ঝালকাঠির রাজাপুর উপজেলায় নজিরবিহীন এক জালিয়াতি ও জঘন্য অনিয়মের খবর প্রকাশ্যে এসেছে। কাগজে-কলমে বিদ্যালয় আছে, নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারীও রয়েছেন এবং খাতায় শতাধিক শিক্ষার্থীর নামও লিপিবদ্ধ আছে। তবে বাস্তবে শ্রেণিকক্ষে একজন শিক্ষার্থীরও অস্তিত্ব নেই! পঠন-পাঠনের পরিবর্তে শ্রেণিকক্ষ হয়ে উঠেছে গৃহপালিত ছাগলের অবাধ আশ্রয়স্থল।রাজাপুর উপজেলার মঠবাড়ি ইউনিয়নের বাদুরতলা গ্রামের 'পশ্চিম বাদুরতলা নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়'-এ সম্প্রতি সরেজমিনে অনুসন্ধানে গিয়ে এমন চাঞ্চল্যকর চিত্র ধরা পড়েছে।ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদানের উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত এই নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সরকারি খাতায় শিক্ষার্থী সংখ্যা ১০০-র বেশি। সম্প্রতি সকাল ১১টার দিকে সরেজমিনে বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, মূল ফটকসহ প্রতিটি শ্রেণিকক্ষ ও অফিস কক্ষে তালা ঝুলছে। তবে বাইরে টাঙানো রয়েছে জাতীয় পতাকা। শ্রেণিকক্ষগুলোর অবস্থা অত্যন্ত নোংরা ও জীর্ণশীর্ণ। বসার বেঞ্চগুলো বিশৃঙ্খলভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে, যার ওপর জমে আছে ধুলোবালি, কাদা ও মাকড়সার জাল। মানুষের বদলে বেঞ্চ ও মেঝে জুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে ছাগলের মলমূত্র। ব্ল্যাকবোর্ড ও হোয়াইট বোর্ডে ২০২৪ ও ২০২৫ সালের পুরোনো পাঠের সংকেত লেখা রয়েছে, যা দেখে স্পষ্ট বোঝা যায় যে দীর্ঘদিন ধরে সেখানে কোনো ক্লাস হয়নি।অনুসন্ধানকালে দুপুর ১১টা পার হওয়ার পর সহকারী শিক্ষক অনামিকা মৃত ও রতন লাল মিস্ত্রি বিদ্যালয়ে আসেন। দেরিতে আসার কারণ জানতে চাইলে তারা কোনো জবাব দিতে পারেন নি। উল্টো সাংবাদিকদের উপস্থিতি টের পেয়ে দ্রুত প্রধান শিক্ষক ও অন্যান্যদের ফোনে ডেকে পাঠান। দুপুর ১২টার দিকে প্রধান শিক্ষক মো. আক্তারুজ্জামান বাচ্চু ও সহকারী শিক্ষক মো. হাসান মৃধা বিদ্যালয়ে উপস্থিত হলেও অন্যান্য কর্মচারীদের দেখা মেলেনি। সাংবাদিকরা শিক্ষার্থীদের হাজিরা খাতা দেখতে চাইলে শিক্ষকরা তা দেখাতে ব্যর্থ হন এবং খাতাটি প্রতিষ্ঠাতা আবুবকর সিদ্দিকের বাড়িতে রাখা আছে বলে দাবি করেন। একপর্যায়ে সংবাদ প্রকাশ না করার জন্য প্রধান শিক্ষকের নির্দেশে সহকারী শিক্ষক হাসান মৃধা সাংবাদিকদের উৎকোচ (টাকা) দিয়ে বিষয়টি চেপে যাওয়ার অপচেষ্টা চালান।স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, পশ্চিম বাদুরতলা নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের এই ভুতুড়ে দশা আজ নতুন নয়। বহু বছর ধরে এভাবে জালিয়াতি করে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করা হচ্ছে। স্থানীয় কোনো শিশু এই স্কুলে পড়তে আসে না। অডিট বা কোনো সরকারি কর্মকর্তা আসার কথা থাকলে প্রধান শিক্ষক আক্তারুজ্জামান বাচ্চু ও প্রতিষ্ঠাতা আবুবকর সিদ্দিক ওরফে আবু অন্য এলাকা থেকে ভাড়াটে ছেলে-মেয়ে এনে বেঞ্চে বসিয়ে রাখেন। অভিযোগ রয়েছে, ঝালকাঠি শহর থেকে রিজার্ভ অটোরিকশায় করে টাকার বিনিময়ে ভুয়া শিক্ষার্থী এনে সেখানে পরীক্ষার মহড়াও দেওয়া হয়।