বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫৫ বছরের ইতিহাসে রাষ্ট্র গঠন ও অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের পথচলা একে অপরের পরিপূরক। এই দীর্ঘ যাত্রায় রাজনৈতিক পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে পাল্টেছে অর্থনীতির গতিপথও। তবে নব্বইয়ের দশকের শুরুতে বেগম খালেদা জিয়ার শাসনকালকে কেবল রাজনৈতিক ক্ষমতার বদল হিসেবে দেখলে ভুল হবে; এটি ছিল বাংলাদেশের অর্থনীতির খোলস বদলে ফেলার এক যুগান্তকারী অধ্যায়।
খালেদা
জিয়ার শাসনামলের মূল দর্শন ছিল রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে এসে বাজারভিত্তিক ও প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতির দিকে
যাত্রা। ১৯৯১ সালে যখন তিনি ক্ষমতায় আসেন, তখন সদ্য স্বৈরাচারমুক্ত বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক আবাহের পাশাপাশি প্রয়োজন ছিল অর্থনৈতিক মুক্তির। সীমিত উৎপাদনক্ষমতা ও দুর্বল রাজস্ব
কাঠামোর সেই চ্যালেঞ্জিং সময়ে তাঁর সরকার ব্যক্তিখাতকে উন্নয়নের প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। রাষ্ট্র এখানে নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা থেকে সরে এসে 'সহায়কের' ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়, যা ছিল দীর্ঘমেয়াদি
প্রবৃদ্ধির প্রথম সোপান।
বাংলাদেশের
অর্থনীতির মেরুদণ্ড হিসেবে খ্যাত তৈরি পোশাকশিল্পের আজকের এই অবস্থানের পেছনে
নব্বইয়ের দশকের নীতিগত সহায়তা অনস্বীকার্য। যদিও এ শিল্পের যাত্রা
শুরু হয়েছিল আশির দশকে, কিন্তু এর কাঠামোগত ভিত্তি
শক্ত হয় খালেদা জিয়ার
সময়ে। বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধা, ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি
এবং নগদ প্রণোদনার মতো বাস্তবমুখী পদক্ষেপগুলো কোনো বিলাসিতা ছিল না, বরং ছিল সময়ের দাবি। এই নীতিগুলোর ফলেই
বাংলাদেশ বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হয়।
ম্যাক্রো-ইকোনমিক বা সামষ্টিক অর্থনীতির
সংস্কারেও তাঁর সরকার সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছে। ১৯৯১ সালে ভ্যাট বা মূল্য সংযোজন
কর আইন প্রবর্তন ছিল রাজস্ব ব্যবস্থায় এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন।
এর মাধ্যমে করের ভিত্তি যেমন প্রশস্ত হয়েছে, তেমনি উন্নয়ন ব্যয় মেটানোর নিজস্ব সক্ষমতা তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি, বৈদেশিক বাণিজ্যে গতি আনতে ১৯৯৪ সালে কারেন্ট অ্যাকাউন্ট কনভার্টিবিলিটি এবং পরবর্তীতে ২০০৩ সালে ভাসমান বিনিময় হার চালু করার সিদ্ধান্ত ছিল অত্যন্ত দূরদর্শী। এর ফলে বৈদেশিক
মুদ্রাবাজার ও বাণিজ্যে বাংলাদেশ
বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার সক্ষমতা অর্জন করে।
আর্থিক
খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে ব্যাংক কোম্পানি আইন (১৯৯১) ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান
আইন (১৯৯৩) এবং পুঁজিবাজারের জন্য সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) গঠন ছিল প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি গড়ার অন্যতম পদক্ষেপ। যদিও বাস্তবায়ন ও সুশাসনে এখনো
অনেক পথ পাড়ি দেওয়া
বাকি, তবুও কাঠামোগত সংস্কারের শুরুটা হয়েছিল সেখানেই।
অর্থনীতির
কঠিন সমীকরণের বাইরে সামাজিক উন্নয়নেও খালেদা জিয়ার নীতি ছিল মানবিক ও প্রগতিশীল। বিশেষ
করে নারী শিক্ষার প্রসারে ১৯৯৪ সালে উপবৃত্তি চালু করার সিদ্ধান্ত ছিল একটি সামাজিক বিপ্লব, যা নারীদের কর্মসংস্থানে
অংশগ্রহণের পথ সুগম করেছে।
আজকের বাংলাদেশে দাঁড়িয়ে ব্যাংকিং খাতের বিশৃঙ্খলা বা প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, সংস্কার একটি চলমান প্রক্রিয়া। তবে বাংলাদেশের আধুনিক অর্থনীতির যে শক্ত ভিত্তির ওপর আমরা দাঁড়িয়ে আছি, তার নকশা অনেকাংশেই তৈরি হয়েছিল খালেদা জিয়ার শাসনামলে। তাঁর সেই নীতিগত উত্তরাধিকারকে মূল্যায়ন করেই আগামীর অর্থনৈতিক সংস্কার ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার মেলবন্ধন ঘটাতে হবে।

