বিপ্লবী বার্তা

মূল পাতা

স্বাস্থ্য

চার লাখ মানুষের জন্য চিকিৎসক ৮ জন, বিকল যন্ত্রপাতি ও চার বছর ধরে অস্ত্রোপচার বন্ধ- দূরাবস্থায় রায়পুর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স

চার লাখ মানুষের জন্য চিকিৎসক ৮ জন, বিকল যন্ত্রপাতি ও চার বছর ধরে অস্ত্রোপচার বন্ধ- দূরাবস্থায় রায়পুর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স
ছবিঃ বিপ্লবী বার্তা

চার লাখ মানুষের চিকিৎসাসেবার অন্যতম প্রধান সরকারি প্রতিষ্ঠান লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। ৫০ শয্যার এ হাসপাতালে চিকিৎসক ও জনবল সংকট, রোগ নির্ণয়ের যন্ত্রপাতি বিকল এবং দীর্ঘদিন ধরে অস্ত্রোপচার কার্যক্রম বন্ধ থাকায় ব্যাহত হচ্ছে চিকিৎসাসেবা। প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাতে না পেরে দূরদূরান্ত থেকে আসা রোগীদের যেতে হচ্ছে বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে। এতে বাড়ছে চিকিৎসার ব্যয়, দুর্ভোগ ও ভোগান্তি।

হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, ৫০ শয্যার এ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসকের অনুমোদিত পদ রয়েছে ১৬টি। এর মধ্যে আটজন চিকিৎসক প্রেষণে অন্য হাসপাতালে কর্মরত। ফলে হাসপাতালে দায়িত্ব পালন করছেন মাত্র আটজন চিকিৎসক। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন একজন শিশু বিশেষজ্ঞ ও একজন মেডিসিন বিশেষজ্ঞ। গাইনি, চর্ম, অর্থোপেডিক ও সার্জারিসহ বিভিন্ন বিভাগে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সংকট থাকায় প্রয়োজনীয় সেবা পেতে সমস্যায় পড়ছেন রোগীরা।

চিকিৎসাসেবার পাশাপাশি রোগ নির্ণয়ের যন্ত্রপাতি নিয়েও রয়েছে সংকট। হাসপাতালের ডিজিটাল এক্স-রে মেশিন সাত দিন ধরে বিকল রয়েছে। আলট্রাসনোগ্রাফি মেশিন নষ্ট হয়ে আছে দুই বছর ধরে। অন্যদিকে, গত চার বছর ধরে বন্ধ রয়েছে অস্ত্রোপচার কার্যক্রম। ফলে এসব সেবা নিতে রোগীদের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এতে বাড়তি অর্থ ব্যয়ের পাশাপাশি সময়ও নষ্ট হচ্ছে তাঁদের।
হাসপাতালে নার্সের পদ রয়েছে ৩২টি। এর বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ১৮ জন। এ ছাড়া উপজেলার ১০টি ইউনিয়নের ২৮টি কমিউনিটি ক্লিনিকেও চিকিৎসক ও জনবল সংকট রয়েছে বলে জানা গেছে। হাসপাতালের ভবনগুলোর স্যাঁতসেঁতে ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশ নিয়েও অভিযোগ রয়েছে রোগী ও স্বজনদের।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০০৮ সালে রায়পুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ৩১ শয্যা থেকে ৫০ শয্যায় উন্নীত করা হয়। তবে দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও প্রয়োজনীয় চিকিৎসক ও জনবল নিশ্চিত করা হয়নি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে চারজন চিকিৎসকের মাধ্যমে ফি নিয়ে বৈকালিক স্বাস্থ্যসেবা চালু করা হলেও বর্তমানে সেই কার্যক্রমও বন্ধ রয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, গাইনি চিকিৎসকসহ প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নিয়োগ দেওয়া হলে প্রতিদিন ৫০ থেকে ৭০ জন গর্ভবতী নারীকে চিকিৎসাসেবা দেওয়া সম্ভব হতে পারে। তবে জনবল সংকটের কারণে এ ধরনের সেবা সম্প্রসারণ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

সোমবার দুপুর ১২টার দিকে সরেজমিনে হাসপাতালে গিয়ে কয়েকজন রোগীর স্বজনের সঙ্গে কথা হয়। তাঁদের একজন খুশবু আক্তার। তিনি জানান, হাসপাতালে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করাতে না পেরে বাইরে থেকে এক্স-রে করাতে হয়েছে। এতে তাঁর ৪০০ টাকা খরচ হয়েছে। গাইনি, অর্থোপেডিক, মেডিসিন ও সার্জারিসহ বিভিন্ন বিভাগের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অভাবেও রোগীদের দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে বলে জানান তিনি।

