জাবি শিক্ষার্থীদের তথ্য ফাঁস: মেধাবৃত্তির নামে অভিনব প্রতারণা
ছবিঃ বিপ্লবী বার্তা
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহার করে ‘মেধাবৃত্তি’র নামে একটি প্রতারক চক্র অর্থ আত্মসাৎ করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। চক্রটি শিক্ষার্থীদের নাম, বিভাগ, বর্ষ ও মা-বাবার নামসহ ব্যক্তিগত তথ্য জানিয়ে বিশ্বাস অর্জন করে অভিভাবকদের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। এ ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও ব্যাংক কর্তৃপক্ষ একে অপরের ওপর দায় চাপাচ্ছে।


​ভুক্তভোগী ও বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের ৫৪তম ব্যাচের শিক্ষার্থী সাজিয়া আফরিনের বাবার মুঠোফোনে কল করে এক ব্যক্তি নিজেকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের একজন বলে পরিচয় দেন। তিনি সাজিয়ার নাম, বিভাগ ও বর্ষসহ সব তথ্য উল্লেখ করে জানান, মেধাবৃত্তির টাকা নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে। সমাধানের জন্য ব্যাংক হিসাব নম্বর ও ওটিপি চাওয়া হয়। সন্তানের সঠিক তথ্য জানার কারণে সাজিয়ার বাবা বিশ্বাস করে ওটিপি দিলে তার হিসাব থেকে ১০ হাজার টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়।


​ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী সাজিয়া আফরিন বলেন, “লোকটি নিজেকে জাবি থেকে বলছে দাবি করে আমার সব ডিটেইলস জানায়। নাম-পরিচয় জানার কারণে বাবা বিশ্বাস করেন।”


​একই কৌশলে চারুকলা বিভাগের ৪৮তম ব্যাচের শিক্ষার্থী আকিবা মোস্তফার অভিভাবকের কাছ থেকে ৩৬ হাজার টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। আকিবা বলেন, “আমার বাবার ফোনে একটি অচেনা নম্বর থেকে কল আসে। কলকারী নিজেকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক পরিচয় দেয়। সে বলে, আমার স্কলারশিপের টাকা আমার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ঢুকছে না, তাই বাবার অ্যাকাউন্ট নম্বর দিতে। বিষয়টি না বুঝে আমার বাবা-মা তথ্য দিলে ৩৬ হাজার টাকা নিয়ে নেয়। প্রতারকরা আমার ক্যাম্পাসের ব্যাংক অ্যাকাউন্টসহ যাবতীয় তথ্য জানত। এসব তথ্য কীভাবে তাদের কাছে গেল, যদি না ক্যাম্পাস থেকে লিক হয়ে থাকে?”


​এ ধরনের ফোনকল আরও অনেক শিক্ষার্থী পেয়েছেন। ভুক্তভোগীদের বড় অংশ ৪৭, ৪৮ ও ৫৪তম ব্যাচের শিক্ষার্থী। ইনস্টিটিউট অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (আইবিএ-জেইউ) ৪৭তম ব্যাচের শিক্ষার্থী মাহতাব জাবীন অন্ত বলেন, “বৃহস্পতিবার দুপুর পৌনে ২টার দিকে একটি নম্বর থেকে আমার বাবার ফোনে কল আসে। বলা হয়, ২০১৭-১৮ সেশনের অনার্সের ফলাফলের ভিত্তিতে ইউজিসির যে স্কলারশিপ পাওয়ার কথা, সেই টাকা নাকি ফর্মে উল্লেখ করা অগ্রণী ব্যাংকে যাবে না। প্রাইম ব্যাংক অথবা অন্য কোনো ব্যাংকের এটিএম কার্ড থাকলে সেটিতে যাবে। এ সময় আমার নাম, বাবা-মায়ের নাম, বিদ্যালয়ের নাম ও অ্যাকাউন্ট নম্বর চাওয়া হয়। পরে ট্রু-কলার অ্যাপে তাদের নাম দেখে বুঝতে পারি, এটি প্রতারণা।”


​মাহতাব জাবীনের দাবি, প্রতারকেরা তার বাবা-মায়ের নাম ও অগ্রণী ব্যাংকের হিসাব নম্বরসহ সব ব্যক্তিগত তথ্য জানত। এসব তথ্য রেজিস্ট্রার ভবন থেকেই ফাঁস হওয়ার আশঙ্কা করছেন তিনি।


​শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবন অথবা সংশ্লিষ্ট ব্যাংক থেকেই এসব সংবেদনশীল তথ্য ফাঁস হয়েছে। তবে প্রশাসন ও ব্যাংক দুই পক্ষই দায় অস্বীকার করছে।


​বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনের উচ্চশিক্ষা ও বৃত্তি শাখার ডেপুটি রেজিস্ট্রার লুৎফর রহমান আরিফ বলেন, “আমাদের অফিস থেকে এমন কিছু হওয়ার সুযোগ নেই। কারা বৃত্তি পেয়েছে, সেই তথ্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়। সেখান থেকেই প্রতারকরা তথ্য পেতে পারে। তবে ওয়েবসাইটে শুধু বৃত্তিপ্রাপ্তদের নাম থাকে। বাবা-মায়ের নাম বা ব্যাংক তথ্য সেখানে নেই। এসব তথ্য ভর্তি-সংক্রান্ত কাগজে শিক্ষা শাখায় জমা দেওয়া হয়।”


​অন্যদিকে শিক্ষা শাখার ডেপুটি রেজিস্ট্রার সৈয়দ মোহাম্মদ আলী রেজা বলেন, “আমাদের এখান থেকে তথ্য লিক হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার সময় যে ফর্ম পূরণ করা হয়, সেখানে বাবা-মায়ের নাম, নমিনি ও ব্যক্তিগত তথ্য দেওয়া থাকে। সেখান থেকেই তথ্য বের হতে পারে।”


​জাবির ভর্তি, পরীক্ষা ও বৃত্তিসংক্রান্ত সব আর্থিক লেনদেন ক্যাম্পাসের অগ্রণী ব্যাংকের মাধ্যমে হয়। এ বিষয়ে অগ্রণী ব্যাংকের সহকারী মহাব্যবস্থাপক ও জাবি শাখা প্রধান মো. আব্দুর রহমান বলেন, “আমাদের কাছে শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত তথ্য থাকে না। বৃত্তির টাকা প্রশাসন থেকে আমাদের ব্যাংকে আসে। আমাদের সার্ভার কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত। যদি এখান থেকে তথ্য লিক হতো, তাহলে সবার টাকাই চুরি হতো।”


​সার্বিক বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. আবদুর রব বলেন, “তথ্য ফাঁস ও প্রতারণামূলক কলের বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। আমরা উদ্বিগ্ন। ভুক্তভোগীরা অভিযোগ দিলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”


​বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার এ বি এম আজিজুর রহমান বলেন, “এটি অত্যন্ত সেনসিটিভ ইস্যু। শিক্ষার্থীদের অভিযোগের ভিত্তিতে আমরা স্টেপ নেব। পুলিশ প্রশাসনের সহায়তা চাইলে বিশ্ববিদ্যালয় সর্বাত্মক সহযোগিতা করবে।”