প্রেক্ষাপট ও জনআকাঙ্ক্ষা
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ক্ষমতার পরিবর্তন কখনোই কেবল একটি দল থেকে অন্য দলের কাছে শাসনের ব্যাটন হস্তান্তর ছিল না; বরং এটি অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ছিল রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম, রাজপথের আন্দোলন এবং এক চরম অনিশ্চয়তার মহাকাব্য। তবে সাম্প্রতিক সময়ে আমরা যে পরিবর্তনের সাক্ষী হয়েছি, তা কেবল ক্ষমতার রদবদল নয়, বরং দেশের রাজনৈতিক ডিএনএ বদলে দেওয়ার এক সাহসী প্রচেষ্টার প্রতিফলন। দীর্ঘ সময় ধরে চলে আসা 'পুরনো রাজনীতির' জীর্ণ খোলস ভেঙে এক 'নতুন নেতৃত্বের' উদয় আজ সময়ের দাবি। সাধারণ মানুষ আজ আর কেবল ভোট দেওয়ার যন্ত্র হয়ে থাকতে চায় না; তারা চায় নীতি ও নৈতিকতার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা এক নতুন শাসনব্যবস্থা।
পুরনো রাজনীতির উত্তরাধিকার: সুযোগ ও সীমাবদ্ধতা
আমাদের দেশের পুরনো রাজনীতি বলতে আমরা মূলত বুঝি পরিবারতন্ত্রের প্রভাব, ব্যক্তিবন্দনা এবং প্রতিহিংসার চর্চা। গত কয়েক দশকে দেশে উন্নয়ন হয়েছে সত্য, কিন্তু সেই উন্নয়নের সমান্তরালে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে দুর্নীতি ও ক্ষমতার দাপট। বিরোধী দলকে দমনের মাধ্যমে ক্ষমতাকে নিরঙ্কুশ করার যে সংস্কৃতি গত কয়েক বছরে জেঁকে বসেছিল, তা মূলত পুরনো রাজনীতিরই বিষফল।
পুরনো রাজনীতির প্রধান সীমাবদ্ধতাগুলো ছিল:
• চক্রাকার প্রতিহিংসা: এক দল ক্ষমতায় এলে অন্য দলের ওপর দমন-পীড়ন চালানো এবং পরবর্তী শাসনামলে তার দ্বিগুণ প্রতিশোধ নেওয়ার সংস্কৃতি।
• আদর্শহীনতা: সাধারণ মানুষের স্বার্থের চেয়ে দলীয় ও ব্যক্তিগত স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়া।
• পেশিশক্তির দাপট: ভোটের মাঠ থেকে শুরু করে ক্যাম্পাস—সবখানেই মেধাবী নেতৃত্বের বদলে পেশিশক্তির অধিকারীদের কদর বৃদ্ধি।
নতুন নেতৃত্বের উদয়: তারুণ্যের শক্তি ও মেধার জয়গান
ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে যে, পরিবর্তনের চাকা ঘুরতে শুরু করেছে। এই নতুন নেতৃত্ব কেবল বয়সে তরুণ নয়, বরং চিন্তায় আধুনিক এবং বিশ্বজনীন। তারা কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের লেজুড়বৃত্তি নয়, বরং রাষ্ট্রের মেরামত ও সংস্কারের কথা বলছে। এই নেতৃত্বের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো নৈতিকতা ও স্বচ্ছতা। সাধারণ মানুষ যখন দেখছে যে তরুণরা কোনো ব্যক্তিগত লাভের আশায় নয়, বরং দেশের কল্যাণে রাজপথে জীবন দিচ্ছে, তখন তারা নতুন নেতৃত্বের ওপর আস্থা খুঁজে পাচ্ছে।
নতুন নেতৃত্বের বিশেষত্ব হলো:
• জবাবদিহিতা: তারা মনে করে ক্ষমতা কোনো ভোগের বস্তু নয়, বরং আমানত। প্রতিটি কাজের জন্য জনগণের কাছে জবাবদিহি করার মানসিকতা তাদের রয়েছে।
• মেধাভিত্তিক রাজনীতি: লবিং বা তোষামোদ নয়, বরং মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালনার দর্শন।
• অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র কাঠামো: ধর্ম, বর্ণ ও দল নির্বিশেষে সকলের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করার অঙ্গীকার।
পুরনো বনাম নতুন: সংঘাত না সমন্বয়?
