ছবিঃ বিপ্লবী বার্তা
‘দিগন্তে চলো শব্দ যেথায় সূর্যসত্য’ এই স্লোগান ধারণ করে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) ‘কালো দিবস’ পালন করেছে আবৃত্তি সংগঠন ধ্বনি। ২০১০ সালে সংগঠনটির কক্ষে অগ্নিসংযোগের ঘটনার প্রতিবাদে প্রতিবছর ২৭ নভেম্বর দিবসটি পালন করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় বৃহস্পতিবার মোমবাতি প্রজ্বলনসহ নানা কর্মসূচির মাধ্যমে দিনটি পালিত হয়েছে।
সন্ধ্যা ছয়টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র (টিএসসি) থেকে একটি মৌন মিছিল বের করা হয়। জাহাঙ্গীরনগর সাংস্কৃতিক জোটের সহযোগিতায় মিছিলটি জহির রায়হান মিলনায়তনের সামনে দিয়ে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের পাদদেশে গিয়ে শেষ হয়। পরে সেখানে এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ও ধ্বনির উপদেষ্টা মো. খোরশেদ আলম, প্রক্টর এ কে এম রাশিদুল আলমসহ ধ্বনি ও জাহাঙ্গীরনগর সাংস্কৃতিক জোটের সাবেক ও বর্তমান কর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
আলোচনা সভায় অধ্যাপক মো. খোরশেদ আলম বলেন, “সবসময় যেটা ঘটে এসেছে যে শাসক যারা, তারা সবসময় দমন করে রাখতে চায়। তাদের নিপীড়নকে বজায় রাখার জন্য তারা সবচেয়ে বড় হাতিয়ারটা যাদের উপর চালায়, তারা হচ্ছে সংস্কৃতিকর্মী। সেই কর্মী বাহিনীরা যেভাবে আক্রান্ত হয়েছিল ২০১০ সালে, সেটি কালো ইতিহাস হিসেবে ইতিহাস স্মরণ করবে। এভাবে মানুষের উপর আক্রমণ করা যায়, এভাবে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া যায়। এ যেন অন্য দেশের শাসক যখন ছিল সেই সময়ে। যেভাবে অন্য দেশের উপর আক্রমণ করে সে দেশের লাইব্রেরি, সেই দেশের মানুষের জ্ঞানগৃহগুলো জ্বালিয়ে দিত। ঠিক তেমনিভাবে ধ্বনির যে জ্ঞানগৃহে তারা সাধনা করে, সেই ঘরটাকে পুড়িয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু ফিনিক্স পাখির মতো এই যে জাগরণ, সেই জাগরণে কিন্তু ধ্বনি নিজেকে ধরে রেখেছে। এবং সেই নিভে যাওয়া প্রদীপকে আবার প্রজ্জ্বলিত করেছে এবং করে যাচ্ছে। এটি গভীর আনন্দের বিষয়।”
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর এ কে এম রাশিদুল আলম বলেন, “ধনীর যে তৎকালীন যে কার্যালয় ছিল, সেই কার্যালয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়েছিল। তৎকালীন যিনি উপাচার্য ছিলেন, তিনি নিজের দাম্ভিকতায়, নিজের অহংকারে মত্ত ছিলেন। তার একটি বছর পরেই তাকে ক্ষমতাচ্যুত হতে হয়েছিল। এবং তিনি তৎকালীন ছাত্র সংগঠনের যারা ছিলেন, যারা এই কাজগুলো করেছেন, তাদেরকে প্রশ্রয় দিয়েছিলেন। আজকে যেহেতু ২৭শে নভেম্বর, আমি এই ধরনের কর্মকাণ্ডের নিন্দা জ্ঞাপন করছি। আমরা মনে করি, এই দিনটিকে আমরা সকলে স্মরণ রাখব এবং ভবিষ্যতে এই ধরনের অপকর্মের সাথে যারা যুক্ত হবে, তাদেরকে আমরা সম্মিলিতভাবে প্রতিরোধ করব।”
সমাপনী বক্তব্যে ধ্বনির সভাপতি দেবাঞ্জনা দেব বলেন, “ধ্বনি আবৃত্তি নিয়ে কাজ করে। কিন্তু তার সঙ্গে সমাজের যত অসঙ্গতি এবং সাংস্কৃতিক অঙ্গ নিয়ে যেসব বাধা আসে এবং প্রতিরোধ আসে তার বিরুদ্ধে ধ্বনি সবসময় কাজ করে গেছে এবং কাজ করে যাবে। ফিনিক্স পাখির মত আমরা একদিন আগুনে ছিলাম এবং বারবার সেই আগুন আমাদের ধ্বংসের প্রতীক না হয়ে আমাদের পুনর্জন্মের প্রতীক হয়েছে। আর জাহাঙ্গীরনগর সাংস্কৃতিক অঙ্গনে, জাহাঙ্গীরনগর সাংস্কৃতিক অঙ্গনে যে অংশ নিচ্ছে ধনী এবং যে কাজ করে যাচ্ছে তা অব্যাহত আমরা রাখবো।”
আলোচনা শেষে সাংস্কৃতিক পর্ব অনুষ্ঠিত হয়। এতে অংশ নেন ধ্বনি, জলসিঁড়ি ও জাহাঙ্গীরনগর থিয়েটারের (অডিটোরিয়াম) কর্মীরা। এ সময় ধ্বনির আবৃত্তি প্রযোজনা ‘হৈ হৈ রব, ঐ ভৈরব ডাকে’ মঞ্চস্থ হয়।
সংগঠনটির সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তৎকালীন উপাচার্য শরীফ এনামুল কবিরের অপরিকল্পিত উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলন চলছিল। ওই আন্দোলনে ধ্বনি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে। এর জের ধরে ২০১০ সালের ২৭ নভেম্বর টিএসসিতে ধ্বনির কার্যালয়ে (৯ নম্বর কক্ষ) আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। ওই অগ্নিকাণ্ডে সংগঠনটির অসংখ্য বই, কাগজপত্র ও পাণ্ডুলিপি পুড়ে যায়। এরপর ২০১১ সাল থেকে প্রতিবছর দিনটিকে কালো দিবস হিসেবে পালন করে আসছে ধ্বনি ও জাহাঙ্গীরনগর সাংস্কৃতিক জোট।
এ বিষয়ে জাহাঙ্গীরনগর সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি ফাইজা মেহজাবিন প্রিয়ন্তী বলেন, “২০১০ সালে ধ্বনির কক্ষে আগুন দেওয়া হয়। সেই পুড়ে যাওয়া ছাই থেকে ধ্বনির কর্মীরা আবারো ফিনিক্সের মত জেগে ওঠে। ধ্বনির বিনাশ ঘটেনি। ধ্বনির বিনাশ ঘটানো যায় না। কারণ ধ্বনি কিংবা আমরা যারা সংস্কৃতি চর্চা করি তারা চর্চা করি শুভ বোধের। এই শুভ বোধের কোন শেষ নেই। শুভবোধ এক প্রজন্ম থেকে পরের প্রজন্মে সঞ্চালিত হয়।”

