বিপ্লবী বার্তা

মূল পাতা

শিক্ষাঙ্গন

ঢাকার জলাভূমি রক্ষায় সমন্বিত কর্তৃপক্ষ গঠনের সুপারিশ, জবিতে সেমিনার অনুষ্ঠিত

অমিদ হাসান অমি
অমিদ হাসান অমি জবি
প্রকাশ : ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | প্রিন্ট সংস্করণ
ঢাকার জলাভূমি রক্ষায় সমন্বিত কর্তৃপক্ষ গঠনের সুপারিশ, জবিতে সেমিনার অনুষ্ঠিত
ছবিঃ বিপ্লবী বার্তা

ঢাকা শহরের জলাভূমি রক্ষায় একটি সমন্বিত ও ক্ষমতাসম্পন্ন কর্তৃপক্ষ বা বিশেষায়িত ইউনিট গঠনের সুপারিশ করেছেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের পিএইচডি গবেষক মো. আশ্রাফ উদ্দিন।

আজ বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) বিভাগের সেমিনার কক্ষে অনুষ্ঠিত তাঁর ২য় উন্মুক্ত সেমিনারে তিনি এ সুপারিশ তুলে ধরেন। আশ্রাফ উদ্দিন একই বিভাগের সহকারী অধ্যাপক।

"Wetland Dynamics and Management: A Case of Dhaka City" শীর্ষক এ গবেষণা পরিচালিত হচ্ছে বিভাগের অধ্যাপক ড. নিগার সুলতানার তত্ত্বাবধানে। সেমিনারে গবেষণার ফলাফল, পদ্ধতি, বিশ্লেষণ ও সুপারিশ উপস্থাপন করা হয়।

গবেষণায় ঢাকা শহরের জলাভূমির দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন, এর কারণ, ভবিষ্যৎ প্রবণতা ও বিদ্যমান ব্যবস্থাপনা চর্চা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এ জন্য ১৯৮৮, ১৯৯৫, ২০০৫, ২০১৬ ও ২০২৪ সালের ল্যান্ডস্যাট ও সেন্টিনেল-২ স্যাটেলাইট চিত্র ব্যবহার করে নদী, খাল, লেক, পুকুর, জলাভূমি বা মার্শ এবং অ-জলাভূমি শ্রেণির পরিবর্তন নিরূপণ করা হয়েছে। পাশাপাশি মাঠপর্যায়ের সাক্ষাৎকার, কী ইনফরম্যান্ট ইন্টারভিউ, ফোকাস গ্রুপ আলোচনা, প্রাতিষ্ঠানিক তথ্য ও জিআইএসভিত্তিক বিশ্লেষণ করা হয়েছে। ভবিষ্যৎ পরিবর্তন বিশ্লেষণে ল্যান্ড চেঞ্জ মডেলার, এমএলপি-মার্কভ মডেল ও বিভিন্ন স্থানিক নিয়ামক ব্যবহার করা হয়েছে।

গবেষণার প্রধান ফলাফলে দেখা যায়, ১৯৮৮ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ঢাকায় জলাভূমি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। এ সময়ে জলাভূমিবহির্ভূত ভূমি প্রায় ৮৩ বর্গকিলোমিটার বেড়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মার্শ বা নিম্নভূমি জলাভূমি, যা ১০১ বর্গকিলোমিটার থেকে কমে ২২ দশমিক ৯ বর্গকিলোমিটারে নেমেছে। খাল মানচিত্রে টিকে থাকলেও বাস্তবে অনেক খালের প্রস্থ, গভীরতা, পানিপ্রবাহ ও পরিবেশগত কার্যকারিতা কমে গেছে। পুকুর ও লেকের ক্ষেত্রে ভরাট, বর্জ্য ফেলা, পয়ঃনিষ্কাশন সংযোগ, দখল, অপরিকল্পিত উন্নয়ন ও দুর্বল রক্ষণাবেক্ষণকে বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। নদীর ক্ষেত্রে তীর দখল, শিল্প ও গৃহস্থালি বর্জ্য, পলি জমা, প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়া এবং দুর্বল তদারকি প্রধান সমস্যা হিসেবে উঠে এসেছে।

গবেষণা অনুযায়ী, ঢাকার জলাভূমি হ্রাসের মূল কারণ ভূমি ভরাট, দখল, বর্জ্য ও পয়ঃবর্জ্য দূষণ, অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও দুর্বল আইন প্রয়োগ। এর সঙ্গে রয়েছে ভূমির রেকর্ড ও সীমানাসংক্রান্ত জটিলতা, প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়ের অভাব, রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী মহলের চাপ এবং জনসচেতনতার ঘাটতি। মডেলভিত্তিক বিশ্লেষণে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে, বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে অবশিষ্ট জলাভূমি আরও সংকুচিত হতে পারে।

