বিপ্লবী বার্তা

সংসার চালাতে মাথার চুল বিক্রি করলেন রামপালের রেহানা

দুই সন্তানের নিষ্পাপ মুখের দিকে তাকিয়ে প্রতিদিনই এক কঠিন ও নির্মম বেঁচে থাকার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন ত্রিশ বছর বয়সী রেহানা বেগম। একদিকে তীব্র দারিদ্র্য ও অভাব, অন্যদিকে মাদকাসক্ত স্বামীর পাশবিক নির্যাতন- দুইয়ের মাঝে পেষণ হয়ে মাথা গোঁজার শেষ আশ্রয়টুকুও হারিয়েছেন তিনি। শেষ পর্যন্ত মাথার চুল বিক্রি আর মানুষের কাছে চেয়েচিন্তে পাওয়া টাকায় ঘরভাড়া মিটিয়ে এখন খোলা আকাশের নিচে দিন কাটাচ্ছেন এই অসহায় মা।বর্তমানে চার বছরের ছেলে রোহান ও তিন বছরের মেয়ে আলোমতিকে নিয়ে খুলনা-মোংলা রেলপথের পাশে বাগেরহাটের রামপাল উপজেলার সন্তোষপুর এলাকায় আশ্রয় নিয়েছেন রেহানা। স্থানীয় মানবিক কিছু মানুষের সহায়তায় বাঁশের খুঁটি দিয়ে একটি ঘরের কাঠামো তৈরি করা হলেও তা টিন দিয়ে ছাওয়ার সামর্থ্য নেই তাঁর। ফলে প্রখর রোদ আর বর্ষার মুষলধারায় বৃষ্টি মাথায় নিয়েই অবুঝ দুই সন্তানকে আকড়ে ধরে দিন অতিবাহিত করছেন তিনি।তিন ভাই-বোনের মধ্যে সবার বড় রেহানার জীবনের গল্প চরম করুণ। ছোট বোনটি মানসিক প্রতিবন্ধী। বৃদ্ধ বাবা অন্যের বাড়ি কাজ করে যা পান, তা দিয়ে কোনোমতে পরিবারের ক্ষুধা মেটান। দিনশেষে সেই বাবার সামান্য আয়ের ওপরও অনেক সময় নির্ভর করতে হয় রেহানাকে। তবে রেহানার জীবনকে বিষিয়ে তুলেছে তাঁর স্বামী জাফর আলীর নির্যাতন। রেহানার অভিযোগ, স্বামী একজন চিহ্নিত মাদকাসক্ত। মাদকের টাকা না পেলেই নিয়মিত তাঁকে বেধড়ক মারধর করা হয়। এমনকি মানুষের কাছ থেকে সাহায্য চেয়ে আনা টাকাও কেড়ে নেয় স্বামী।সম্প্রতি অভাব সইতে না পেরে দুই সন্তানকে নিয়ে একটি ভাড়া ঘরে উঠেছিলেন রেহানা। কিন্তু মেয়াদ শেষে ঘরভাড়া পরিশোধের কোনো উপায় না পেয়ে চরম বাধ্য হয়ে নিজের মাথার দীর্ঘ চুল বিক্রি করে দেন তিনি। চুল বিক্রি থেকে পান মাত্র ১ হাজার টাকা। এর সাথে মানুষের কাছ থেকে চেয়ে পাওয়া অবশিষ্ট টাকা মিলিয়ে মোট ৩ হাজার ৫০০ টাকা পরিশোধ করে ঘরের দেনা চুকিয়ে রাস্তায় নামেন তিনি।অশ্রুসিক্ত চোখে রেহানা বেগম বলেন, "সন্তান দুটোর মুখের দিকে তাকালে সব কষ্ট ভুলে থাকি। ঘর নাই, খাবার নাই, কোনো সামর্থ্যও নাই। মানুষের দ্বারে দ্বারে চেয়ে যা পাই, তা দিয়েই বাচ্চাদের মুখে দুটো ভাত তুলে দিই। স্বামী নেশা করে আইসা রোজ মারে। শেষমেশ ঘরভাড়া মেটাতে নিজের মাথার চুলও বেচতে হইছে। খুব যখন ক্ষুধা পায়, বাধ্য হয়ে খালের পানি খাই। মানুষ ঘরের কাঠামোটা বানাই দিছে, কিন্তু ছাউনি নাই। আমার আর কিছু চাওয়ার নাই, খালি ছাওয়াল-মেয়ে দুটোকে নিয়ে একটু নিরাপদে মাথা গুঁজে শান্তিতে থাকতে চাই।"সরেজমিনে সন্তোষপুর গ্রামের প্রবেশমুখে রেললাইনের পাশে গিয়ে দেখা যায়, বাঁশের খুঁটির ওপর দাঁড়িয়ে আছে এক অসম্পূর্ণ ঘর। চারপাশে কোনো পর্যাপ্ত বেড়া নেই, ওপরে নেই টিনের ছাউনি। সামান্য বৃষ্টি হলেই চারপাশ পানিতে ভেসে যায়। রেহানার পাশাপাশি তাঁর মানসিক প্রতিবন্ধী বোনকেও সেখানে অবস্থান করতে দেখা গেছে। স্থানীয়দের মতে, দুই অবুঝ শিশুকে নিয়ে একজন নারীর এমন মানবেতর জীবনযাপন অত্যন্ত মর্মান্তিক।এ বিষয়ে রামপাল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তামান্না ফেরদৌস জানান, ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক। প্রশাসনের পক্ষ থেকে দ্রুততম সময়ে রেহানা বেগমের জন্য এক মাসের প্রয়োজনীয় শুকনা খাবার ও প্রয়োজনীয় সহায়তা পৌঁছানো হবে। একই সাথে তাঁর স্থায়ী বসবাসের জন্য একটি সরকারি ঘরের ব্যবস্থাও করে দেওয়া হবে।

সংসার চালাতে মাথার চুল বিক্রি করলেন রামপালের রেহানা