চারদিকে শারদীয় দুর্গোৎসবের প্রস্তুতি। নতুন পোশাক, ভালো খাবার আর পরিবারের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগির স্বপ্নে বিভোর অনেকে। কিন্তু কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার ধরলা ও বারোমাসিয়া নদীর পাড়ে বসবাসরত জেলে পরিবারগুলোর কাছে উৎসবের আনন্দের চেয়ে বড় হয়ে উঠেছে দুবেলা খাবার জোগাড়ের চিন্তা। ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত নদীতে জাল ফেলেও মিলছে না পর্যাপ্ত মাছ। দিনভর পরিশ্রমের পর জনপ্রতি আয় হচ্ছে মাত্র ২০০ থেকে ৩০০ টাকা। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির বাজারে এই সামান্য আয়ে সংসার চালাতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে তাঁদের। ফলে দুর্গাপূজায় নতুন পোশাক কেনা কিংবা ভালো খাবার খাওয়ার স্বপ্ন অধরাই থেকে যাচ্ছে অনেকের।
সম্প্রতি ফুলবাড়ী সদর ইউনিয়নের কুটিচন্দ্রখানা এলাকায় ধরলা নদীতে মাছ শিকারের সময় কথা হয় ৭৫ বছর বয়সী জেলে বিশ্বনাথ বিশ্বাসের সঙ্গে। নদীতে জাল টানতে টানতে তিনি বলেন, “গরিব মানুষের আবার পূজার আনন্দ আছে বাহে! সংসারই চালাতে পারছি না। দুই বেলা খাবার জোটানো কঠিন, সেখানে নতুন কাপড় কিনব কী দিয়ে?”
নদীর দিকে ইশারা করে বিশ্বনাথ জানান, চারজন মিলে সকাল থেকে নদীর এপার-ওপার জাল টেনে আড়াই থেকে তিন কেজি মাছ পেয়েছেন। এসব মাছ প্রতি কেজি ২৫০ থেকে ২৮০ টাকা দরে বিক্রি করা যাবে। মাছ বিক্রির টাকা ভাগ করে নৌকার ভাড়া পরিশোধের পর প্রত্যেকের হাতে খুব সামান্য অর্থ থাকে। বয়সের ভার উপেক্ষা করেই স্ত্রীসহ পরিবারের ভরণপোষণের জন্য তাঁকে প্রতিদিন নদীতে নামতে হয়।
একই এলাকার জেলে কৃষ্ণ চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, “সকাল ৯টার দিকে চারজন মাছ ধরতে বের হয়েছি। সারাদিনে কখনো দুই কেজি, কখনো তিন-চার কেজি দেশি মাছ পাই। এই মাছ বিক্রি করেই সংসার চলে। অনেক সময় দুপুরের খাবারও জোটে না।” তাঁর আক্ষেপ, পূজার আনন্দ যেন সচ্ছল মানুষের জন্য; অভাবী জেলেদের ভাগ্যে জোটে শুধু জীবনসংগ্রাম।
উপজেলার নাওডাঙ্গা ইউনিয়নের গোরকমন্ডল জেলেপাড়ায় দুই শতাধিক পরিবারের জীবিকা মাছ ধরার ওপর নির্ভরশীল। স্থানীয়দের হিসাবে, এসব পরিবারের মধ্যে প্রায় ৬০ থেকে ৭০টি পরিবার অসহায়। নদীতে মাছ কমে যাওয়ায় কমেছে আয়ও। ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় চাহিদা পূরণ করাই কঠিন হয়ে পড়েছে।
জেলে আয়চন বিশ্বাস বলেন, “পূজার দিনেও অন্য দিনের মতো নৌকা নিয়ে নদীতে যেতে হয়। সংসার চালাতেই সব টাকা শেষ হয়ে যায়। পরিবারে পূজার আনন্দ বলতে কিছু থাকে না।”
অন্যদিকে, জেলে দ্বিনেশ চন্দ্র বিশ্বাসের নিজের কোনো জাল নেই। অন্যের জাল ও সরঞ্জাম ব্যবহার করে মাছ ধরতে হয় তাঁকে। এতে উপার্জিত অর্থের পুরোটা তাঁর হাতে থাকে না। একই এলাকার ৭৫ বছর বয়সী খগেন্দ্র চন্দ্র বিশ্বাসেরও নতুন পোশাক ও ভালো খাবারের স্বপ্ন থাকলেও আর্থিক সংকটে তা পূরণ করা কঠিন।