উপস্থাপনায় গবেষক জলাভূমি সংরক্ষণে বেশ কয়েকটি সুপারিশ তুলে ধরেন। এর মধ্যে রয়েছে জলাভূমি ও খাল ব্যবস্থাপনায় সমন্বিত ও ক্ষমতাসম্পন্ন কর্তৃপক্ষ বা বিশেষায়িত ইউনিট গঠন; নদী, খাল, পুকুর, লেক ও মার্শের সীমানা স্থায়ীভাবে নির্ধারণ; নিয়মিত খনন ও পুনঃখনন; বর্জ্য ও পয়ঃবর্জ্য নিয়ন্ত্রণ; জিআইএসভিত্তিক হালনাগাদ তথ্যভান্ডার তৈরি ও নিয়মিত পর্যবেক্ষণ; দখলমুক্ত জমি পুনরায় দখল রোধ; ব্যবস্থাপনায় স্থানীয় জনগণকে যুক্ত করা এবং নগর পরিকল্পনায় জলাধার ও রিটেনশন এরিয়া বাধ্যতামূলকভাবে সংরক্ষণ।

সেমিনারে উপস্থিত ছিলেন বিভাগের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আলামিন হক। এ ছাড়া অধ্যাপক ড. হাসিনা আখতার, সহযোগী অধ্যাপক ড. শবনম সারমিন লুনা, ড. মো. মহিউদ্দিন, ড. রিফাত মাহমুদ, সহযোগী অধ্যাপক ড. রেফাত নাসের, নাহরীন জান্নাত হোসেন ও খন্দকার তানভীর হোসেনসহ বিভাগের শিক্ষক ও গবেষকেরা উপস্থিত ছিলেন। অন্যান্য বিভাগের শিক্ষক, গবেষক ও শিক্ষার্থীরাও সেমিনারে অংশ নেন।

উপস্থিত শিক্ষক, গবেষক ও শিক্ষার্থীরা গবেষণার পদ্ধতি, ফলাফল ও সুপারিশ নিয়ে আলোচনা করেন এবং গবেষণার মানোন্নয়নে বিভিন্ন পরামর্শ দেন। বক্তারা বলেন, দ্রুত নগরায়ণ, জলাবদ্ধতা, তাপদাহ ও পরিবেশগত ঝুঁকির প্রেক্ষাপটে ঢাকার জলাভূমি সংরক্ষণ এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁদের মতে, গবেষণাটি নগর পরিকল্পনা, জলাভূমি ব্যবস্থাপনা, জলাবদ্ধতা নিরসন ও পরিবেশ সংরক্ষণে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ঢাকা শহরের জলাভূমি রক্ষা

আপনার মতামত লিখুন

বিপ্লবী বার্তা

বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬


ঢাকার জলাভূমি রক্ষায় সমন্বিত কর্তৃপক্ষ গঠনের সুপারিশ, জবিতে সেমিনার অনুষ্ঠিত

প্রকাশের তারিখ : ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

ঢাকা শহরের জলাভূমি রক্ষায় একটি সমন্বিত ও ক্ষমতাসম্পন্ন কর্তৃপক্ষ বা বিশেষায়িত ইউনিট গঠনের সুপারিশ করেছেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের পিএইচডি গবেষক মো. আশ্রাফ উদ্দিন।

আজ বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) বিভাগের সেমিনার কক্ষে অনুষ্ঠিত তাঁর ২য় উন্মুক্ত সেমিনারে তিনি এ সুপারিশ তুলে ধরেন। আশ্রাফ উদ্দিন একই বিভাগের সহকারী অধ্যাপক।

"Wetland Dynamics and Management: A Case of Dhaka City" শীর্ষক এ গবেষণা পরিচালিত হচ্ছে বিভাগের অধ্যাপক ড. নিগার সুলতানার তত্ত্বাবধানে। সেমিনারে গবেষণার ফলাফল, পদ্ধতি, বিশ্লেষণ ও সুপারিশ উপস্থাপন করা হয়।

গবেষণায় ঢাকা শহরের জলাভূমির দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন, এর কারণ, ভবিষ্যৎ প্রবণতা ও বিদ্যমান ব্যবস্থাপনা চর্চা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এ জন্য ১৯৮৮, ১৯৯৫, ২০০৫, ২০১৬ ও ২০২৪ সালের ল্যান্ডস্যাট ও সেন্টিনেল-২ স্যাটেলাইট চিত্র ব্যবহার করে নদী, খাল, লেক, পুকুর, জলাভূমি বা মার্শ এবং অ-জলাভূমি শ্রেণির পরিবর্তন নিরূপণ করা হয়েছে। পাশাপাশি মাঠপর্যায়ের সাক্ষাৎকার, কী ইনফরম্যান্ট ইন্টারভিউ, ফোকাস গ্রুপ আলোচনা, প্রাতিষ্ঠানিক তথ্য ও জিআইএসভিত্তিক বিশ্লেষণ করা হয়েছে। ভবিষ্যৎ পরিবর্তন বিশ্লেষণে ল্যান্ড চেঞ্জ মডেলার, এমএলপি-মার্কভ মডেল ও বিভিন্ন স্থানিক নিয়ামক ব্যবহার করা হয়েছে।

