকিউ পার্টি। রাতের নরম হাওয়া, ধোঁয়া ওঠা গ্রিল আর হাসি–আড্ডার মিষ্টি শব্দে ক্যাম্পাস তখন যেন এক অন্যরকম আবহে মোড়া।' ব্যবস্থাপনা শিক্ষা বিভাগের শিক্ষার্থী জিয়াউল হক শামীমের জন্য এটি ছিল বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের প্রথম এমন রাত, যেখানে পড়ালেখার চাপ ভুলে বন্ধুদের সঙ্গে এতটা স্বতঃস্ফূর্তভাবে সময় কাটালেন। বারবিকিউর সুবাস, পাশে বেজে চলা গান আর হালকা মজার মুহূর্তগুলো তার কাছে হয়ে ওঠে প্রত্যাশার চেয়েও বেশি আনন্দের।
সব মিলিয়ে শীতের কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় মানে এক ছন্দময় অনুভব। ভোরের শিউলির ঘ্রাণ থেকে রাতের চায়ের কাপ পর্যন্ত প্রতিটি মুহূর্তে মিশে থাকে তারুণ্যের, বন্ধুত্বের উষ্ণতা আর প্রকৃতির নীরব সান্নিধ্য। পড়াশোনার ব্যস্ততার ফাঁকে ফাঁকে এসব ছোট ছোট আনন্দই ক্যাম্পাসকে করে তোলে জীবন্ত ও স্মরণীয়। শীতের কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি শিক্ষাঙ্গন নয়, এটি স্মৃতি, অনুভব আর তারুণ্যের স্পন্দনে ভরা এক আপন ঠিকানা।

