বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) এক সদস্য সীমান্তে টহল দিচ্ছিলেন। হঠাৎ তার চোখে পড়ে কাঁটাতারের ওপার থেকে একটি প্যাকেট ছুঁড়ে মারা হচ্ছে। সেটি উদ্ধারের পর দেখা গেল ভেতরে হাজার হাজার পিস ইয়াবা। এটি কেবল একটি খণ্ডচিত্র মাত্র। টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া—দেশের মানচিত্রের শিরা-উপশিরায় এখন বিষের মতো ছড়িয়ে পড়েছে মাদক। এই সর্বনাশা কারবার কেবল আমাদের বর্তমানকেই ধুঁকিয়ে মারছে না, বরং দেশের ভবিষ্যৎ অর্থাৎ যুবসমাজকে পঙ্গু করে দিচ্ছে এবং সরাসরি আঘাত হানছে রাষ্ট্রের নিরাপত্তার মূলে।
মাদকের মরণকামড় ও বর্তমান প্রেক্ষাপট
বাংলাদেশে মাদক পরিস্থিতি এখন আর কেবল ‘বড় শহরের সমস্যা’ হয়ে সীমাবদ্ধ নেই। অজপাড়াগাঁয়ের চায়ের দোকান থেকে শুরু করে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের পড়ার টেবিল—সবখানেই হানা দিয়েছে সিন্থেটিক ড্রাগ। গত কয়েক দশকে মাদকের ধরণ বদলেছে ভয়াবহ ভাবে। ফেনসিডিল আর গাঁজা ছাড়িয়ে এখন বাজার দখল করেছে ইয়াবা, আইস (ক্রিস্টাল মেথ) এবং এলএসডির মতো মারাত্মক সব রাসায়নিক মাদক।
পরিসংখ্যান বলছে, দেশে মাদকাসক্তের সংখ্যা এখন ৮০ লাখের কাছাকাছি, যার বড় একটি অংশই তরুণ। তরুণ প্রজন্মের এই বিপথগামিতা কেবল একটি সামাজিক অবক্ষয় নয়, এটি একটি পরিকল্পিত জাতীয় বিপর্যয়। মাদকাসক্ত তরুণ মানেই একটি পরিবারের স্বপ্নভঙ্গ এবং রাষ্ট্রের একটি কার্যকর মানবসম্পদের অপচয়।
ভূ-রাজনীতি ও নিরাপত্তার ঝুঁকি
মাদক বাণিজ্য এখন আর ছিঁচকে অপরাধীদের হাতে সীমাবদ্ধ নেই। এটি একটি বিশাল আন্তর্জাতিক ‘কার্টেল’ বা সিন্ডিকেটের কারবার। বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান একে মাদকের একটি ট্রানজিট পয়েন্টে পরিণত করেছে। পশ্চিমে ‘গোল্ডেন ক্রিসেন্ট’ এবং পূর্বে ‘গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেল’-এর মাঝখানে থাকা বাংলাদেশ এখন মাদক পাচারকারীদের নিরাপদ রুট।
মাদকের এই অবৈধ বাণিজ্য থেকে আসা বিপুল পরিমাণ অর্থ বা 'ব্ল্যাক মানি' সরাসরি জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি। এই অর্থ ব্যবহার করা হচ্ছে অস্ত্র চোরাচালান, চরমপন্থা এবং রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডে। গোয়েন্দা তথ্যানুযায়ী, অনেক ক্ষেত্রে সীমান্ত এলাকায় মাদকের বিনিময়ে অবৈধ অস্ত্র কেনাবেচা হয়। অর্থাৎ মাদক বাণিজ্য এবং সন্ত্রাসবাদ একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। যখন কোনো রাষ্ট্রের যুবশক্তির বড় অংশ নেশায় বুঁদ থাকে, তখন সেই রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষাব্যুহ এমনিতেই দুর্বল হয়ে পড়ে।
একটি দেশের উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি হলো তার তরুণ জনগোষ্ঠী। কিন্তু মাদকের নীল দংশন সেই চালিকাশক্তিকে অচল করে দিচ্ছে। মাদকাসক্তির ফলে বাড়ছে:
পারিবারিক কলহ ও বিচ্ছেদ: মাদকাসক্ত সন্তানের কারণে হাজার হাজার পরিবার আজ ধ্বংসের মুখে। বাবা-মায়ের হাহাকার আর পারিবারিক অশান্তি সমাজকাঠামোকে দুর্বল করে দিচ্ছে।
অপরাধ প্রবণতা: নেশার টাকা জোগাড় করতে গিয়ে একজন তরুণ প্রথমে ঘর থেকে চুরি শুরু করে, যা পরবর্তীতে ছিনতাই, চাঁদাবাজি এমনকি খুনের মতো জঘন্য অপরাধে রূপ নেয়।