রোগীদের কয়েকজনের অভিযোগ, হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পরও অনেক সময় সময়মতো চিকিৎসকের দেখা পাওয়া যায় না। নার্সদের বিরুদ্ধে অসহযোগিতা ও দুর্ব্যবহারের অভিযোগও করেছেন কেউ কেউ। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট নার্স ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা যুক্ত করা প্রয়োজন।
হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ও উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. নাইমা নুসরাত জাবিনের কর্মস্থলে উপস্থিতি নিয়েও কয়েকজন রোগী অভিযোগ করেন। তাঁদের দাবি, সোমবার দুপুরে তাঁকে হাসপাতালে পাওয়া যায়নি।

এ বিষয়ে মুঠোফোনে ডা. নাইমা নুসরাত জাবিন বলেন, চিকিৎসক ও জনবল সংকটের কারণে বহির্বিভাগ ও অন্তর্বিভাগের রোগীদের মানসম্মত সেবা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। আটজন চিকিৎসক প্রেষণে রয়েছেন। বিষয়টি সিভিল সার্জনসহ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। তাঁর বাসা নোয়াখালীর মাইজদীতে হওয়ায় সরকারি গাড়িতে যাতায়াত করতে হয় বলেও জানান তিনি।

লক্ষ্মীপুরের সিভিল সার্জন ডা. বাহারুল আলম বলেন, তিন মাস আগে রায়পুর হাসপাতাল থেকে পদোন্নতি পেয়ে তিনি সিভিল সার্জন হিসেবে যোগ দিয়েছেন। রায়পুর হাসপাতালে গাইনি চিকিৎসকসহ প্রয়োজনীয় জনবল সংকটের বিষয়টি স্থানীয় সংসদ সদস্য ও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।

দীর্ঘদিন ধরে চলমান এসব সংকট নিরসনে দ্রুত চিকিৎসক ও নার্স নিয়োগ, বিকল যন্ত্রপাতি সচল এবং অস্ত্রোপচার কার্যক্রম পুনরায় চালুর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাঁদের প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেবে, যাতে রায়পুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সাধারণ মানুষ প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা পেতে পারেন।

স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স

আপনার মতামত লিখুন

বিপ্লবী বার্তা

শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬


চার লাখ মানুষের জন্য চিকিৎসক ৮ জন, বিকল যন্ত্রপাতি ও চার বছর ধরে অস্ত্রোপচার বন্ধ- দূরাবস্থায় রায়পুর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স

প্রকাশের তারিখ : ২৯ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

চার লাখ মানুষের চিকিৎসাসেবার অন্যতম প্রধান সরকারি প্রতিষ্ঠান লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। ৫০ শয্যার এ হাসপাতালে চিকিৎসক ও জনবল সংকট, রোগ নির্ণয়ের যন্ত্রপাতি বিকল এবং দীর্ঘদিন ধরে অস্ত্রোপচার কার্যক্রম বন্ধ থাকায় ব্যাহত হচ্ছে চিকিৎসাসেবা। প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাতে না পেরে দূরদূরান্ত থেকে আসা রোগীদের যেতে হচ্ছে বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে। এতে বাড়ছে চিকিৎসার ব্যয়, দুর্ভোগ ও ভোগান্তি।

হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, ৫০ শয্যার এ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসকের অনুমোদিত পদ রয়েছে ১৬টি। এর মধ্যে আটজন চিকিৎসক প্রেষণে অন্য হাসপাতালে কর্মরত। ফলে হাসপাতালে দায়িত্ব পালন করছেন মাত্র আটজন চিকিৎসক। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন একজন শিশু বিশেষজ্ঞ ও একজন মেডিসিন বিশেষজ্ঞ। গাইনি, চর্ম, অর্থোপেডিক ও সার্জারিসহ বিভিন্ন বিভাগে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সংকট থাকায় প্রয়োজনীয় সেবা পেতে সমস্যায় পড়ছেন রোগীরা।

