গণমাধ্যমে নৈতিকতা: সাংবাদিকতার দায় ও সমাজসেবা
ছবিঃ বিপ্লবী বার্তা

‘সংবাদপত্র হলো সমাজের দর্পণ’—এই চিরায়ত বাক্যটি আজ এক কঠিন পরীক্ষার মুখে দাঁড়িয়ে। যে সময়ে আমরা বাস করছি, তাকে বলা হয় তথ্যের অবাধ প্রবাহের যুগ। কিন্তু তথ্যের এই জলোচ্ছ্বাসের মধ্যে ‘সত্য’ কতটুকু আর ‘উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণা’ কতটুকু, তা নির্ণয় করা সাধারণ পাঠকের জন্য দুঃসাধ্য হয়ে পড়েছে। সাংবাদিকতা কেবল একটি পেশা নয়, এটি একটি সামাজিক ব্রত। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সাংবাদিকতার নীতি-নৈতিকতা এবং সমাজসেবামূলক দায়বদ্ধতা নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। গণমাধ্যম কি সত্যিই জনমানুষের কথা বলছে, নাকি কর্পোরেট স্বার্থ আর ক্ষমতার সমীকরণে নিজেদের বিলীন করে দিচ্ছে?

 সাংবাদিকতার মূল স্তম্ভ: সত্যনিষ্ঠা ও নৈতিকতা

সাংবাদিকতার প্রধান শক্তি হলো এর বিশ্বাসযোগ্যতা। একজন সাংবাদিক যখন কোনো সংবাদ পরিবেশন করেন, তখন সমাজের সাধারণ মানুষ সেটিকে ধ্রুব সত্য বলে ধরে নেয়। এই আস্থার মূলে রয়েছে নৈতিকতা। নৈতিকতাহীন সাংবাদিকতা আগ্নেয়াস্ত্রের চেয়েও বিপজ্জনক। এটি একটি সাজানো সমাজকে মুহূর্তেই তছনছ করে দিতে পারে।

 বর্তমানে আমরা দেখছি ‘ব্রেকিং নিউজ’-এর অসুস্থ প্রতিযোগিতা। সবার আগে খবর দেওয়ার নেশায় খবরের সত্যতা যাচাইয়ের ন্যূনতম প্রয়োজনটুকুও অনেক সময় এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে। দীর্ঘ পথচলায় আমরা দেখেছি, সংবাদ কত দ্রুত দেওয়া হলো তার চেয়ে বড় বিষয় হলো সংবাদটি কতটা নির্ভুল। ভুল সংবাদ পরিবেশন করে পরে ‘দুঃখ প্রকাশ’ করাটা নৈতিকতার মানদণ্ডে কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ ততক্ষণে একটি পক্ষ বা ব্যক্তির অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে যায়।

 সমাজসেবা ও সাংবাদিকতার অবিচ্ছেদ্য বন্ধন

সাংবাদিকতাকে বলা হয় রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ। এর অর্থ হলো নির্বাহী বিভাগ, আইন বিভাগ ও বিচার বিভাগ যখন তাদের দায়িত্ব পালনে কোনো বিচ্যুতি ঘটায়, তখন গণমাধ্যম সেটি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। সাংবাদিকতা নিজে সরাসরি রাস্তাঘাট তৈরি করে না বা ক্ষুধার্তের মুখে অন্ন তুলে দেয় না, কিন্তু এটি এমন এক পরিবেশ তৈরি করে যেখানে রাষ্ট্রের সেবামূলক কাজগুলো ত্বরান্বিত হয়।

 একটি সৎ প্রতিবেদন যখন কোনো জরাজীর্ণ সরকারি হাসপাতাল বা অবহেলিত চরাঞ্চলের মানুষের দুঃখ-দুর্দশার কথা তুলে ধরে, তখন প্রশাসনের টনক নড়ে। এই যে জনকল্যাণমূলক কাজের অনুঘটক হিসেবে কাজ করা, এটিই সাংবাদিকতার আসল সমাজসেবা। সাংবাদিকতার দায় হলো শোষিতের পক্ষে কথা বলা এবং শোষকের স্বরূপ উন্মোচন করা। যদি কোনো গণমাধ্যম কেবল বিত্তবান আর ক্ষমতাবানদের গুণগানে ব্যস্ত থাকে, তবে তা আর যা-ই হোক, সাংবাদিকতা হতে পারে না।

 করপোরেট সংস্কৃতি ও সাংবাদিকতার স্বাধীনতা

বর্তমান সময়ে গণমাধ্যমের বড় চ্যালেঞ্জ হলো করপোরেট মালিকানা। অধিকাংশ বড় মিডিয়া হাউজ এখন বড় বড় শিল্প গ্রুপের অংশ। এখানে নৈতিকতার সঙ্গে ব্যবসায়িক স্বার্থের একটি সূক্ষ্ম দ্বন্দ্ব কাজ করে। মালিকপক্ষের স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে অনেক সময় বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা বিসর্জন দেওয়া হয়। বিজ্ঞাপনের চাপের কাছে নতি স্বীকার করে অনেক গুরুত্বপূর্ণ জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট সংবাদ ধামাচাপা পড়ে যায়।

 জাতীয় দৈনিকগুলোর উচিত এই বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসা। কারণ সাংবাদিকতা যদি কোনো বিশেষ মহলের তল্পিবাহক হয়ে পড়ে, তবে সাধারণ মানুষের শেষ আশ্রয়স্থলটুকু হারিয়ে যাবে। একজন সংবাদকর্মীকে মনে রাখতে হবে, তার বেতন মালিক পক্ষ দিলেও তার আসল দায়বদ্ধতা জনগণের কাছে।

