শারদীয় দুর্গাপূজা সামনে রেখে কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার ছিনাই ইউনিয়নের বৈদ্যেরবাজার এখন যেন জমে উঠেছে প্রতিমার হাট। দুর্গাসহ বিভিন্ন দেব-দেবীর প্রতিমা তৈরিতে দিন-রাত ব্যস্ত সময় পার করছেন কারিগররা। কোথাও চলছে মাটির শেষ প্রলেপ দেওয়ার কাজ, কোথাও শুকিয়ে যাওয়া প্রতিমায় পড়ছে রঙের আঁচড়। এরই মধ্যে তৈরি প্রতিমা কিনতে বিভিন্ন এলাকা থেকে ছুটে আসছেন ক্রেতারাও।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বৈদ্যেরবাজার এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে প্রতিমা তৈরির ঐতিহ্য রয়েছে। স্থানীয় চাহিদার পাশাপাশি আশপাশের বিভিন্ন জেলা থেকে প্রতিমার চাহিদা থাকায় প্রতিবছর এখানে একাধিক কারখানায় প্রতিমা তৈরি করা হয়। এ বছরও বাজারটিতে দেড় শতাধিক প্রতিমা তৈরির কাজ চলছে বলে জানিয়েছেন কারিগররা।
খড়, মাটি, বাঁশ, কাঠ ও সুতলি দিয়ে তৈরি প্রতিমার কাঠামো ইতোমধ্যে প্রস্তুত হয়েছে। এখন চলছে মাটির শেষ প্রলেপ, শুকানো ও রঙের কাজ। দুর্গাপূজা যতই ঘনিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে কারিগরদের ব্যস্ততা। পাশাপাশি প্রতিমা দেখতে ও কিনতে ক্রেতাদের আনাগোনাও বেড়েছে।
কারিগরদের তথ্যমতে, প্রতিমার আকার ও নকশাভেদে দাম পড়ছে প্রায় ১৮ হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত। ইতোমধ্যে রংপুর, গাইবান্ধা, লালমনিরহাটসহ বিভিন্ন এলাকার পূজামণ্ডপ কমিটি এখান থেকে প্রতিমা কেনার জন্য অর্ডার দিয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, বৈদ্যেরবাজারে প্রতিমা তৈরির ঐতিহ্য গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বৈদ্যনাথ মালাকারের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। প্রায় ৩৫ বছর ধরে তিনি নিজ বাড়িতে প্রতিমা তৈরি করে বিক্রি করেছেন। তাঁর হাত ধরে এবং স্থানীয় চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আশপাশের অনেক কারিগরও এ পেশায় যুক্ত হয়েছেন।
কারিগর অজয় চন্দ্র রায় ও তাঁর ছেলে অন্তর চন্দ্র রায় এ বছর ২০টি প্রতিমা তৈরির অর্ডার পেয়েছেন। এরই মধ্যে সব প্রতিমার কাঠামো ও মাটির কাজ শেষ হয়েছে। নয়টির রঙের কাজও সম্পন্ন হয়েছে। তাঁরা জানান, এ বছর প্রতিমা তৈরির খড়, মাটি, বাঁশ, কাঠসহ বিভিন্ন উপকরণের দাম বেড়েছে। ফলে গত বছরের তুলনায় এবার লাভ কম হবে।
কারিগর বাবলু রায় ও সুভাষ চন্দ্র রায়ও এ বছর ১০টি প্রতিমা তৈরির কাজ করছেন। দুর্গাপূজা ঘনিয়ে আসায় শেষ মুহূর্তের কাজে তাঁরাও এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন।
বৈদ্যনাথ মালাকারের ছেলে মিঠু মালাকার এ বছর সাতটি প্রতিমা তৈরি করেছেন। তাঁর তৈরি প্রতিমাগুলোর কোনো কোনোটিতে অসুর, বাঘ, মহিষ ও সাপের অবয়ব রয়েছে। মাটির কাজ শেষ হওয়ায় এখন চলছে রঙের প্রস্তুতি।
মিঠু মালাকার বলেন, “প্রতিটি প্রতিমা তৈরিতে প্রায় ১৫ হাজার টাকা খরচ হচ্ছে। প্রতিটি ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকায় বিক্রি হবে বলে আশা করছি।”
আরেক কারিগর তপন মালাকারও এ বছর সাতটি প্রতিমা তৈরি করেছেন। রঙের কাজ শুরুর আগেই তিনটি প্রতিমা ২৫ থেকে ২৮ হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছে। তিনি বলেন, “প্রতিমা মণ্ডপে বসানোর পর রঙের কাজ করালে ক্রেতাকে আরও প্রায় ৫ হাজার টাকা খরচ করতে হয়।”