চিকিৎসাসেবার পাশাপাশি রোগ নির্ণয়ের যন্ত্রপাতি নিয়েও রয়েছে সংকট। হাসপাতালের ডিজিটাল এক্স-রে মেশিন সাত দিন ধরে বিকল রয়েছে। আলট্রাসনোগ্রাফি মেশিন নষ্ট হয়ে আছে দুই বছর ধরে। অন্যদিকে, গত চার বছর ধরে বন্ধ রয়েছে অস্ত্রোপচার কার্যক্রম। ফলে এসব সেবা নিতে রোগীদের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এতে বাড়তি অর্থ ব্যয়ের পাশাপাশি সময়ও নষ্ট হচ্ছে তাঁদের।
হাসপাতালে নার্সের পদ রয়েছে ৩২টি। এর বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ১৮ জন। এ ছাড়া উপজেলার ১০টি ইউনিয়নের ২৮টি কমিউনিটি ক্লিনিকেও চিকিৎসক ও জনবল সংকট রয়েছে বলে জানা গেছে। হাসপাতালের ভবনগুলোর স্যাঁতসেঁতে ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশ নিয়েও অভিযোগ রয়েছে রোগী ও স্বজনদের।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০০৮ সালে রায়পুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ৩১ শয্যা থেকে ৫০ শয্যায় উন্নীত করা হয়। তবে দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও প্রয়োজনীয় চিকিৎসক ও জনবল নিশ্চিত করা হয়নি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে চারজন চিকিৎসকের মাধ্যমে ফি নিয়ে বৈকালিক স্বাস্থ্যসেবা চালু করা হলেও বর্তমানে সেই কার্যক্রমও বন্ধ রয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, গাইনি চিকিৎসকসহ প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নিয়োগ দেওয়া হলে প্রতিদিন ৫০ থেকে ৭০ জন গর্ভবতী নারীকে চিকিৎসাসেবা দেওয়া সম্ভব হতে পারে। তবে জনবল সংকটের কারণে এ ধরনের সেবা সম্প্রসারণ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

সোমবার দুপুর ১২টার দিকে সরেজমিনে হাসপাতালে গিয়ে কয়েকজন রোগীর স্বজনের সঙ্গে কথা হয়। তাঁদের একজন খুশবু আক্তার। তিনি জানান, হাসপাতালে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করাতে না পেরে বাইরে থেকে এক্স-রে করাতে হয়েছে। এতে তাঁর ৪০০ টাকা খরচ হয়েছে। গাইনি, অর্থোপেডিক, মেডিসিন ও সার্জারিসহ বিভিন্ন বিভাগের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অভাবেও রোগীদের দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে বলে জানান তিনি।

রোগীদের কয়েকজনের অভিযোগ, হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পরও অনেক সময় সময়মতো চিকিৎসকের দেখা পাওয়া যায় না। নার্সদের বিরুদ্ধে অসহযোগিতা ও দুর্ব্যবহারের অভিযোগও করেছেন কেউ কেউ। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট নার্স ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা যুক্ত করা প্রয়োজন।
হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ও উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. নাইমা নুসরাত জাবিনের কর্মস্থলে উপস্থিতি নিয়েও কয়েকজন রোগী অভিযোগ করেন। তাঁদের দাবি, সোমবার দুপুরে তাঁকে হাসপাতালে পাওয়া যায়নি।

এ বিষয়ে মুঠোফোনে ডা. নাইমা নুসরাত জাবিন বলেন, চিকিৎসক ও জনবল সংকটের কারণে বহির্বিভাগ ও অন্তর্বিভাগের রোগীদের মানসম্মত সেবা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। আটজন চিকিৎসক প্রেষণে রয়েছেন। বিষয়টি সিভিল সার্জনসহ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। তাঁর বাসা নোয়াখালীর মাইজদীতে হওয়ায় সরকারি গাড়িতে যাতায়াত করতে হয় বলেও জানান তিনি।

লক্ষ্মীপুরের সিভিল সার্জন ডা. বাহারুল আলম বলেন, তিন মাস আগে রায়পুর হাসপাতাল থেকে পদোন্নতি পেয়ে তিনি সিভিল সার্জন হিসেবে যোগ দিয়েছেন। রায়পুর হাসপাতালে গাইনি চিকিৎসকসহ প্রয়োজনীয় জনবল সংকটের বিষয়টি স্থানীয় সংসদ সদস্য ও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।

দীর্ঘদিন ধরে চলমান এসব সংকট নিরসনে দ্রুত চিকিৎসক ও নার্স নিয়োগ, বিকল যন্ত্রপাতি সচল এবং অস্ত্রোপচার কার্যক্রম পুনরায় চালুর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাঁদের প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেবে, যাতে রায়পুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সাধারণ মানুষ প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা পেতে পারেন।


বিপ্লবী বার্তা

প্রকাশক
শেখ মাহমুদ উজ্জ্বল
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক
কাইয়ুম তালুকদার (কানন)
উপদেষ্টা সম্পাদক
ড. জাহিদ আহমেদ চৌধুরী

কপিরাইট © ২০২৬ । বিপ্লবী বার্তা