গণঅভ্যুত্থান ও বাংলাদেশের রাজনৈতিক পুনর্গঠন
ছবিঃ বিপ্লবী বার্তা

বাংলাদেশের ইতিহাসে গণঅভ্যুত্থান কোনো নতুন ঘটনা নয়। ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের ছাত্রজনতা আন্দোলন, নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী গণআন্দোলনসব ক্ষেত্রেই সাধারণ মানুষের সংগ্রাম রাষ্ট্রের গতিপথ পরিবর্তনের প্রধান ইন্ধন হিসেবে কাজ করেছে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে, সাম্প্রতিক গণঅভ্যুত্থানও সেই ধারারই অংশ, কিন্তু এটি শুধু ক্ষমতার দখল বা পরিবর্তনের দাবি নয়। এটি রাষ্ট্র রাজনৈতিক ব্যবস্থার মৌলিক পুনর্গঠনের জন্য একটি স্পষ্ট বার্তা।

গত কয়েক মাসে আমরা লক্ষ্য করেছি, এই গণআন্দোলন আর কোনো একক রাজনৈতিক দলের কর্মসূচি নয়। এটি একটি বহুমাত্রিক সামাজিকরাজনৈতিক আন্দোলন। মূল চালিকাশক্তি হিসেবে দেখা দিয়েছেমূলধারার রাজনৈতিক অসন্তুষ্টি, প্রশাসনিক দুর্নীতি, মুদ্রাস্ফীতি, মূল্যবৃদ্ধি, তরুণ শ্রমজীবী জনগোষ্ঠীর ক্রমবর্ধমান উদ্বেগ, এবং ভোটাধিকার, মতপ্রকাশ নাগরিক অংশগ্রহণের সীমাবদ্ধতা। এই সমস্ত উপাদান একত্র হয়ে একটি বিস্ফোরণ তৈরি করেছে।

গণঅভ্যুত্থানের তাৎপর্য এখানেইএটি শুধুই ক্ষমতার স্থানান্তর নয়, বরং প্রচলিত রাজনৈতিক বন্দোবস্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি জনগণের অসন্তোষের প্রকাশ। দীর্ঘদিন ধরে কেন্দ্রীভূত রাজনীতি, দমনমূলক প্রশাসন অকার্যকর সংসদীয় ব্যবস্থা জনগণকে রাজনীতির মূলধারার থেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছিল। ভোটাধিকার কার্যত অকার্যকর, বিরোধী মত দমন করা হচ্ছে, এবং প্রতিষ্ঠানগুলো জনগণের আস্থার বাইরে চলে গেছে। গণঅভ্যুত্থান এই অবস্থা পরিবর্তনের আহ্বান।

রাজনৈতিক পুনর্গঠন এখন সময়ের সর্বোচ্চ দাবি। তবে পুনর্গঠন মানে শুধুই নতুন সরকার বা নতুন মুখ নয়। এটি মানে রাষ্ট্র পরিচালনার দর্শন, কাঠামো রাজনীতির চর্চার গভীর পরিবর্তন। প্রথমত, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর স্বাধীন করতে হবে। নির্বাচন কমিশন, বিচার বিভাগ, দুর্নীতি দমন কমিশনএসব কেবল কাগজে স্বাধীন থাকলেই হবে না; বাস্তব ক্ষমতা, স্বচ্ছতা এবং জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে।

দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র নিশ্চিত করা আবশ্যক। আমাদের রাজনীতি এখনও ব্যক্তিস্বার্থ পরিবারকেন্দ্রিক। নেতৃত্বের বিকল্প তৈরি না হওয়ায় ক্ষমতার অপব্যবহার এবং দলীয় একনিষ্ঠতার অভাব রাষ্ট্রকে দুর্বল করে। গণঅভ্যুত্থানের বার্তা স্পষ্টরাজনীতি আর কয়েকজনের উত্তরাধিকার হতে পারে না; এটি হতে হবে জনগণের অংশগ্রহণমূলক।

তৃতীয়ত, প্রশাসনিক কাঠামোর সংস্কার অপরিহার্য। বর্তমান ব্যবস্থায় দলীয় আনুগত্যের ভিত্তিতে নিয়োগ, পদোন্নতি সিদ্ধান্ত গ্রহণ একটি বড় সমস্যা। একটি পেশাদার, জবাবদিহিমূলক নাগরিকবান্ধব প্রশাসন ছাড়া গণঅভ্যুত্থানের লক্ষ্য পূর্ণ হবে না। সরকারি নীতিমালা, দুর্নীতি দমন জনসেবা কার্যক্রম যদি স্বচ্ছ না হয়, তবে আন্দোলনের দ্বারা সৃষ্ট আশাবাদ অচিরেই ম্লান হয়ে যাবে।

এছাড়া, তরুণ সমাজের ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ন। সাম্প্রতিক গণঅভ্যুত্থান প্রমাণ করেছেতরুণরা রাজনীতির প্রতি অনীহী নয়, বরং তারা প্রচলিত রাজনীতির প্রতি অনাস্থার কারণে দূরে ছিল। এই গণঅভ্যুত্থানে তরুণরা নেতৃত্ব, পরিকল্পনা সংগঠনের মাধ্যমে আন্দোলনের প্রাণশক্তি হিসেবে ভূমিকা রেখেছে। নতুন রাজনৈতিক কাঠামো যদি তাদের অংশগ্রহণ, মতামত নেতৃত্বের সুযোগ নিশ্চিত করতে পারে, তবে সেটিই হবে সবচেয়ে বড় অর্জন।

তবে ইতিহাস আমাদের সতর্ক করে দেয়গণঅভ্যুত্থানের পর সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো পুরোনো ব্যবস্থার নতুন রূপে ফিরে আসা। ক্ষমতার হাতবদল বা নতুন মুখের আগমন যদি কাঠামোগত সংস্কার এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর শক্তিশালীকরণ না নিয়ে আসে, তবে জনগণের দীর্ঘমেয়াদি প্রত্যাশা পূরণ হবে না। পুনর্গঠনকে সফল করতে হলে শুধুমাত্র ক্ষমতার শীর্ষে নয়, পুরো রাষ্ট্র প্রশাসনের গভীরে পরিবর্তন আনা জরুরি।

গণঅভ্যুত্থান আসলে কোনো শেষ নয়; এটি একটি সূচনা। বাংলাদেশের সামনে এখন এক অনন্য সুযোগ রয়েছেরাষ্ট্র রাজনীতিকে নতুনভাবে কল্পনা করার। এই সুযোগ কাজে লাগাতে পারলে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, জবাবদিহিমূলক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব। আর ব্যর্থ হলে ইতিহাস আবারও আমাদের কাছে প্রশ্ন রাখবেআমরা কি সত্যিই পরিবর্তন চেয়েছিলাম, নাকি শুধু ক্ষমতার বিনিময় ঘটিয়েছিলাম?

এখন সময় রাজনৈতিক নেতা, প্রতিষ্ঠান সাধারণ নাগরিকের মধ্যে সেই ঐক্য এবং নতুন দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করারযা শুধু ক্ষমতার খেলায় সীমাবদ্ধ নয়, বরং দেশের দীর্ঘমেয়াদি প্রগতির ভিত্তি স্থাপন করবে।