গবেষণার প্রধান ফলাফলে দেখা যায়, ১৯৮৮ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ঢাকায় জলাভূমি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। এ সময়ে জলাভূমিবহির্ভূত ভূমি প্রায় ৮৩ বর্গকিলোমিটার বেড়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মার্শ বা নিম্নভূমি জলাভূমি, যা ১০১ বর্গকিলোমিটার থেকে কমে ২২ দশমিক ৯ বর্গকিলোমিটারে নেমেছে। খাল মানচিত্রে টিকে থাকলেও বাস্তবে অনেক খালের প্রস্থ, গভীরতা, পানিপ্রবাহ ও পরিবেশগত কার্যকারিতা কমে গেছে। পুকুর ও লেকের ক্ষেত্রে ভরাট, বর্জ্য ফেলা, পয়ঃনিষ্কাশন সংযোগ, দখল, অপরিকল্পিত উন্নয়ন ও দুর্বল রক্ষণাবেক্ষণকে বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। নদীর ক্ষেত্রে তীর দখল, শিল্প ও গৃহস্থালি বর্জ্য, পলি জমা, প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়া এবং দুর্বল তদারকি প্রধান সমস্যা হিসেবে উঠে এসেছে।

গবেষণা অনুযায়ী, ঢাকার জলাভূমি হ্রাসের মূল কারণ ভূমি ভরাট, দখল, বর্জ্য ও পয়ঃবর্জ্য দূষণ, অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও দুর্বল আইন প্রয়োগ। এর সঙ্গে রয়েছে ভূমির রেকর্ড ও সীমানাসংক্রান্ত জটিলতা, প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়ের অভাব, রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী মহলের চাপ এবং জনসচেতনতার ঘাটতি। মডেলভিত্তিক বিশ্লেষণে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে, বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে অবশিষ্ট জলাভূমি আরও সংকুচিত হতে পারে।

উপস্থাপনায় গবেষক জলাভূমি সংরক্ষণে বেশ কয়েকটি সুপারিশ তুলে ধরেন। এর মধ্যে রয়েছে জলাভূমি ও খাল ব্যবস্থাপনায় সমন্বিত ও ক্ষমতাসম্পন্ন কর্তৃপক্ষ বা বিশেষায়িত ইউনিট গঠন; নদী, খাল, পুকুর, লেক ও মার্শের সীমানা স্থায়ীভাবে নির্ধারণ; নিয়মিত খনন ও পুনঃখনন; বর্জ্য ও পয়ঃবর্জ্য নিয়ন্ত্রণ; জিআইএসভিত্তিক হালনাগাদ তথ্যভান্ডার তৈরি ও নিয়মিত পর্যবেক্ষণ; দখলমুক্ত জমি পুনরায় দখল রোধ; ব্যবস্থাপনায় স্থানীয় জনগণকে যুক্ত করা এবং নগর পরিকল্পনায় জলাধার ও রিটেনশন এরিয়া বাধ্যতামূলকভাবে সংরক্ষণ।

সেমিনারে উপস্থিত ছিলেন বিভাগের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আলামিন হক। এ ছাড়া অধ্যাপক ড. হাসিনা আখতার, সহযোগী অধ্যাপক ড. শবনম সারমিন লুনা, ড. মো. মহিউদ্দিন, ড. রিফাত মাহমুদ, সহযোগী অধ্যাপক ড. রেফাত নাসের, নাহরীন জান্নাত হোসেন ও খন্দকার তানভীর হোসেনসহ বিভাগের শিক্ষক ও গবেষকেরা উপস্থিত ছিলেন। অন্যান্য বিভাগের শিক্ষক, গবেষক ও শিক্ষার্থীরাও সেমিনারে অংশ নেন।

উপস্থিত শিক্ষক, গবেষক ও শিক্ষার্থীরা গবেষণার পদ্ধতি, ফলাফল ও সুপারিশ নিয়ে আলোচনা করেন এবং গবেষণার মানোন্নয়নে বিভিন্ন পরামর্শ দেন। বক্তারা বলেন, দ্রুত নগরায়ণ, জলাবদ্ধতা, তাপদাহ ও পরিবেশগত ঝুঁকির প্রেক্ষাপটে ঢাকার জলাভূমি সংরক্ষণ এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁদের মতে, গবেষণাটি নগর পরিকল্পনা, জলাভূমি ব্যবস্থাপনা, জলাবদ্ধতা নিরসন ও পরিবেশ সংরক্ষণে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে।


বিপ্লবী বার্তা

প্রকাশক
শেখ মাহমুদ উজ্জ্বল
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক
কাইয়ুম তালুকদার (কানন)
উপদেষ্টা সম্পাদক
ড. জাহিদ আহমেদ চৌধুরী

কপিরাইট © ২০২৬ । বিপ্লবী বার্তা