যানজটে নাকাল ঢাকার মানুষ
ছবিঃ বিপ্লবী বার্তা
ঢাকায় বের হওয়ার আগে মানুষ এখন আর দূরত্ব নয় সময় হিসাব করে। কারণ এই শহরে এক কিলোমিটার পথ পার হওয়াটাই অনেক সময় যুদ্ধের মতো।


বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ শহরগুলোর মধ্যে একটি  ঢাকা । যা এখন পরিচিত হয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে ধীরগতির শহর নামে । 


যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ব্যুরো অব ইকোনমিক রিসার্চ (NBER)–এর গবেষণায় উঠে এসেছে এই চিত্র। শুধু ঢাকা নয়, তালিকায় রয়েছে বাংলাদেশের আরও চার শহর চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, খুলনা ও কুমিল্লা।


ঢাকা এদেশের প্রাণকেন্দ্র। দেশের পরিকল্পনা তৈরি হয় ঢাকাকে ঘিরে। আর সে কারণেই সরকারি ও বেসরকারি অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের কার্যালয় রাজধানীতে। ফলে গোটা দেশ থেকে সাধারণ মানুষ প্রতিনিয়ত ভিড় করছে ঢাকায়। আর  তাদের যাতায়াতের জন্য নতুন নতুন গণপরিবহন নামছে রাস্তায়। কিন্তু সেই তুলনায় প্রসস্ত আর পর্যাপ্ত সড়ক ব্যবস্থা গড়ে উঠছে না। যার কারণে অসহনীয় যানজটে পড়তে হচ্ছে নগরবাসীকে।


যেখানে একটি আধুনিক নগরীতে মোট আয়তনের ২০ থেকে ২৫ শতাংশ রাস্তা বা সড়ক থাকা প্রয়োজন। সেখানে ঢাকায় আছে মাত্র ৭ থেকে ৮ শতাংশ। প্রয়োজনের মাত্র এক-তৃতীয়াংশ সড়ক আছে এ শহরে। অন্যদিকে ট্রাফিক বিভাগের হিসাবমতে, ৩০ শতাংশ বা তারও বেশি দখল হয়ে আছে অবৈধ পার্কিং এবং নানা ধরনের দখলদারদের হাতে। এ ছাড়া ফুটপাত হকারদের দখলে থাকায় প্রধান সড়কেই হেঁটে চলেন নগরবাসী। ফলে যানজটের সঙ্গে আছে জনজট। ১৫ শতাংশ যাত্রী প্রাইভেট গাড়িতে যাতায়াত করেন। প্রাইভেটকারের দখলে থাকে ৭০ শতাংশেরও বেশি সড়ক। বাকি ৮৫ শতাংশ যাত্রী অন্য ধরনের গণপরিবহন ব্যবহার করেন। ঢাকায় সুনির্দিষ্ট পার্কিং ব্যবস্থা না থাকায় অফিস এবং ব্যবসা-বাণিজ্য চলাকালে ৮০ শতাংশ গাড়ি ব্যস্ত সড়কে যত্রতত্র পার্ক করা হয়। তা ছাড়া ঢাকা শহরের ভেতর দিয়ে রেললাইন যাওয়ার ফলে রাস্তা বন্ধ করে ট্রেন যাওয়ার ব্যবস্থা করায় তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়। দেশের বিশিষ্ট ব্যক্তি, রাজনীতিবিদদের মুভমেন্টের সময় দীর্ঘক্ষণ কিছু কিছু সড়কে যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকায় স্বাভাবিকভাবেই পার্শ্ববর্তী সড়কে সৃষ্টি হয় অসহনীয় যানজট। ঠেলাগাড়ি-বাস একই রাস্তায়। যেমন একই রাস্তায় দ্রুতগামী যানবাহন আর ধীরগতির গাড়ি চলাচল করে, তাও আবার একসঙ্গে। একই সড়কে বাস-মিনিবাস, রিকশা, ঠেলাগাড়ি, ভ্যান, এমনকি ঘোড়ার গাড়িও চলে এবং নিবন্ধিত রিকশার তুলনায় কয়েকগুণ বেশি রিকশা চলাচল করে। ফলে যানবাহনের গতি কমে যায়।


বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত এলাকাগুলোর মধ্যে ঢাকার অবস্থান শীর্ষে। অতিরিক্ত অবকাঠামো, নির্মাণাধীন প্রতিষ্ঠান, পরিবহন ব্যবস্থার কারণে ঢাকার পরিবেশ আজ অসহনীয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মান অনুযায়ী, বাতাসে ভাসমান অত্যন্ত ক্ষুদ্র ধূলিকণার গ্রহণযোগ্য মাত্রা প্রতি ঘনমিটারে ৫ মাইক্রোগ্রাম। অথচ, ঢাকায় এই মাত্রা গড়ে ৮০-১৫০ মাইক্রোগ্রাম, যা গ্রহণযোগ্য মাত্রার ১৬-৩০ গুণ বেশি।


বায়ু দূষণের কারণে মানুষের স্বাস্থ্য ঝুঁকি মাত্রাতিরিক্ত, জানিয়েছে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। বিশেষ করে শ্বাসকষ্ট, যক্ষ্মা, ফুসফুস ক্যান্সার, মাইগ্রেন ও অপ্রত্যাশিত বিকলাঙ্গতার নেপথ্যে রয়েছে এই বায়ু দূষণ। বাংলাদেশ চেস্ট ডিজিজ হাসপাতালের গবেষণা অনুসারে, ঢাকার বাসিন্দাদের মধ্যে শ্বাসকষ্টজনিত রোগের হার দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় ৪২% বেশি। শিশুদের মধ্যে অ্যাজমার প্রবণতা ৩০% বৃদ্ধি পেয়েছে গত এক দশকে। রাজধানীর ৬০% মানুষ কোনো না কোনো শ্বাসজনিত সমস্যায় ভুগছে। ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনের রিপোর্ট অনুযায়ী, বয়স্কদের মধ্যে হার্টের রোগীর সংখ্যা ৩১% বেশি ঢাকায়। একইসঙ্গে, হাইপারটেনশনের রোগীর সংখ্যা অন্য জেলার তুলনায় ঢাকায় ৪৮% বেশি।


নিত্যদিনের যানজট মানুষের ধৈর্যের বাঁধ যেন ভেঙে দেয়। প্রতিযোগিতার এই দুনিয়ায় যানজটের পেছনে চলে যায় এখানকার বাসিন্দাদের জীবনের কয়েক হাজার ঘণ্টা। বিশ্বব্যাংকের তথ্য মতে, ঢাকার যানজটে প্রতিদিন গড়ে ৩.২ ঘণ্টা নষ্ট হয়। এর ফলে সামগ্রিকভাবে দেশের অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলে, তার পরিমাণ প্রায় ৩.৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এটি দেশের মোট জিডিপির ২.৫% এর সমান।


বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের মানসিক ও শারীরিক অবস্থা ভেঙে দেওয়ার কারণ যানজট ও যাতায়াতে অনেক সময় নষ্ট হয়ে যাওয়া। সারাদিন যানজটে ধুলা, ধোঁয়া ও দুর্গন্ধ সহ্য করার কারণে তাদের ক্লান্তি চলে আসে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দেখা গেছে, রাজধানীর ৭৫% শিক্ষার্থী প্রতিদিন যানজটে ২-৪ ঘণ্টা নষ্ট করে। স্বাভাবিকভাবেই এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে তাদের পড়াশোনা, মানসিক স্বাস্থ্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং সামগ্রিক উৎপাদনশীলতা কমে যাচ্ছে।


যানজট এখন আর কেবল যানবাহনের সমস্যা নয়। এটি ঢাকায়  বসবাসকারী মানুষের সময়, অর্থ, স্বাস্থ্য ও জীবনযাত্রার ওপর এক স্থায়ী চাপ।