বিপ্লবী বার্তা

সাদী মোঃ হিমেল

সাদী মোঃ হিমেল

পিরোজপুর


জেলে পরিবারের সঞ্চয়ের টাকায় কেনা জমিতে প্রতিবেশীর লোভ

নদীগর্ভে বসতভিটা বিলীন হওয়ার আশঙ্কায় দীর্ঘদিনের সঞ্চয়ের টাকা দিয়ে অন্যত্র জমি কিনে বসবাস শুরু করেছিলেন এক জেলে পরিবার। কিন্তু প্রায় ২১ বছর ধরে বসবাস করা সেই জমি দখলের চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে প্রতিবেশীর বিরুদ্ধে।ঘটনাটি ঘটেছে পিরোজপুরের জিয়ানগর উপজেলার বালিপাড়া ইউনিয়নের পশ্চিম বালিপাড়া গ্রামের পশ্চিম বালিপাড়া পাইলট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সন্নিকটে।শনিবার (১ আগস্ট) সরেজমিনে গিয়ে এলাকা বাসীর সঙ্গে কথা জানা যায়, ভুক্তভোগী মোসা. হিরন বেগম (৫৫), স্বামী আশরাফ আলী সরদার (৬২) পেশায় একজন জেলে। তাদের বাড়ি উপজেলার চন্ডিপুর গ্রামের নদীতীরবর্তী এলাকায় ছিল। নদীভাঙনে বসতভিটা বিলীন হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিলে ২০০৫ সাল থেকে বিভিন্ন সময়ে পরিবারের সঞ্চিত অর্থ এবং স্বজনদের সহযোগিতায় বাবার বাড়ির পাশে প্রায় ২৯ শতাংশ জমি ক্রয় করেন। এরপর থেকে পরিবারটি ওই জমিতেই বসবাস করে আসছে। তাঁদের দুই ছেলে ও চার মেয়ে রয়েছে।পরিবারটির অভিযোগ, সম্প্রতি একই গ্রামের বাসিন্দা মো. সিদ্দিক বয়াতী (৬০) ও মো. মোতালেব শেখ (৫৮) জমিটির মালিকানা দাবি করেন। এ নিয়ে বিরোধ সৃষ্টি হলে ভুক্তভোগীরা থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। পরে পুলিশ ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা একাধিকবার বিরোধ মীমাংসার উদ্যোগ নিলেও কোনো সমাধান হয়নি।অভিযোগে বলা হয়, গত ২৮ জুলাই গভীর রাতে সিদ্দিক বয়াতী, মোতালেব শেখসহ ১০ থেকে ১৫ জন ব্যক্তি জমির বেড়া ভেঙে সেখানে একটি পুরোনো দোকানঘর স্থাপন করেন। এ সময় পরিবারের সদস্যরা বাধা দিতে গেলে তাদের দেশীয় অস্ত্র নিয়ে ধাওয়া করা হয় এবং প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়।এ ঘটনায় ভুক্তভোগী হিরন বেগমের ভাই ও পশ্চিম বালিপাড়া গ্রামের বাসিন্দা অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক মো. হারুন অর রশিদ মির বাদী হয়ে ইন্দুরকানী থানায় সিদ্দিক বয়াতী, মোতালেব শেখসহ ১৫ জনের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন।কান্নাজড়িত কণ্ঠে হিরন বেগম বলেন, 'নদীতে ঘরবাড়ী সব ভাইঙ্গা যাইতেছে। মুই ৬ ডা মাইয়া পোলা লোইয়া থাহি মেলা কষ্টে। মেলা কষ্ট কইরা কিছু টাহা জোমাইয়া এই জাগাডু কিন্না কোন রহমের একখান ঘর বানাইয়া থাহা শুরু হরছিলাম। কিন্তু ম্যালা বছর পর এহন মোগো বাঁধা দেয়, মোরা কিছু কোইলে মোগো মারতে আয়। আম্মেগো কাছে বিচার দিলাম, মোরে এট্টু থাহার জায়গা কইরা দেন।'হিরন বেগমের ভাই মো. হারুন অর রশিদ মির বলেন, 'আমার এই অসহায় বোনের জন্য এই জমিটা কিনে দিয়েছি আজ প্রায় ২১-২২ বছর। নদীর পারে এদের ঘর ছিল সেখানে জমিজমা নদীতে ভেঙে গেছে। এখানে ছিল ডোবা ও খাল, এগুলো বালি দিয়ে ভরাট করে দিয়ে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা খরচ করে কাটা তারের বেড়া দিয়েছি। এই বেড়া গুলো সিদ্দিক বয়াতী ও মো. মোতালেব শেখসহ বেশকিছু লোক মিলে ভেঙে নিয়ে যায় এবং অন্য জায়গার একটি দোকানঘর এনে এখানে স্থাপন করেন। আমাদের দলিলসহ সকল কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও, মিথ্যা মামলাসহ জমি দখলের চেষ্টা করছে।'স্থানীয় বিএনপি নেতা আব্দুল হাই জমাদ্দার বলেন, 'এখানে এই জেলে পরিবারের লোকজন বেড়া দিয়েছি সেগুলো ভেঙে নিয়ে গেছে। এবং রাতে একটি ভাঙা পুরোনো দোকানঘর এই জমিতে এনে রেখে দিয়েছে। আমরা থানায় জানিয়েছি, প্রশাসনকে দ্রুত পদক্ষেপ নেয়ার দাবী জানাচ্ছি।'এলাকার ইউপি সদস্য রিয়াজ বয়াতি বলেন, 'জমিটির মূল মালিকানা হিরন বেগমের পরিবারের। অন্য পক্ষ প্রায় ৭ শতাংশ জমির মালিক হলেও তারা সেটি অন্য স্থানে ভোগদখল করতেন। সম্প্রতি ভুক্তভোগী পরিবার জমিতে বালু ফেলে ভরাট করার পর থেকেই ওই স্থানটি নিজেদের দাবি করছেন। বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা চলছে।'তবে অভিযোগ অস্বীকার করে অভিযুক্ত মো. সিদ্দিক বয়াতী ও মো. মোতালেব শেখ বলেন, আমরা বেড়া ভাঙ্গি নি, আমাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ আনা হচ্ছে। কিন্তু আমরা জমি পাবো এজন্য এখানে দোকান এনে রাখছি।'বালিপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো. শহিদুল ইসলাম বাবুল বলেন, 'ঘটনার বিষয়ে জেনেছি। স্থানীয় ইউপি সদস্যকে বিষয়টি দেখতে বলা হয়েছে। দুই পক্ষকে ইউনিয়ন পরিষদে ডেকে আলোচনার মাধ্যমে বিরোধ মীমাংসার চেষ্টা করা হবে।'ইন্দুরকানী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মহব্বত খান বলেন, 'এ ঘটনায় একটি লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। বিষয়টি তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।'

জেলে পরিবারের সঞ্চয়ের টাকায় কেনা জমিতে প্রতিবেশীর লোভ