এখন প্রশ্ন উঠছে, এই নতুন নেতৃত্ব কি পুরনো রাজনীতির প্রথাগত কাঠামোর সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারবে? নাকি তারা নিজেরাই পুরনো রাজনীতির আবর্তে হারিয়ে যাবে? দেশের অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদদের দীর্ঘ অভিজ্ঞতাকে অস্বীকার করার উপায় নেই। রাজনীতির মাঠে যে কুটিল চাল আর কূটনীতি থাকে, তা সামলানোর জন্য অভিজ্ঞতার প্রয়োজন রয়েছে। তবে সেই অভিজ্ঞতা যদি কেবল লুটপাট আর স্বৈরতন্ত্রের রক্ষাকবচ হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তবে তা বর্জনীয়।
আদর্শিক অবস্থানে দাঁড়িয়ে বলতে গেলে, আমাদের প্রয়োজন পুরনো অভিজ্ঞতার সঙ্গে নতুন মেধার একটি সুষম সমন্বয়। তবে এই সমন্বয় হতে হবে নতুন নেতৃত্বের মূলনীতি অর্থাৎ—সুশাসন ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থানের ভিত্তিতে। যদি পুরনো রাজনীতিকরা তাদের পুরনো অভ্যাস ত্যাগ করে নতুন যুগের দাবির সঙ্গে নিজেদের মেলাতে পারেন, তবেই দেশ দীর্ঘস্থায়ী সুফল পাবে।
রাষ্ট্র সংস্কার ও আগামীর চ্যালেঞ্জ
একটি দেশের শাসনব্যবস্থা রাতারাতি বদলে ফেলা সম্ভব নয়। প্রতিষ্ঠানগুলোকে (যেমন—নির্বাচন কমিশন, বিচার বিভাগ, পুলিশ প্রশাসন) দলীয় প্রভাবমুক্ত করা অত্যন্ত কঠিন একটি কাজ। নতুন নেতৃত্বের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এই প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনা। পুরনো রাজনীতির ধারক-বাহকরা সহজে তাদের ক্ষমতা ও প্রভাব ছাড়তে চাইবে না। ফলে প্রতি পদে পদে বাধার সৃষ্টি হওয়া স্বাভাবিক।
নতুন নেতৃত্বকে মনে রাখতে হবে, কেবল আবেগের জোরে রাষ্ট্র চলে না। রাষ্ট্রের কাঠামো শক্তিশালী করতে হলে সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ এবং দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার প্রয়োজন। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, বাজার সিন্ডিকেট ভাঙা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখাই হবে তাদের জনপ্রিয়তার আসল পরীক্ষা।
ইতিহাসের সন্ধিক্ষণে বাংলাদেশ
আমরা এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছি। একদিকে রয়েছে পুরনো রাজনীতির চেনা ছক, আর অন্যদিকে সম্ভাবনাময় নতুন নেতৃত্বের স্বপ্ন। দেশের সাধারণ মানুষ আর কোনো মিথ্যা প্রতিশ্রুতি বা বিভাজনের রাজনীতি দেখতে চায় না। তারা চায় একটি বৈষম্যহীন সমাজ, যেখানে কথা বলার স্বাধীনতা থাকবে এবং জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে।
ক্ষমতার এই পরিবর্তন কেবল ক্ষমতার চেয়ার বদল নয়, বরং এটি চেতনার পরিবর্তন। নতুন নেতৃত্বকে প্রমাণ করতে হবে যে তারা কেবল পরিবর্তনের বাহক নয়, বরং তারা নিজেই এক গুণগত পরিবর্তন। যদি তারা সফল হয়, তবে বাংলাদেশ বিশ্বের বুকে এক অনন্য উদাহরণ হয়ে দাঁড়াবে। আর যদি পুরনো রাজনীতি আবারও ছদ্মবেশে ফিরে আসে, তবে জাতির জন্য এর চেয়ে বড় ট্র্যাজেডি আর কিছু হবে না। সময় এসেছে অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে নতুনের হাত ধরে এক সমৃদ্ধ ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ার।