নাওডাঙ্গা ইউনিয়ন মৎস্যজীবী সংগঠনের নেতা তপন চন্দ্র বিশ্বাস ও রিপন চন্দ্র বিশ্বাস জানান, পুরো ইউনিয়নে জেলে পরিবারের সংখ্যা আড়াই শতাধিক। তাঁদের মধ্যে শতাধিক পরিবার চরম অসহায় অবস্থায় রয়েছে। দুর্গোৎসব উপলক্ষে এসব পরিবারের পাশে দাঁড়াতে সরকারি-বেসরকারি সহায়তার দাবি জানান তাঁরা।
ফুলবাড়ী উপজেলা হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান কল্যাণ ফ্রন্টের আহ্বায়ক সুকুমার সেন ও সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক বীরেন্দ্র নাথ রায় জানান, দুর্গোৎসব উপলক্ষে অসহায় সনাতন ধর্মাবলম্বী পরিবারগুলোকে নতুন পোশাক বা আর্থিক সহায়তা দেওয়ার জন্য তাঁদের সংগঠনের কোনো বরাদ্দ নেই।
বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ ফুলবাড়ী উপজেলা শাখার সভাপতি কার্তিক চন্দ্র সরকার বলেন, সংগঠনের পক্ষ থেকে অসহায় পরিবারগুলোর জন্য বিশেষ সহায়তার ব্যবস্থা নেই। তবে তিনি ব্যক্তিগত উদ্যোগে কয়েক বছর ধরে কিছু পরিবারকে সহায়তা করে আসছেন।
উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা হাফিজুর রহমান জানান, ফুলবাড়ীতে মোট জেলে পরিবারের সংখ্যা ১ হাজার ২৯৭টি। এর মধ্যে সনাতন ধর্মাবলম্বী জেলে পরিবার ৫৯০টি। ফুলবাড়ী ইলিশ জোনের অন্তর্ভুক্ত না হওয়ায় ইলিশ আহরণে নিষেধাজ্ঞাকালীন বিশেষ সরকারি সহায়তার বরাদ্দ এখানকার জেলেরা পান না।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) দিলারা আকতার জানান, শারদীয় দুর্গোৎসব উপলক্ষে উপজেলার অসহায় সনাতন ধর্মাবলম্বী পরিবারগুলোর জন্য বিশেষ কোনো সরকারি বরাদ্দ নেই।
উৎসবের আলোয় যখন চারপাশ আলোকিত, তখন নদীর বুকে জীবিকার লড়াই চালিয়ে যাওয়া এসব পরিবারের প্রত্যাশা অন্তত উৎসবের দিনগুলোতে কেউ তাঁদের পাশে দাঁড়াক, পরিবারের সদস্যদের মুখে ফুটুক একটু হাসি।

বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৪ অক্টোবর ২০২৬
চারদিকে শারদীয় দুর্গোৎসবের প্রস্তুতি। নতুন পোশাক, ভালো খাবার আর পরিবারের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগির স্বপ্নে বিভোর অনেকে। কিন্তু কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার ধরলা ও বারোমাসিয়া নদীর পাড়ে বসবাসরত জেলে পরিবারগুলোর কাছে উৎসবের আনন্দের চেয়ে বড় হয়ে উঠেছে দুবেলা খাবার জোগাড়ের চিন্তা। ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত নদীতে জাল ফেলেও মিলছে না পর্যাপ্ত মাছ। দিনভর পরিশ্রমের পর জনপ্রতি আয় হচ্ছে মাত্র ২০০ থেকে ৩০০ টাকা। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির বাজারে এই সামান্য আয়ে সংসার চালাতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে তাঁদের। ফলে দুর্গাপূজায় নতুন পোশাক কেনা কিংবা ভালো খাবার খাওয়ার স্বপ্ন অধরাই থেকে যাচ্ছে অনেকের।
সম্প্রতি ফুলবাড়ী সদর ইউনিয়নের কুটিচন্দ্রখানা এলাকায় ধরলা নদীতে মাছ শিকারের সময় কথা হয় ৭৫ বছর বয়সী জেলে বিশ্বনাথ বিশ্বাসের সঙ্গে। নদীতে জাল টানতে টানতে তিনি বলেন, “গরিব মানুষের আবার পূজার আনন্দ আছে বাহে! সংসারই চালাতে পারছি না। দুই বেলা খাবার জোটানো কঠিন, সেখানে নতুন কাপড় কিনব কী দিয়ে?”
