বিপ্লবী বার্তা

মূল পাতা

সারাদেশ

বাগেরহাটে একসময় চলত ট্রেন, এখন রেলপথজুড়ে দখল-স্থাপনা ঐতিহ্য ফেরানোর দাবি

বাগেরহাটে একসময় চলত ট্রেন, এখন রেলপথজুড়ে দখল-স্থাপনা ঐতিহ্য ফেরানোর দাবি
ছবিঃ বিপ্লবী বার্তা

বাগেরহাটে রেলপথের জায়গা আছে, নেই রেললাইন। কোথাও রেলপথের ওপর গড়ে উঠেছে পিচঢালা সড়ক, কোথাও দখল হয়ে গেছে বসতবাড়ি ও বিভিন্ন স্থাপনায়। আবার কোথাও ঝোপঝাড় আর জঙ্গলে ঢাকা পড়ে আছে একসময়ের রেল যোগাযোগের স্মৃতি। প্রায় ১০৮ বছরের ঐতিহাসিক বাগেরহাট-রূপসা রেলপথের এখন আর কোনো দৃশ্যমান অস্তিত্ব নেই। দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা প্রায় ৩২ কিলোমিটার দীর্ঘ এই রেলপথ পুনরায় চালুর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাঁদের প্রত্যাশা, দেশের রেল যোগাযোগ সম্প্রসারণের উদ্যোগের সঙ্গে বাগেরহাটের ঐতিহ্যবাহী এই রেলপথ পুনরুদ্ধারের বিষয়টিও গুরুত্ব পাবে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, একসময় এই রেলপথ বাগেরহাটের ব্যবসা-বাণিজ্য, কৃষিপণ্য পরিবহন ও সাধারণ মানুষের যাতায়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত। রেল যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিকল্প পরিবহনের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে তাঁদের। এতে পণ্য পরিবহনে সময় ও ব্যয় বাড়ছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। তাঁদের মতে, রেলপথটি পুনরায় চালু করা গেলে বাগেরহাটের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নতুন গতি আসতে পারে।

ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, বাগেরহাট জেলা শহরের নাগেরবাজার থেকে খুলনার পূর্ব রূপসা পর্যন্ত প্রায় ৩২ কিলোমিটার দীর্ঘ এই রেলপথ নির্মাণ করা হয় ১৯১৮ সালে। ব্রিটিশ আমলে নির্মিত রেলপথটি মূলত যাত্রী পরিবহন, ব্যবসায়িক মালামাল ও কৃষিপণ্য আনা-নেওয়ার কাজে ব্যবহৃত হতো। শুরুতে কয়লাচালিত ইঞ্জিনের মাধ্যমে এ পথে ১৩টি যাত্রীবাহী কোচ ও আটটি মালবাহী গাড়ি চলাচল করত বলে জানা যায়।

পরবর্তী সময়ে ১৯৬৯ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান সরকার রেললাইনটি ব্রডগেজে উন্নীত করে এবং ডিজেলচালিত ইঞ্জিন চালু করে। স্বাধীনতার পরও কিছু সংস্কারের মাধ্যমে বাংলাদেশ রেলওয়ের অধীনে রেল যোগাযোগটি চালু ছিল। দেশের মূল রেল নেটওয়ার্ক থেকে বিচ্ছিন্ন এই রেলপথে ছিল ১০টি স্টেশন। এসব স্টেশন ঘিরে একসময় মানুষের যাতায়াত ও স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হতো।

তবে দীর্ঘদিন লোকসানের কারণ দেখিয়ে ১৯৯৮ সালে তৎকালীন সরকার রেললাইনটি বন্ধ ঘোষণা করে। এরপর ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে থাকে রেল যোগাযোগের চিহ্ন। ২০১২ সালে রেলপথের মালামাল নিলামে বিক্রি করে দেওয়া হয়। রেললাইন তুলে নেওয়ার পর অব্যবহৃত জমির অনেক অংশ বেদখল হয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। কোথাও রেলপথের জায়গা ব্যবহার করা হচ্ছে সড়ক হিসেবে, কোথাও গড়ে উঠেছে বসতবাড়ি ও বিভিন্ন স্থাপনা। আবার কোনো কোনো অংশে আগাছা ও ঝোপঝাড়ে ঢেকে গেছে পুরোনো রেলপথ।

