কুড়িগ্রামে হারিয়ে যাচ্ছে ঐতিহ্য: বিলুপ্তির পথে ‘নল বড়শি’
ছবিঃ বিপ্লবী বার্তা
কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ীতে পাটখড়ি দিয়ে তৈরি গ্রামবাংলা ঐতিহ্যবাহী 'নল বড়শি’ এখন বিলুপ্তির পথে। এক সময় গ্রামবাংলার বর্ষা কিংবা শরৎকালে স্থানীয়রা জলাশয়ের ধারে সারি সারি বড়শি পেতে মাছ শিকার করতেন। এখন সেই মাছ ধরার দৃশ্যপট চোখ পড়ে না। ফলে নতুন নতুন প্রজন্ম এই নল বসির কি সেটিও অনেকে এখনও দেখেনি। ২০ বছর আগেও স্থানীয় মৎস্যজীবীদের মাছ ধরার প্রধান আকর্ষণ ছিল নল বর্শি। কিন্তু কালের বিবর্তনে এবং আধুনিক প্রযুক্তিতে মাছ ধরার সরঞ্জামের ভিড়ে এই ঐতিহ্যবাহী নল বর্শি (মাছ ধরার উপকরণ) এখন বিলুপ্তির পথে। আগে স্থানীয়রা এই বড়শি তৈরি করতেন শুকনো শক্ত পাটখড়ি বা চিকন বাঁশের কঞ্চি ব্যবহার করে। এতে এক প্রান্তে সুতা ও বড়শি অন্য প্রান্তটিতে  মাটিতে গেঁথে দেওয়া হয়। সাধারণত শোল, বোয়াল, টাকি বা আইড় মাছ ধরার সহজ পদ্ধতি এটি।


এই পদ্ধতিতে কোনো বাড়তি খরচ ছাড়াই প্রাকৃতিক ভাবে পাওয়া উপকরণ দিয়ে তৈরি হওয়ায় এটি ছিল মাছ শিকার করার অত্যন্ত সাশ্রয়ী। তবে বর্তমান সময়ে ডোবা-নালা খালবিল না থাকায় অধিকাংশ এলাকায় নল বর্শির অনেক আগেই বিলুপ্তি হয়েছে৷  খোঁজ নিয়ে জানা গেছে ফুলবাড়ী উপজেলার সব চেয়ে বড় নদী ধরলা, এরপর বারোমাসিয়া, নীলকমল সহ শিমুলবাড়ী ইউনিয়ন ও ভাঙ্গামোড় ইউনিয়নে কিছু ছোট এবং মাঝারী জলাশয় রয়েছে। সেই সব এলাকায় নল বর্শির ব্যবহার থাকলেও আগের মতো মাছ না থাকায় ঐ এলাকা গুলোতেও নল বর্শির ব্যবহার কমে যাচ্ছে। 


পশ্চিম ফুলমতি বারোমাসিয়া নদীর তীরবর্তী এলাকার একজন ক্ষুদ্র মাছ ব্যবসায়ী আজিবর রহমান জানান, প্রতিদিন সন্ধ্যা এই নল বর্শিগুলো বারোমাসিয়া নদীতে বসানো হয়। সারারাত থাকার পরের দিন সকালে বর্শিগুলো তুলতে হয়। এখন আগের মতো মাছ নেই। কোন দিন ২০০ গ্রাম মাছ জোটে, আবার কোন কোন দিন একটি মাছও জোটে না। তিনি নল বর্শির পাশাপাশি নেট জাল দিয়ে মাছ শিকার করে কোন রকমেই সংসার চালান। 


সীমান্তঘেষা কুরুষাফেরুষা এলাকায় কৃষক ও মাছ চাষি ধীরেন্দ্র নাথ রায় জানান, এই নল বর্শির কথা কমপক্ষে ২০ বছর পর আপনার মাধ্যমে শুনলাম। আগে নল বর্শি দিয়ে আমাদের দোলায় কত যে মাছ শিকার করতাম। এখন আগের মত খাল, ডোবাও নেই এবং নল বর্শির মাছও নেই। নল বর্শি এখন ইতিহাসের নীরব সাক্ষী। 


একই এলাকায় কৃষক দেলোয়ার হোসেন জানান, শৈশবে নল বর্শি দিয়ে মাছ ধরার স্মৃতি আপনি মনে করে দিলেন। সকালে খাওয়া করেই এক থেকে দেড়শ নল বর্শি নিয়ে বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে মাছ শিকার করেছি। তখন চ্যাং, চ্যাংটি, শোল ও মাগুরসহ বিভিন্ন প্রকার দেশি মাছ পাওয়া যেতো।  এ সব মাছ না থাকায় গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী এই মাছ ধরার নল বর্শি এখন বিলুপ্তপ্রায়।