বিদ্যালয়টিকে ঘিরে গড়ে উঠেছে পারিবারিক দুর্নীতির এক শক্তিশালী নেটওয়ার্ক। প্রতিষ্ঠাতা আবুবকর সিদ্দিকের পরিবারের ৫ জন সদস্যই এই স্কুলের বিভিন্ন পদে চাকরি করছেন। প্রধান শিক্ষক আক্তারুজ্জামান বাচ্চু তাঁর নিজ ভাইয়ের ছেলে মিজানুর রহমান পারভেজকে পরিচালনা কমিটির সভাপতি বানিয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, পরিচালনা কমিটির তৎকালীন সভাপতিদের স্বাক্ষর জাল করে সরকারি অনুদানের লাখ লাখ টাকা এবং শিক্ষকরা প্রতি মাসে প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা সরকারি বেতন তুলে নিচ্ছেন।প্রতিষ্ঠানের এমন সীমাহীন দুর্নীতির বিষয়ে মুখ খুলেছেন সাবেক সভাপতি হাসনাইন তালুকদার দিবস এবং রাজাপুর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতির সভাপতি ও মঠবাড়ি ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান জাহিদুল ইসলাম জাহিদ। হাসনাইন তালুকদার জানান, ২০০৬ সালে তিনি সভাপতি হওয়ার পর দেখেন স্কুলে কোনো শিক্ষার্থী নেই, ভাড়াটে শিক্ষার্থী এনে নাটক করা হয়। এমনকি সিডরের অনুদানের ৫০ হাজার টাকা তাঁর স্বাক্ষর জাল করে তুলে নেওয়ার পর তিনি তৎকালীন জেলা প্রশাসকের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন।২০১৫ সালে বাধ্য হয়ে পদত্যাগ করা সাবেক সভাপতি জাহিদুল ইসলাম জাহিদ বলেন, "ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হওয়ায় প্রভাব খাটানোর জন্য আমাকে সভাপতি বানানো হয়েছিল। সেখানে কোনো শিক্ষার্থী বা ক্লাস হতো না। পরিস্থিতি বদলাতে ব্যর্থ হয়ে মেয়াদের দুই বছর আগেই পদত্যাগ করি।"অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়ে বর্তমান সভাপতি মো. মিজানুর রহমান পারভেজের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি চরম ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ করে সাংবাদিকদের বলেন, "মানুষ বললে কি আমার ছিঁড়ে যায়! আপনার কাছে বলতে আমি বাধ্য না, যা বলার ডিসি ও শিক্ষা অফিসারকে বলবো।"ভাড়াটে শিক্ষার্থী আনার সত্যতা স্বীকার করে প্রধান শিক্ষক মো. আক্তারুজ্জামান বাচ্চু বলেন, "কাগজে-কলমে ১১০ জন শিক্ষার্থী থাকলেও স্থানীয়রা আসে না। তাই বাধ্য হয়ে মাঝে মাঝে ঝালকাঠি শহর থেকে দুইটি অটোরিকশায় করে শিক্ষার্থী এনে ক্লাস করাতে হয়।"এ বিষয়ে রাজাপুর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. মাহমুদুল হাসান জানান, বিষয়টি জানার পর প্রধান শিক্ষককে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। এক সপ্তাহের পর্যবেক্ষণের পর জবাব সন্তোষজনক না হলে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।ঘটনার তীব্রতায় রাজাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রিফাত আরা মৌরি বলেন, "বিদ্যালয়ের বর্তমান পরিস্থিতির বিষয়ে প্রধান শিক্ষকের ব্যাখ্যা তলব করা হচ্ছে। তদন্ত সাপেক্ষে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"