নদীর দিকে ইশারা করে বিশ্বনাথ জানান, চারজন মিলে সকাল থেকে নদীর এপার-ওপার জাল টেনে আড়াই থেকে তিন কেজি মাছ পেয়েছেন। এসব মাছ প্রতি কেজি ২৫০ থেকে ২৮০ টাকা দরে বিক্রি করা যাবে। মাছ বিক্রির টাকা ভাগ করে নৌকার ভাড়া পরিশোধের পর প্রত্যেকের হাতে খুব সামান্য অর্থ থাকে। বয়সের ভার উপেক্ষা করেই স্ত্রীসহ পরিবারের ভরণপোষণের জন্য তাঁকে প্রতিদিন নদীতে নামতে হয়।
একই এলাকার জেলে কৃষ্ণ চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, “সকাল ৯টার দিকে চারজন মাছ ধরতে বের হয়েছি। সারাদিনে কখনো দুই কেজি, কখনো তিন-চার কেজি দেশি মাছ পাই। এই মাছ বিক্রি করেই সংসার চলে। অনেক সময় দুপুরের খাবারও জোটে না।” তাঁর আক্ষেপ, পূজার আনন্দ যেন সচ্ছল মানুষের জন্য; অভাবী জেলেদের ভাগ্যে জোটে শুধু জীবনসংগ্রাম।
উপজেলার নাওডাঙ্গা ইউনিয়নের গোরকমন্ডল জেলেপাড়ায় দুই শতাধিক পরিবারের জীবিকা মাছ ধরার ওপর নির্ভরশীল। স্থানীয়দের হিসাবে, এসব পরিবারের মধ্যে প্রায় ৬০ থেকে ৭০টি পরিবার অসহায়। নদীতে মাছ কমে যাওয়ায় কমেছে আয়ও। ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় চাহিদা পূরণ করাই কঠিন হয়ে পড়েছে।
জেলে আয়চন বিশ্বাস বলেন, “পূজার দিনেও অন্য দিনের মতো নৌকা নিয়ে নদীতে যেতে হয়। সংসার চালাতেই সব টাকা শেষ হয়ে যায়। পরিবারে পূজার আনন্দ বলতে কিছু থাকে না।”
অন্যদিকে, জেলে দ্বিনেশ চন্দ্র বিশ্বাসের নিজের কোনো জাল নেই। অন্যের জাল ও সরঞ্জাম ব্যবহার করে মাছ ধরতে হয় তাঁকে। এতে উপার্জিত অর্থের পুরোটা তাঁর হাতে থাকে না। একই এলাকার ৭৫ বছর বয়সী খগেন্দ্র চন্দ্র বিশ্বাসেরও নতুন পোশাক ও ভালো খাবারের স্বপ্ন থাকলেও আর্থিক সংকটে তা পূরণ করা কঠিন।
নাওডাঙ্গা ইউনিয়ন মৎস্যজীবী সংগঠনের নেতা তপন চন্দ্র বিশ্বাস ও রিপন চন্দ্র বিশ্বাস জানান, পুরো ইউনিয়নে জেলে পরিবারের সংখ্যা আড়াই শতাধিক। তাঁদের মধ্যে শতাধিক পরিবার চরম অসহায় অবস্থায় রয়েছে। দুর্গোৎসব উপলক্ষে এসব পরিবারের পাশে দাঁড়াতে সরকারি-বেসরকারি সহায়তার দাবি জানান তাঁরা।
ফুলবাড়ী উপজেলা হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান কল্যাণ ফ্রন্টের আহ্বায়ক সুকুমার সেন ও সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক বীরেন্দ্র নাথ রায় জানান, দুর্গোৎসব উপলক্ষে অসহায় সনাতন ধর্মাবলম্বী পরিবারগুলোকে নতুন পোশাক বা আর্থিক সহায়তা দেওয়ার জন্য তাঁদের সংগঠনের কোনো বরাদ্দ নেই।
বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ ফুলবাড়ী উপজেলা শাখার সভাপতি কার্তিক চন্দ্র সরকার বলেন, সংগঠনের পক্ষ থেকে অসহায় পরিবারগুলোর জন্য বিশেষ সহায়তার ব্যবস্থা নেই। তবে তিনি ব্যক্তিগত উদ্যোগে কয়েক বছর ধরে কিছু পরিবারকে সহায়তা করে আসছেন।
উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা হাফিজুর রহমান জানান, ফুলবাড়ীতে মোট জেলে পরিবারের সংখ্যা ১ হাজার ২৯৭টি। এর মধ্যে সনাতন ধর্মাবলম্বী জেলে পরিবার ৫৯০টি। ফুলবাড়ী ইলিশ জোনের অন্তর্ভুক্ত না হওয়ায় ইলিশ আহরণে নিষেধাজ্ঞাকালীন বিশেষ সরকারি সহায়তার বরাদ্দ এখানকার জেলেরা পান না।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) দিলারা আকতার জানান, শারদীয় দুর্গোৎসব উপলক্ষে উপজেলার অসহায় সনাতন ধর্মাবলম্বী পরিবারগুলোর জন্য বিশেষ কোনো সরকারি বরাদ্দ নেই।
উৎসবের আলোয় যখন চারপাশ আলোকিত, তখন নদীর বুকে জীবিকার লড়াই চালিয়ে যাওয়া এসব পরিবারের প্রত্যাশা অন্তত উৎসবের দিনগুলোতে কেউ তাঁদের পাশে দাঁড়াক, পরিবারের সদস্যদের মুখে ফুটুক একটু হাসি।

আপনার মতামত লিখুন