দেয়াল লিখন থেকে বইয়ের পাতায় ইবির কামরুল হাসানের সাহিত্যজীবন
শৈশবে মাদ্রাসার দেয়ালিকায় কৌতুক লিখে লেখালেখির জগতে প্রবেশ করেন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের অধ্যাপক ড. কামরুল হাসান। সে সময় তিনি জয়পুরহাটের হানাইল নূরে আলম কামিল মাদ্রাসায় চতুর্থ শ্রেণীতে পড়াশোনা করতেন। এসময় তিনি আরো ১০-১৫ টি কবিতা লিখেছেন। তবে আর্থিক টানাপোড়েন ও পড়াশোনা চাপে এক সময় লেখালেখি থেকে দূরে সরে যান তিনি। পরবর্তী সময়ে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করার পর আবারও সাহিত্যচর্চায় মনোনিবেশ করেন। আরবি সাহিত্য অনুবাদের মধ্য দিয়ে নতুনভাবে যাত্রা শুরু করে তার লেখালেখি। বর্তমানে তার প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ৩০টির বেশি। অনুবাদের পাশাপাশি মৌলিক নাটক, উপন্যাস ও অন্যান্য সাহিত্যকর্ম রচনায় তিনি অবদান রেখে চলেছেন। তিনি জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত লেখালেখি চালিয়ে যেতে চান।কামরুল হাসানের অনুবাদকৃত বইগুলো হলো জ্ঞান ও ইমান, মুসনাদে আহমদ ৫ম খণ্ড, অভিশাপ, মরুর ঈগল, জয়নব, আনন্দ অপেরা, তেলাপোকার ভাগ্য, সবার জন্য খাদ্য, জামরাদার স্বপ্ন, স্বর্ণরাঙা প্রভাত, ইজিস, বিশ্বাস-অবিশ্বাস, মিস জাকার্তা, সুখস্বপ্ন, দুঃস্বপ্ন, দ্য ম্যাড ম্যান, কালো ছায়া, রাজা ইডিপাস, স্বাধীনতার মিছিল, ফেরেস্তার প্রার্থনা, আংগুরের রাণি, জ্ঞানী রাজা সুলাইমান এবং ডাক্তারের গল্প।তার স্বরচিত বইগুলো হলো, আল-আরাবিয়্যাতু আল-ইত্তিসালিয়া, আরবি সাহিত্য মঞ্জুষা (১-৪ খন্ড), নবি আমার শশীপ্রভা, সাহিত্য পাঠ, ছোটদের প্রিয় মহানবি, নির্বাচিত ইসলামি প্রবন্ধ, আল-কুরআনের উপমা ছড়ানো ছিটানো সুষমা, বিশ্বাসের প্রতিধ্বনি, জুলাইয়ে উত্তাল দিনগুলো, সাহিত্য অন্বেষা ও সুবাস অম্লান। এছাড়াও আরবি সাহিত্য মঞ্জুসা ৫ম খন্ড, আল-কুরআনের উপমা, আলাপ বিলাপ, নবি আমার শশীপ্রভা ২য় খন্ড এবং মুহাম্মদ স. নাটক অনূদিত প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছে। অধ্যাপক ড. কামরুল হাসান বলেন, ছোটবেলায় জয়পুরহাটের নূরে আলম কামিল মাদ্রাসায় পড়ার সময় আমার প্রথম লেখা প্রকাশিত হয় মাদ্রাসার দেয়ালিকায়। লেখাটি ছিল একটি কৌতুক। এর পরে আরো ১০-১৫ টি কবিতা লিখেছি। তবে সে কবিতা সংরক্ষণ করা হয়নি। একপর্যায়ে লেখালেখি অভিজ্ঞ লেখকদের জন্য এমন ধারণা থেকে সাহিত্য্যচর্চা বন্ধ করে দিই। পাশাপাশি আর্থিক টানাপোড়েন ও পড়াশোনা চাপে এক সময় লেখালেখি থেকে দূরে সরে যাই। ওই সময়ে নিজের জীবন চালানোই কঠিন হয়ে পড়েছিল। ফলে লেখালেখির কথা ভাবার সুযোগ হয়নি। পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে যোগ দেওয়ার পর লেখালেখিতে মনোযোগী হই। সহকারী অধ্যাপক হওয়ার পর আমার প্রথম বই প্রকাশিত হয়েছে। এরপর আরবি সাহিত্য অনুবাদের মাধ্যমে নিয়মিত লেখালেখি শুরু করি। কামরুল হাসানের প্রথম অনুবাদ কারা বই হলো অভিশাপ। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত বই লিখে যাওয়ার স্বপ্ন তার। ছাত্র জীবনে রাতে সবাই ঘুমিয়ে পড়লে লুকিয়ে বই পড়তেন। কেননা তার পরিবারে উপন্যাস ও নাটক পড়ার অনুমতি ছিলো না। নাজিব কিলানীর লেখা বই, আবুল আসাদের সাইমুম সিরিজ এবং মল্লিকের গান তার লেখালেখির অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে। এ প্রসঙ্গে ড. কামরুল হাসান বলেন, আমি যখন নবম শ্রেণিতে পড়াশোনা করি তখন নাজিব কিলানীর লেখা 'আল্লাহর পথের সৈনিক' পড়েছি। যেখানে মুসলিম ব্রাদারহুডের ওপর নির্যাতনের জীবন্ত চিত্র আমাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। এর পর থেকে নাজিব কিলানির লেখার প্রতি আমার বিশেষ দুর্বলতা তৈরি হয়। এছাড়াও আবুল আসাদের সাইমুম সিরিজ এবং মল্লিক ভাইয়ের গান আমাকে বই প্রেমিক করে তুলে। এখান থেকেই লেখালেখি করার অনুপ্রেরণা পাই। আমার শিক্ষা জীবনে সাইমুম সিরিজের ৩৬ টি বই পড়েছি। কামরুল হাসানের অন্যতম প্রিয় বই জয়নব অনুবাদের অভিজ্ঞতা শেয়ার করে তিনি বলেন, প্রত্যেকটা বই আমার সন্তানের মতো। বই লেখার আগে ভালোবাসা তৈরি করি তার পর লিখি। ভালোবাসা তৈরি না হলে লিখি না। আরবি সাহিত্যের প্রথম উপন্যাস হিসেবে পরিচিত জয়নবের অনুবাদ করেছি। বইটির ভাষা বেশ কঠিন ছিল। অনুবাদের সময় আমার অভিজ্ঞতা কম ছিল ফলে কাজটি শেষ করতে দীর্ঘ সময় লেগেছে। দীর্ঘ সময় ধরে চেয়ারে বসে অনুবাদ করতে একপর্যায়ে আমার পেছনে খোসপাচড়া হয়ে গিয়েছিল। বইটি এক হাজার কপি ছাপানো হয়েছে যার শেষ কপিটি গত বছরে বিক্রি হয়েছে। তবে আরবি সাহিত্যের পাঠক কম হওয়ায় বইটি প্রত্যাশিত সাড়া পায়নি। বই বিক্রির অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, খোলা বাজারে আরবি সাহিত্যের বইয়ের চাহিদা কম। জয়পুরহাট ও বগুড়া রেলস্টেশনে বই বিক্রির জন্য দিলেও যথাযথ অর্থ না পাওয়ায় এখন আর সেখানে বই দেওয়া হয় না। নতুন লেখকদের উদ্দেশে অধ্যাপক কামরুল হাসান বলেন, লেখক হতে চাইলে প্রথমেই বেশি বেশি পড়তে হবে। পাশাপাশি চারপাশের সমাজ, পরিবেশ, প্রতিবেশ, মানুষের আচরণ, রাস্তাঘাট ও স্থাপনা থেকেও শেখার চেষ্টা করতে হবে। সুযোগ পেলে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে অভিজ্ঞতা অর্জন করতে হবে। লেখালেখি শুধু কাগজে শব্দ সাজানোর বিষয় নয়, বরং মানুষের জীবন, সমাজ ও চারপাশের বাস্তবতাকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করার মধ্য দিয়েই একজন লেখকের চিন্তা ও সৃষ্টিশীলতা সমৃদ্ধ হয়।