কারিগর নরেশ চন্দ্র মালাকার ও রিপন রায় জানান, একটি প্রতিমা তৈরিতে ছয়জন শ্রমিকের ১০ থেকে ১২ দিন সময় লাগে। দুর্গাসহ বিভিন্ন দেব-দেবীর প্রতিমা তৈরি করেন তাঁরা। সারা বছরই কমবেশি কাজ থাকায় প্রতিমা তৈরি তাঁদের আয়ের অন্যতম উৎস। তবে উপকরণের দাম বেড়ে যাওয়ায় এবার গত বছরের তুলনায় লাভ কম হবে বলে জানান তাঁরা।
স্থানীয় বাসিন্দা তরুণ কুমার রায় ও শ্যামল চন্দ্র রায় বলেন, প্রায় চার মাস আগে থেকেই বৈদ্যেরবাজার এলাকায় প্রতিমা তৈরির কাজ শুরু হয়। স্থানীয় পূজামণ্ডপের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি দূর-দূরান্তের মানুষও এখান থেকে প্রতিমা কিনে নিয়ে যান। প্রতিমা তৈরির কাজ দেখতে প্রতিদিন বিভিন্ন এলাকার মানুষও এখানে আসেন।
উলিপুরের বকুলতলা পূজামণ্ডপ কমিটির সদস্য উত্তম সরকার জানান, তাঁরা বৈদ্যেরবাজার থেকে ২৮ হাজার টাকায় একটি প্রতিমা কিনেছেন। তিনি বলেন, “গ্রামের পূজামণ্ডপগুলোর আর্থিক সামর্থ্য সীমিত। অর্ডার দিয়ে প্রতিমা তৈরি করালে খরচ বেশি পড়ে। তাই তুলনামূলক কম দামে এখান থেকে প্রতিমা কিনেছি।”
রংপুর নগরের আটিয়াটারী কালীমন্দিরের জন্য ২৫ হাজার টাকায় প্রতিমা কিনেছেন সঞ্জিত কুমার। তাঁর মতে, ছোট পূজামণ্ডপগুলোর জন্য বৈদ্যেরবাজারের এই প্রতিমার হাট কম খরচে প্রতিমা কেনার সুযোগ তৈরি করেছে।
কারিগরদের আশা, শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে এ বছর বৈদ্যেরবাজার থেকে অন্তত ১৫০টি প্রতিমা বিক্রি হবে। পূজার সময় যত ঘনিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে তাঁদের ব্যস্ততা। নিপুণ হাতের ছোঁয়ায় খড়, মাটি ও বাঁশের কাঠামো ধীরে ধীরে রূপ নিচ্ছে দুর্গাসহ বিভিন্ন দেব-দেবীর প্রতিমায়। তবে প্রতিমা তৈরির উপকরণের দাম বেড়ে যাওয়ায় আগের তুলনায় লাভের হার কমেছে বলে জানিয়েছেন কারিগররা।

বুধবার, ০৭ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৭ অক্টোবর ২০২৬
শারদীয় দুর্গাপূজা সামনে রেখে কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার ছিনাই ইউনিয়নের বৈদ্যেরবাজার এখন যেন জমে উঠেছে প্রতিমার হাট। দুর্গাসহ বিভিন্ন দেব-দেবীর প্রতিমা তৈরিতে দিন-রাত ব্যস্ত সময় পার করছেন কারিগররা। কোথাও চলছে মাটির শেষ প্রলেপ দেওয়ার কাজ, কোথাও শুকিয়ে যাওয়া প্রতিমায় পড়ছে রঙের আঁচড়। এরই মধ্যে তৈরি প্রতিমা কিনতে বিভিন্ন এলাকা থেকে ছুটে আসছেন ক্রেতারাও।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বৈদ্যেরবাজার এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে প্রতিমা তৈরির ঐতিহ্য রয়েছে। স্থানীয় চাহিদার পাশাপাশি আশপাশের বিভিন্ন জেলা থেকে প্রতিমার চাহিদা থাকায় প্রতিবছর এখানে একাধিক কারখানায় প্রতিমা তৈরি করা হয়। এ বছরও বাজারটিতে দেড় শতাধিক প্রতিমা তৈরির কাজ চলছে বলে জানিয়েছেন কারিগররা।
খড়, মাটি, বাঁশ, কাঠ ও সুতলি দিয়ে তৈরি প্রতিমার কাঠামো ইতোমধ্যে প্রস্তুত হয়েছে। এখন চলছে মাটির শেষ প্রলেপ, শুকানো ও রঙের কাজ। দুর্গাপূজা যতই ঘনিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে কারিগরদের ব্যস্ততা। পাশাপাশি প্রতিমা দেখতে ও কিনতে ক্রেতাদের আনাগোনাও বেড়েছে।
কারিগরদের তথ্যমতে, প্রতিমার আকার ও নকশাভেদে দাম পড়ছে প্রায় ১৮ হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত। ইতোমধ্যে রংপুর, গাইবান্ধা, লালমনিরহাটসহ বিভিন্ন এলাকার পূজামণ্ডপ কমিটি এখান থেকে প্রতিমা কেনার জন্য অর্ডার দিয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, বৈদ্যেরবাজারে প্রতিমা তৈরির ঐতিহ্য গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বৈদ্যনাথ মালাকারের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। প্রায় ৩৫ বছর ধরে তিনি নিজ বাড়িতে প্রতিমা তৈরি করে বিক্রি করেছেন। তাঁর হাত ধরে এবং স্থানীয় চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আশপাশের অনেক কারিগরও এ পেশায় যুক্ত হয়েছেন।