 অপসাংবাদিকতা ও ‘ইয়েলো জার্নালিজম’-এর থাবা

হলুদ সাংবাদিকতা বা ইয়েলো জার্নালিজম কোনো নতুন বিষয় নয়, তবে এর আধুনিক রূপটি অত্যন্ত ভয়াবহ। ব্ল্যাকমেইলিং, চরিত্রহনন এবং উদ্দেশ্যমূলকভাবে ভুল তথ্য ছড়ানো এখন এক শ্রেণির সাংবাদিকের মরণনেশায় পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে অনলাইন পোর্টালে চটকদার শিরোনাম দিয়ে ক্লিক বাড়ানোর যে প্রবণতা, তা সাংবাদিকতার গাম্ভীর্যকে নষ্ট করছে।

 সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের উত্থান এই সমস্যাকে আরও জটিল করেছে। এখন যে কেউ একটি ফেসবুক পেজ বা ইউটিউব চ্যানেল খুলে নিজেকে সাংবাদিক দাবি করছেন। কোনো প্রকার গেট-কিপিং বা যাচাই-বাছাই ছাড়াই গুজব ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। মূলধারার গণমাধ্যমকেও অনেক সময় এই ইঁদুর দৌড়ে শামিল হতে দেখা যায়, যা অত্যন্ত দুঃখজনক। মিডিয়া-নৈতিকতা বলে, প্রলোভন বা চাপের মুখে নতি স্বীকার না করে সত্যের পথে অবিচল থাকাই একজন প্রকৃত সাংবাদিকের ধর্ম।

 সাংবাদিকতার সামাজিক দায়বদ্ধতা ও সংকট উত্তরণের পথ

সাংবাদিকতায় নৈতিকতা ফিরিয়ে আনা এবং সমাজসেবামূলক দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে হলে আমাদের কয়েকটি জরুরি পদক্ষেপ নিতে হবে:

 ১. পেশাদারিত্ব ও প্রশিক্ষণ: সাংবাদিকতা এখন আর সখের বিষয় নয়, এটি একটি বিশেষায়িত জ্ঞান। সংবাদকর্মীদের নিয়মিত নৈতিকতা ও সাংবাদিকতার আইন-কানুন বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। বিশেষ করে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে তথ্যের উৎসের সুরক্ষা এবং গোপনীয়তা রক্ষার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

 ২. সেলফ-সেন্সরশিপ বনাম বস্তুনিষ্ঠতা: অনেক সময় ভয়ের কারণে সাংবাদিকরা সত্য বলা থেকে বিরত থাকেন। এই ‘সেলফ-সেন্সরশিপ’ সাংবাদিকতার জন্য ক্যান্সারের মতো। রাষ্ট্র ও সমাজকে এমন পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে যেখানে একজন সাংবাদিক নির্ভয়ে তার কলম চালাতে পারেন।

 ৩. সম্পাদকের স্বাধীনতা: একটি সংবাদপত্রের প্রাণ হলেন সম্পাদক। মালিকপক্ষের হস্তক্ষেপমুক্ত সম্পাদকীয় নীতিমালার চর্চা থাকতে হবে। প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক স্বার্থ আর সম্পাদকীয় নীতিকে আলাদা রাখতে হবে।

 ৪. ডিজিটাল লিটারেসি: পাঠকদেরও সচেতন হতে হবে। কোন সংবাদটি গুজব আর কোনটি সত্য, তা বোঝার ক্ষমতা অর্জন করতে হবে। পাঠকদের এই সচেতনতা তৈরির দায়িত্বও কিন্তু গণমাধ্যমেরই।

 ৫. আইনি কাঠামো ও প্রেস কাউন্সিল: প্রেস কাউন্সিলকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। সাংবাদিকতার নাম ভাঙিয়ে যারা অপকর্ম করছে, তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি পেশাদার সাংবাদিকদের সুরক্ষায় আইনি কাঠামো তৈরি করতে হবে।

 পরিশেষ

সাংবাদিকতা কেবল একটি রুটি-রুজির মাধ্যম নয়, এটি একটি সমাজ পরিবর্তনের হাতিয়ার। কলমের খোঁচায় যেমন একটি বিপ্লব ঘটে যেতে পারে, তেমনি একটি ভুল তথ্যে জ্বলে উঠতে পারে দাঙ্গার আগুন। তাই সাংবাদিকদের কাঁধে পাহাড়সমান দায়িত্ব। এই দায়িত্ব পালনে সততা, সাহস এবং নৈতিকতাই হলো একমাত্র পাথেয়।

 পাঠকরা সবসময় প্রত্যাশা করেন এমন এক সাংবাদিকতার, যা অন্যায়কে প্রশ্রয় দেবে না এবং মানবতার পক্ষে কথা বলবে। গণমাধ্যম যদি তার নৈতিক অবস্থান থেকে বিচ্যুত না হয়, তবেই সমাজসেবার প্রকৃত উদ্দেশ্য সফল হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, ইতিহাস কিন্তু কাউকেই ক্ষমা করে না—না ক্ষমতাবানকে, না সেই সাংবাদিককে যিনি সত্যকে আড়াল করেছিলেন। আগামীর প্রজন্মের জন্য একটি সুস্থ, সুন্দর ও বাসযোগ্য সমাজ বিনির্মাণে নৈতিকতাপূর্ণ সাংবাদিকতার কোনো বিকল্প নেই।