দেশে ফিরে বিচারের মুখোমুখি হতে চান শেখ হাসিনা
'ফাঁসির রায় মাথায় নিয়েই দেশে ফিরতে চান আওয়ামী লীগ সভাপতি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা,' দলটির একাধিক নেতার এমন বক্তব্য ঘিরে নতুন করে রাজনৈতিক আলোচনা শুরু হয়েছে।তাদের দাবি, শেখ হাসিনা দেশে ফিরে আদালতের মুখোমুখি হতে প্রস্তুত। তবে বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান বাস্তবতায় এটি রাজনৈতিকভাবে কর্মীদের উজ্জীবিত রাখার কৌশল ছাড়া আর কিছু নয়।সম্প্রতি অনলাইন বৈঠক ও সরাসরি সাক্ষাতে শেখ হাসিনার সঙ্গে কথা বলেছেন এমন কয়েকজন আওয়ামী লীগ নেতা জানিয়েছেন, দলীয় প্রধান দেশে ফেরার বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব ব্যক্ত করেছেন। এমনকি তার দেশে ফেরাকে কেন্দ্র করে সংগঠনকে প্রস্তুত রাখার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম বলেন, “শেখ হাসিনা দ্রুত দেশে ফিরতে চান। প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ও প্রক্রিয়া আমরা এগিয়ে নিচ্ছি। তিনি যেভাবে দেশ ছেড়েছিলেন, সেভাবেই সাহসিকতার সঙ্গে ফিরবেন।”দলীয় সূত্রগুলো বলছে, বর্তমানে ভারতে অবস্থান করলেও শেখ হাসিনা নিয়মিত নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে বৈঠক করে তিনি নেতাদের ঐক্যবদ্ধ থাকার নির্দেশ দিচ্ছেন।ইউরোপ আওয়ামী লীগের এক নেতা, যিনি সম্প্রতি শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন বলে দাবি করেছেন, তিনি জানান, সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেশে ফিরে বিচার মোকাবিলা করতে চান। তিনি বলেন, “তিনি মনে করেন, দেশের মানুষের সামনে থেকেই রাজনৈতিক ও আইনি লড়াই করা উচিত।”ওই নেতা আরও জানান, একটি টেলিগ্রাম গ্রুপ কলে শেখ হাসিনা বলেছেন, “আমার এখন যে বয়স, তাতে জীবনের খুব বেশি সময় বাকি নেই। দেশের গণতন্ত্রের জন্য যদি ফাঁসির মঞ্চেও যেতে হয়, তবুও আমি পিছপা হব না।”২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের পর শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নেন। এরপর আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় ও তৃণমূল পর্যায়ের নেতাদের বড় অংশ ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে। মামলা, গ্রেপ্তার ও রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মুখে দলটির কার্যক্রম কার্যত স্থবির হয়ে যায়।পরবর্তীতে অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম স্থগিত করে। পরে সংসদে আইন পাসের মাধ্যমে দলটির রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করা হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।এমন বাস্তবতায় শেখ হাসিনার দেশে ফেরার আলোচনা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা তৈরি করেছে বলে দাবি করছেন দলটির নেতারা। আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানককে মাঠপর্যায়ে নেতাকর্মীদের সংগঠিত করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বলেও জানা গেছে।এদিকে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ প্রসঙ্গে সরকারের অবস্থানও স্পষ্ট। বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “ভারতের সঙ্গে বিদ্যমান চুক্তি অনুযায়ী আমরা শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরানোর অনুরোধ জানিয়েছি। আমরা চাই, তিনি আদালতে এসে মামলাগুলোর মোকাবিলা করুন।”তবে ভারত এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো সাড়া দেয়নি।রাষ্ট্রবিজ্ঞানী দিলারা চৌধুরী মনে করেন, শেখ হাসিনার দেশে ফেরার আলোচনাটি মূলত রাজনৈতিক বার্তা। তিনি বলেন, “এটি কর্মীদের মনোবল ধরে রাখার চেষ্টা। বর্তমান পরিস্থিতিতে তিনি বাস্তবে দেশে ফিরবেন এমন কোনো শক্ত ভিত্তি আমি দেখছি না।”তার মতে, “সরকার যদি সত্যিই তাকে বিচারের মুখোমুখি করতে চায়, তাহলে প্রত্যর্পণের বিষয়টি কার্যকর করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।”আওয়ামী লীগের নেতাদের যুক্তি হলো, শেখ হাসিনা দেশ ছেড়েছিলেন নিরাপত্তাজনিত কারণে। এখন দেশে নির্বাচিত সরকার থাকায় তিনি আইনগত প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ পাবেন। পাশাপাশি বর্তমান সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড নিয়ে জনমনে অসন্তোষ তৈরি হলে আওয়ামী লীগ আবারও রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় হওয়ার সুযোগ পেতে পারে বলেও মনে করছেন তারা।উল্লেখ্য, গত বছরের ১৭ নভেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যুদণ্ড দেন। রায়ে শেখ হাসিনাকে গণহত্যা, হত্যার নির্দেশ এবং উসকানির দায়ে দোষী সাব্যস্ত করা হয়।এ ছাড়া তার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল, দুর্নীতি দমন কমিশন এবং হত্যা-গুমসহ একাধিক মামলা বর্তমানে বিচারাধীন রয়েছে।আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক চিফ প্রসিকিউটর ও সিনিয়র আইনজীবী তাজুল ইসলাম বলেন, “দেশে ফিরলে শেখ হাসিনাকে প্রথমেই আইসিটি মামলায় আত্মসমর্পণ করতে হবে। এরপর মানবতাবিরোধী অপরাধ, গুম-খুন ও দুর্নীতির মামলাগুলো মোকাবিলা করতে হবে।”তিনি আরও বলেন, “এতদিন মামলা মোকাবিলা না করে এখন দেশে ফিরে বিচার ফেস করার কথা বলা রাজনৈতিক বক্তব্যও হতে পারে। তবে তিনি যদি সত্যিই আদালতের সামনে দাঁড়াতে চান, সেটি অবশ্যই আইনের শাসনের জন্য ইতিবাচক হবে।”