দীর্ঘদিন ধরে রেল যোগাযোগ বন্ধ থাকায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা রয়েছে। তাঁদের মতে, রেলপথটি সচল থাকলে কৃষিপণ্য ও ব্যবসায়িক মালামাল পরিবহনে সুবিধা পাওয়া যেত। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের যাতায়াত আরও সহজ হতো। বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের অনেকেই বাগেরহাটের এই ঐতিহাসিক রেল চলাচল দেখেনি। তারা কেবল পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠদের কাছে শুনেছে সেই সময়ের রেলযাত্রার গল্প।

স্থানীয়দের দাবি, রেলপথটি পুনরায় চালুর আগে এর জমি ও অবকাঠামোর বর্তমান অবস্থা নিরূপণ, দখল হওয়া জমি চিহ্নিতকরণ এবং সম্ভাব্যতা যাচাই করা প্রয়োজন। এরপর প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা গ্রহণের মাধ্যমে ঐতিহাসিক এই রেল যোগাযোগ পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। তাঁদের আশা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে।

এ বিষয়ে বাগেরহাট-২ আসনের সংসদ সদস্য শেখ মঞ্জুরুল হক রাহাদ বলেন, আমি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে বিষয়টি জানিয়েছি। আমি চাই, সরকার দ্রুত এই রেলপথ চালু করার উদ্যোগ নিক।

বাগেরহাটবাসীর প্রত্যাশা, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলকে রেল নেটওয়ার্কের আওতায় আনার পরিকল্পনার পাশাপাশি ঐতিহাসিক বাগেরহাট-রূপসা রেলপথ পুনরায় চালুর বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে। দীর্ঘদিন ধরে হারিয়ে যাওয়া রেল যোগাযোগ ফিরে এলে একদিকে যেমন ঐতিহাসিক ঐতিহ্য সংরক্ষিত হবে, অন্যদিকে তেমনি যাতায়াত, কৃষিপণ্য পরিবহন ও ব্যবসা-বাণিজ্যে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। পুরোনো রেলপথে আবারও ট্রেন চলবে, স্টেশনে ফিরবে মানুষের ব্যস্ততা এমন স্বপ্নই দেখছেন বাগেরহাটের মানুষ।

আপনার মতামত লিখুন

বিপ্লবী বার্তা

মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬


বাগেরহাটে একসময় চলত ট্রেন, এখন রেলপথজুড়ে দখল-স্থাপনা ঐতিহ্য ফেরানোর দাবি

প্রকাশের তারিখ : ২৭ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

বাগেরহাটে রেলপথের জায়গা আছে, নেই রেললাইন। কোথাও রেলপথের ওপর গড়ে উঠেছে পিচঢালা সড়ক, কোথাও দখল হয়ে গেছে বসতবাড়ি ও বিভিন্ন স্থাপনায়। আবার কোথাও ঝোপঝাড় আর জঙ্গলে ঢাকা পড়ে আছে একসময়ের রেল যোগাযোগের স্মৃতি। প্রায় ১০৮ বছরের ঐতিহাসিক বাগেরহাট-রূপসা রেলপথের এখন আর কোনো দৃশ্যমান অস্তিত্ব নেই। দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা প্রায় ৩২ কিলোমিটার দীর্ঘ এই রেলপথ পুনরায় চালুর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাঁদের প্রত্যাশা, দেশের রেল যোগাযোগ সম্প্রসারণের উদ্যোগের সঙ্গে বাগেরহাটের ঐতিহ্যবাহী এই রেলপথ পুনরুদ্ধারের বিষয়টিও গুরুত্ব পাবে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, একসময় এই রেলপথ বাগেরহাটের ব্যবসা-বাণিজ্য, কৃষিপণ্য পরিবহন ও সাধারণ মানুষের যাতায়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত। রেল যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিকল্প পরিবহনের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে তাঁদের। এতে পণ্য পরিবহনে সময় ও ব্যয় বাড়ছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। তাঁদের মতে, রেলপথটি পুনরায় চালু করা গেলে বাগেরহাটের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নতুন গতি আসতে পারে।

ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, বাগেরহাট জেলা শহরের নাগেরবাজার থেকে খুলনার পূর্ব রূপসা পর্যন্ত প্রায় ৩২ কিলোমিটার দীর্ঘ এই রেলপথ নির্মাণ করা হয় ১৯১৮ সালে। ব্রিটিশ আমলে নির্মিত রেলপথটি মূলত যাত্রী পরিবহন, ব্যবসায়িক মালামাল ও কৃষিপণ্য আনা-নেওয়ার কাজে ব্যবহৃত হতো। শুরুতে কয়লাচালিত ইঞ্জিনের মাধ্যমে এ পথে ১৩টি যাত্রীবাহী কোচ ও আটটি মালবাহী গাড়ি চলাচল করত বলে জানা যায়।

