মুদ্রাস্ফীতি বনাম কর্মসংস্থান: ২০২৬-এর কঠিন অর্থনৈতিক সমীকরণ
ছবিঃ বিপ্লবী বার্তা

২০২৬ সালের এই জানুয়ারিতে দাঁড়িয়ে যখন আমরা দেশের অর্থনীতির নাড়ি নক্ষত্র মাপার চেষ্টা করছি, তখন দুটি শব্দ আমাদের নীতিনির্ধারকদের কপালে চিন্তার ভাঁজ আরও গভীর করে দিচ্ছে—মুদ্রাস্ফীতি ও কর্মসংস্থান। অর্থনীতির পাঠ্যবইয়ে এই দুটির মধ্যে যে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্কের (ফিলিপস কার্ভের তত্ত্ব অনুযায়ী) কথা বলা হয়, বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে তা যেন এক জটিল ধাঁধায় পরিণত হয়েছে। একদিকে আকাশছোঁয়া বাজারদর সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতাকে পিষ্ট করছে, অন্যদিকে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের বড় একটি অংশ এখনো কর্মসংস্থানের সংকটে দিগভ্রান্ত। ২০২৬ সালটি বাংলাদেশের জন্য কেবল একটি ক্যালেন্ডার বর্ষ নয়, বরং এটি এলডিসি (স্বল্পোন্নত দেশ) থেকে উত্তরণের চূড়ান্ত প্রস্তুতির বছর। আর এই মাহেন্দ্রক্ষণেই অর্থনীতি এক দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জের মুখে।

 মুদ্রাস্ফীতির যাঁতাকলে সাধারণ মানুষ

গত কয়েক বছরে মুদ্রাস্ফীতি আমাদের নিত্যসঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০২৫ সালের শেষার্ধ থেকে শুরু করে ২০২৬-এর এই শুরু পর্যন্ত খাদ্য মুদ্রাস্ফীতি বাড়তির দিকে ছিল। এর মানে হলো, মানুষের আয় যে হারে বাড়ছে, ব্যয়ের গতি তার চেয়ে অনেক গুণ বেশি। চাল, ডাল, তেল থেকে শুরু করে পিয়াজ—সবকিছুর দামই সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।

 মুদ্রাস্ফীতির এই উল্লম্ফনের পেছনে কেবল বিশ্ববাজারের অস্থিরতা বা ডলার সংকট দায়ী নয়; বরং অভ্যন্তরীণ বাজার ব্যবস্থাপনার ত্রুটি, শক্তিশালী সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য এবং সরবরাহ চেইনের অদক্ষতাও সমানভাবে অপরাধী। যখন বাজারে মুদ্রার সরবরাহ কমানোর জন্য সুদের হার বাড়ানো হয় (সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি), তখন বিনিয়োগ থমকে যায়। আর বিনিয়োগ থমকে যাওয়ার অর্থ হলো নতুন কর্মসংস্থান তৈরি না হওয়া। এখানেই তৈরি হচ্ছে সেই মরণফাঁদ—দাম কমাতে গিয়ে আমরা কি তবে কর্মসংস্থানের সুযোগ হারিয়ে ফেলছি?

কর্মসংস্থান: পরিসংখ্যানের আড়ালে লুকানো আর্তনাদ

সরকারি পরিসংখ্যান মাঝেমধ্যেই বেকারত্বের হার হ্রাসের সুখবর দেয়, কিন্তু রাজপথের বা পাবলিক লাইব্রেরির সামনে বিসিএস বা ব্যাংক জব শিকারিদের দীর্ঘ লাইন অন্য কথা বলে। বাংলাদেশে বর্তমানে কর্মসংস্থানের প্রধান সংকট হলো 'কোয়ালিটি এমপ্লয়মেন্ট' বা মানসম্মত কাজের অভাব।

 আমাদের প্রবৃদ্ধি হচ্ছে, কিন্তু সেই প্রবৃদ্ধি কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারছে না (Jobless Growth)। ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে বিনিয়োগ স্থবির হয়ে আছে। পোশাক শিল্পের ওপর অতিনির্ভরশীলতা আমাদের অর্থনীতিকে নাজুক করে তুলছে। ২০২৬ সালে এলডিসি উত্তরণের পর আমরা যখন বিভিন্ন শুল্কমুক্ত সুবিধা হারাব, তখন এই কর্মসংস্থান পরিস্থিতি আরও সংকটে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (SME), যা কর্মসংস্থানের বড় উৎস, তা এখন ঋণের উচ্চ সুদ আর কাঁচামালের চড়া দামের কারণে ধুঁকছে।

 ২০২৬-এর বিশেষ চ্যালেঞ্জ: এলডিসি উত্তরণ ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট

২০২৬ সাল বাংলাদেশের জন্য একটি 'এসিড টেস্ট'। এই বছর থেকে আমাদের রপ্তানি বাণিজ্যে নতুন ধরনের প্রতিযোগিতা শুরু হবে। এতদিন আমরা যে 'প্রেফারেনশিয়াল ট্রিটমেন্ট' পেতাম, তা সংকুচিত হবে। এর ফলে যদি রপ্তানি আয় কমে যায়, তবে সরাসরি প্রভাব পড়বে পোশাক কারখানার লাখ লাখ শ্রমিকের ওপর।