কারিগর অজয় চন্দ্র রায় ও তাঁর ছেলে অন্তর চন্দ্র রায় এ বছর ২০টি প্রতিমা তৈরির অর্ডার পেয়েছেন। এরই মধ্যে সব প্রতিমার কাঠামো ও মাটির কাজ শেষ হয়েছে। নয়টির রঙের কাজও সম্পন্ন হয়েছে। তাঁরা জানান, এ বছর প্রতিমা তৈরির খড়, মাটি, বাঁশ, কাঠসহ বিভিন্ন উপকরণের দাম বেড়েছে। ফলে গত বছরের তুলনায় এবার লাভ কম হবে।
কারিগর বাবলু রায় ও সুভাষ চন্দ্র রায়ও এ বছর ১০টি প্রতিমা তৈরির কাজ করছেন। দুর্গাপূজা ঘনিয়ে আসায় শেষ মুহূর্তের কাজে তাঁরাও এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন।
বৈদ্যনাথ মালাকারের ছেলে মিঠু মালাকার এ বছর সাতটি প্রতিমা তৈরি করেছেন। তাঁর তৈরি প্রতিমাগুলোর কোনো কোনোটিতে অসুর, বাঘ, মহিষ ও সাপের অবয়ব রয়েছে। মাটির কাজ শেষ হওয়ায় এখন চলছে রঙের প্রস্তুতি।
মিঠু মালাকার বলেন, “প্রতিটি প্রতিমা তৈরিতে প্রায় ১৫ হাজার টাকা খরচ হচ্ছে। প্রতিটি ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকায় বিক্রি হবে বলে আশা করছি।”
আরেক কারিগর তপন মালাকারও এ বছর সাতটি প্রতিমা তৈরি করেছেন। রঙের কাজ শুরুর আগেই তিনটি প্রতিমা ২৫ থেকে ২৮ হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছে। তিনি বলেন, “প্রতিমা মণ্ডপে বসানোর পর রঙের কাজ করালে ক্রেতাকে আরও প্রায় ৫ হাজার টাকা খরচ করতে হয়।”
কারিগর নরেশ চন্দ্র মালাকার ও রিপন রায় জানান, একটি প্রতিমা তৈরিতে ছয়জন শ্রমিকের ১০ থেকে ১২ দিন সময় লাগে। দুর্গাসহ বিভিন্ন দেব-দেবীর প্রতিমা তৈরি করেন তাঁরা। সারা বছরই কমবেশি কাজ থাকায় প্রতিমা তৈরি তাঁদের আয়ের অন্যতম উৎস। তবে উপকরণের দাম বেড়ে যাওয়ায় এবার গত বছরের তুলনায় লাভ কম হবে বলে জানান তাঁরা।
স্থানীয় বাসিন্দা তরুণ কুমার রায় ও শ্যামল চন্দ্র রায় বলেন, প্রায় চার মাস আগে থেকেই বৈদ্যেরবাজার এলাকায় প্রতিমা তৈরির কাজ শুরু হয়। স্থানীয় পূজামণ্ডপের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি দূর-দূরান্তের মানুষও এখান থেকে প্রতিমা কিনে নিয়ে যান। প্রতিমা তৈরির কাজ দেখতে প্রতিদিন বিভিন্ন এলাকার মানুষও এখানে আসেন।
উলিপুরের বকুলতলা পূজামণ্ডপ কমিটির সদস্য উত্তম সরকার জানান, তাঁরা বৈদ্যেরবাজার থেকে ২৮ হাজার টাকায় একটি প্রতিমা কিনেছেন। তিনি বলেন, “গ্রামের পূজামণ্ডপগুলোর আর্থিক সামর্থ্য সীমিত। অর্ডার দিয়ে প্রতিমা তৈরি করালে খরচ বেশি পড়ে। তাই তুলনামূলক কম দামে এখান থেকে প্রতিমা কিনেছি।”
রংপুর নগরের আটিয়াটারী কালীমন্দিরের জন্য ২৫ হাজার টাকায় প্রতিমা কিনেছেন সঞ্জিত কুমার। তাঁর মতে, ছোট পূজামণ্ডপগুলোর জন্য বৈদ্যেরবাজারের এই প্রতিমার হাট কম খরচে প্রতিমা কেনার সুযোগ তৈরি করেছে।
কারিগরদের আশা, শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে এ বছর বৈদ্যেরবাজার থেকে অন্তত ১৫০টি প্রতিমা বিক্রি হবে। পূজার সময় যত ঘনিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে তাঁদের ব্যস্ততা। নিপুণ হাতের ছোঁয়ায় খড়, মাটি ও বাঁশের কাঠামো ধীরে ধীরে রূপ নিচ্ছে দুর্গাসহ বিভিন্ন দেব-দেবীর প্রতিমায়। তবে প্রতিমা তৈরির উপকরণের দাম বেড়ে যাওয়ায় আগের তুলনায় লাভের হার কমেছে বলে জানিয়েছেন কারিগররা।

আপনার মতামত লিখুন