পরবর্তী সময়ে ১৯৬৯ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান সরকার রেললাইনটি ব্রডগেজে উন্নীত করে এবং ডিজেলচালিত ইঞ্জিন চালু করে। স্বাধীনতার পরও কিছু সংস্কারের মাধ্যমে বাংলাদেশ রেলওয়ের অধীনে রেল যোগাযোগটি চালু ছিল। দেশের মূল রেল নেটওয়ার্ক থেকে বিচ্ছিন্ন এই রেলপথে ছিল ১০টি স্টেশন। এসব স্টেশন ঘিরে একসময় মানুষের যাতায়াত ও স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হতো।

তবে দীর্ঘদিন লোকসানের কারণ দেখিয়ে ১৯৯৮ সালে তৎকালীন সরকার রেললাইনটি বন্ধ ঘোষণা করে। এরপর ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে থাকে রেল যোগাযোগের চিহ্ন। ২০১২ সালে রেলপথের মালামাল নিলামে বিক্রি করে দেওয়া হয়। রেললাইন তুলে নেওয়ার পর অব্যবহৃত জমির অনেক অংশ বেদখল হয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। কোথাও রেলপথের জায়গা ব্যবহার করা হচ্ছে সড়ক হিসেবে, কোথাও গড়ে উঠেছে বসতবাড়ি ও বিভিন্ন স্থাপনা। আবার কোনো কোনো অংশে আগাছা ও ঝোপঝাড়ে ঢেকে গেছে পুরোনো রেলপথ।

দীর্ঘদিন ধরে রেল যোগাযোগ বন্ধ থাকায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা রয়েছে। তাঁদের মতে, রেলপথটি সচল থাকলে কৃষিপণ্য ও ব্যবসায়িক মালামাল পরিবহনে সুবিধা পাওয়া যেত। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের যাতায়াত আরও সহজ হতো। বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের অনেকেই বাগেরহাটের এই ঐতিহাসিক রেল চলাচল দেখেনি। তারা কেবল পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠদের কাছে শুনেছে সেই সময়ের রেলযাত্রার গল্প।

স্থানীয়দের দাবি, রেলপথটি পুনরায় চালুর আগে এর জমি ও অবকাঠামোর বর্তমান অবস্থা নিরূপণ, দখল হওয়া জমি চিহ্নিতকরণ এবং সম্ভাব্যতা যাচাই করা প্রয়োজন। এরপর প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা গ্রহণের মাধ্যমে ঐতিহাসিক এই রেল যোগাযোগ পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। তাঁদের আশা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে।

এ বিষয়ে বাগেরহাট-২ আসনের সংসদ সদস্য শেখ মঞ্জুরুল হক রাহাদ বলেন, আমি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে বিষয়টি জানিয়েছি। আমি চাই, সরকার দ্রুত এই রেলপথ চালু করার উদ্যোগ নিক।

বাগেরহাটবাসীর প্রত্যাশা, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলকে রেল নেটওয়ার্কের আওতায় আনার পরিকল্পনার পাশাপাশি ঐতিহাসিক বাগেরহাট-রূপসা রেলপথ পুনরায় চালুর বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে। দীর্ঘদিন ধরে হারিয়ে যাওয়া রেল যোগাযোগ ফিরে এলে একদিকে যেমন ঐতিহাসিক ঐতিহ্য সংরক্ষিত হবে, অন্যদিকে তেমনি যাতায়াত, কৃষিপণ্য পরিবহন ও ব্যবসা-বাণিজ্যে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। পুরোনো রেলপথে আবারও ট্রেন চলবে, স্টেশনে ফিরবে মানুষের ব্যস্ততা এমন স্বপ্নই দেখছেন বাগেরহাটের মানুষ।


বিপ্লবী বার্তা

প্রকাশক
শেখ মাহমুদ উজ্জ্বল
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক
কাইয়ুম তালুকদার (কানন)
উপদেষ্টা সম্পাদক
ড. জাহিদ আহমেদ চৌধুরী

কপিরাইট © ২০২৬ । বিপ্লবী বার্তা