পাশাপাশি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) এবং চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের ধাক্কা আমাদের অদক্ষ শ্রমবাজারকে হুমকির মুখে ফেলছে। একদিকে মুদ্রাস্ফীতির কারণে জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ছে, ফলে শ্রমিকরা মজুরি বৃদ্ধির দাবি তুলছে। অন্যদিকে, কারখানার মালিকরা আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকার জন্য উৎপাদন খরচ কমাতে হিমশিম খাচ্ছে। এই দ্বিমুখী চাপে ২০২৬ সালে শ্রম অসন্তোষের একটি ঝুঁকি থেকেই যায়।

 নীতিনির্ধারণী সংকট: হাত যখন বাঁধা

বাংলাদেশ ব্যাংক বর্তমানে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর মুদ্রানীতি অনুসরণ করছে। সুদের হার বৃদ্ধির ফলে ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে ব্যবসা করা এখন ব্যয়বহুল। বড় উদ্যোক্তারা নতুন কারখানা করতে ভয় পাচ্ছেন, আর ছোটরা টিকে থাকতেই হিমশিম খাচ্ছেন।

 কিন্তু মুদ্রাস্ফীতি কি কেবল সুদের হার বাড়িয়ে কমানো সম্ভব? উত্তর হলো—না। আমাদের উৎপাদন খরচ কমানোর দিকে নজর দিতে হবে। জ্বালানি তেলের দাম, বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ এবং বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি করা না গেলে উৎপাদন খরচ কমবে না। আর উৎপাদন খরচ না কমলে বাজারে জিনিসের দামও কমবে না। অন্যদিকে, বিদেশি বিনিয়োগ (FDI) আকর্ষণে আমাদের ব্যর্থতা কর্মসংস্থান সংকটের অন্যতম কারণ। বিনিয়োগকারীরা স্থিতিশীল ট্যাক্স পলিসি এবং রাজনৈতিক নিশ্চয়তা চায়। ২০২৬ সালে এই নিশ্চয়তা নিশ্চিত করাই হবে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ।

 উত্তরণের পথ কী?

এই সংকটময় পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য আমাদের 'শর্টকাট' চিন্তা বাদ দিতে হবে। প্রথম আলোর সম্পাদকীয় পাতায় আমরা বারবার যা বলে আসছি, তা হলো কাঠামোগত সংস্কার।

 ১. বাজার সিন্ডিকেট ভাঙা: কেবল টিসিবির ট্রাক দিয়ে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। আমদানিকারক থেকে খুচরা বিক্রেতা পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা আনতে হবে। প্রতিযোগিতা কমিশনকে নখদন্তহীন বাঘের বদলে কার্যকর প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করতে হবে। ২. দক্ষতা বৃদ্ধি: আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে বাজারের চাহিদার সঙ্গে মেলাতে হবে। লাখ লাখ সাধারণ গ্র্যাজুয়েট তৈরি না করে কারিগরি ও আইটি দক্ষতাসম্পন্ন জনশক্তি গড়ে তুলতে হবে। ৩. বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ: আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং দুর্নীতির কারণে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বিমুখ হচ্ছেন। ওয়ান-স্টপ সার্ভিসকে কেবল কাগজে-কলমে না রেখে বাস্তবে কার্যকর করতে হবে। ৪. সামাজিক সুরক্ষা নেট: মুদ্রাস্ফীতির এই সময়ে নিম্নআয়ের মানুষকে রক্ষা করতে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী আরও বাড়াতে হবে। ওএমএস কার্ডের পরিধি বাড়িয়ে মধ্যবিত্তকেও এর আওতায় আনা জরুরি।

২০২৬ সালের অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হলে আমাদের মুদ্রাস্ফীতি ও কর্মসংস্থান—এই দুই ফ্রন্টেই একসাথে লড়াই করতে হবে। মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কেবল সংকোচনমূলক নীতি নয়, বরং সরবরাহ বৃদ্ধির দিকে নজর দিতে হবে। আর কর্মসংস্থান বাড়াতে হলে বেসরকারি খাতকে আস্থার জায়গায় ফিরিয়ে আনতে হবে।

 মনে রাখতে হবে, পেট খালি থাকলে উন্নয়ন অর্থহীন হয়ে পড়ে। সাধারণ মানুষ জিডিপি প্রবৃদ্ধির গ্রাফ বোঝে না, তারা বোঝে চালের দাম আর মাস শেষে পকেটে আসা বেতনের অঙ্ক। ২০২৬ সাল আমাদের জন্য যেমন সম্ভাবনার, তেমনি এটি সতর্কবার্তা। আমরা যদি সময়মতো সঠিক সংস্কারগুলো করতে না পারি, তবে মুদ্রাস্ফীতি ও বেকারত্বের এই বিষচক্র আমাদের উন্নয়নের সব অর্জনকে ম্লান করে দিতে পারে। রাষ্ট্রকে এখন কেবল বড় বড় প্রকল্পের দিকে নয়, বরং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের দিকে মনোযোগ দিতে হবে। অর্থনীতি যেন কেবল সংখ্যার খেলা না হয়ে মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর হাতিয়ার হয়—২০২৬ সালে এটাই হোক আমাদের প্রত্যাশা।