স্বাস্থ্য ঝুঁকি: দীর্ঘমেয়াদী মাদক সেবনের ফলে কিডনি বিকল হওয়া, লিভার সিরোসিস এবং মারাত্মক মানসিক অবসাদ দেখা দিচ্ছে। ফলে একটি 'অসুস্থ প্রজন্ম' তৈরি হচ্ছে।
বিশেষ করে সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে মাদক এখন ডালভাতের মতো সহজলভ্য। সেখানে কিশোর গ্যাং কালচার বৃদ্ধির পেছনে মূল জ্বালানি হিসেবে কাজ করছে মাদক।
সিন্ডিকেটের জাল ও প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ
মাদক নির্মূলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিরন্তর কাজ করছে সত্য, কিন্তু শেকড় উপড়ানো সম্ভব হচ্ছে না কেন? এর পেছনে প্রধান কারণ হলো মাদকের ‘গডফাদার’দের ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকা। খুচরা বিক্রেতা বা বাহক ধরা পড়লেও এই ব্যবসার মূল পুঁজিদাতা বা নিয়ন্ত্রকরা থেকে যাচ্ছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। প্রায়ই শোনা যায়, প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় মাদকের কারবার চলে।
এছাড়া মিয়ানমার সীমান্তের রোহিঙ্গা সংকট মাদক পাচারকে আরও ত্বরান্বিত করেছে। বাস্তুচ্যুত বিপুল সংখ্যক মানুষের অসহায়ত্বকে পুঁজি করে মাদক মাফিয়ারা তাদের বাহক হিসেবে ব্যবহার করছে। টেকনাফ সীমান্ত দিয়ে নাফ নদী পার হয়ে আসা ইয়াবার ঢল কোনোভাবেই পুরোপুরি বন্ধ করা যাচ্ছে না।
করণীয়: কেবল অভিযান কি যথেষ্ট?
মাদক নির্মূলে কেবল বন্দুকযুদ্ধ বা গ্রেফতারি পরোয়ানা কোনো স্থায়ী সমাধান দিতে পারবে না। এর জন্য প্রয়োজন একটি সমন্বিত দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা।
১. জিরো টলারেন্স ও আইনি কঠোরতা: মাদক ব্যবসায়ীদের রাজনৈতিক পরিচয় যাই হোক না কেন, তাদের কঠোর শাস্তির আওতায় আনতে হবে। বিশেষ করে যারা অর্থ যোগানদাতা, তাদের বিচার নিশ্চিত করতে হবে। ২. সীমান্ত সুরক্ষা জোরদার: অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ও ড্রোন ব্যবহার করে সীমান্ত নজরদারি বাড়াতে হবে। বিশেষ করে নাফ নদী ও দুর্গম পাহাড়ি এলাকাগুলোতে নজরদারি দ্বিগুণ করা প্রয়োজন। ৩. সামাজিক প্রতিরোধ ও সচেতনতা: পরিবার থেকে সচেতনতা শুরু করতে হবে। সন্তানদের ওপর নজর রাখা, তাদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা এবং নৈতিক শিক্ষার ওপর জোর দিতে হবে। ৪. পুনর্বাসন কেন্দ্র স্থাপন: যারা ইতিমধ্যে আসক্ত হয়ে পড়েছেন, তাদের অপরাধী হিসেবে না দেখে রোগী হিসেবে দেখতে হবে। সরকারি উদ্যোগে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে আধুনিক ও মানসম্মত পুনর্বাসন কেন্দ্র গড়ে তুলতে হবে। ৫. সাংস্কৃতিক জাগরণ: পাড়ায় পাড়ায় খেলার মাঠ, লাইব্রেরি এবং সাংস্কৃতিক কেন্দ্র সক্রিয় করতে হবে যাতে তরুণরা সৃজনশীল কাজে ব্যস্ত থাকার সুযোগ পায়। অলস মস্তিস্কই শয়তানের কারখানা।
শেষ কথা
মাদক
কেবল একজন ব্যক্তিকে মারে না, একটি রাষ্ট্রকে ভেতর থেকে কুরে কুরে খায়। আমরা যদি ২০৪১ সালের মধ্যে একটি উন্নত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশের
স্বপ্ন দেখি, তবে সেই স্বপ্নে কোনোভাবেই মাদকের ঠাঁই হতে পারে না। মাদককে ‘না’ বলা কেবল স্লোগান নয়, এটি এখন আমাদের টিকে থাকার লড়াই। যুবসমাজকে বাঁচাতে এবং রাষ্ট্রের নিরাপত্তা অক্ষুণ্ণ রাখতে রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবারকে একযোগে
যুদ্ধে নামতে হবে। এখনই সময় মাদকের শেকড় উপড়ে ফেলার, নয়তো আগামীর ইতিহাস আমাদের ক্ষমা করবে না।

