বর্ষার আগে ঢাকায় জলাবদ্ধতার ঝুঁকিতে ১৪১ স্থান
আসন্ন বর্ষা মৌসুমকে সামনে রেখে ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশন জলাবদ্ধতার ঝুঁকিতে থাকা ১৪১টি স্থান চিহ্নিত করেছে এবং ঝুঁকি কমাতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়েছে।এর মধ্যে ১০৮টি স্থান ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন (ডিএনসিসি) এলাকায় এবং ৩৩টি স্থান ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন (ডিএসসিসি) এলাকায় অবস্থিত।তবে নগর পরিকল্পনাবিদ ও বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, খালগুলোর সংযোগ পুনরুদ্ধার, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং সমন্বিত মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়ন ছাড়া ঢাকার জলাবদ্ধতা সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সাবেক সভাপতি মোহাম্মদ ফজলে রেজা সুমন বলেন, 'সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো সেকেন্ডারি ও টারশিয়ারি ড্রেনেজ লাইনের সঙ্গে মূল নিষ্কাশন ব্যবস্থার সংযোগের অভাব।'তিনি বলেন, 'শেষ পর্যন্ত সব পানি মূল চ্যানেলেই গিয়ে পড়ে। কিন্তু সেই সংযোগব্যবস্থা এখনও সঠিকভাবে কাজ করছে না।' তার মতে, পুনরুদ্ধার করা কিছু ড্রেনেজ সংযোগ আবারও দখলের শিকার হয়েছে। এছাড়া ঢাকার উত্তরাঞ্চলের অনেক এলাকা আংশিক উন্নয়ন হলেও এখনও ঝুঁকিতে রয়েছে।তিনি সতর্ক করে বলেন, বৃষ্টিপাত ৮০ মিলিমিটারের বেশি হলে বর্তমান ড্রেনেজ ব্যবস্থা চাপ সামলাতে হিমশিম খেতে পারে এবং ভারী বৃষ্টিতে কিছু এলাকায় ভয়াবহ জলাবদ্ধতা দেখা দিতে পারে।নগর বিশেষজ্ঞ ও ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক আদিল মোহাম্মদ খান বলেন, বারবার পরিষ্কার অভিযান চালানো হলেও ঢাকার খাল, ড্রেন ও স্থানীয় পানি নিষ্কাশন লাইন এখনও বর্জ্যে আটকে আছে।তিনি বলেন, 'সিটি করপোরেশনগুলো শুধু প্রকল্প ও বিনিয়োগের কথা বলছে। কিন্তু এলাকাভিত্তিক মূল্যায়ন ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার এখনও ঘাটতি রয়েছে।'তিনি আরও বলেন, 'অল্প সময়ের বৃষ্টিতেই এবার ধানমন্ডি লেকের আশপাশে পানি জমে যায়, যা ড্রেনেজ ডিজাইন ও পানি প্রবাহ ব্যবস্থার ত্রুটি নির্দেশ করে।' আদিল বলেন, 'দুই সিটি কর্পোরেশনের আলাদা পরিকল্পনার বদলে সমন্বিত ড্রেনেজ মাস্টারপ্ল্যান প্রয়োজন। পাশাপাশি ড্রেনে ময়লা ফেলা বন্ধে জনসচেতনতা ও জনগণের অংশগ্রহণও জরুরি।'ডিএসসিসির তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ডঃ মোহাম্মদ সাফিউল্লাহ জানান, সংস্থাটি ৩৩টি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করেছে এবং প্রকৌশল ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগকে নিয়ে ওয়ার্ডভিত্তিক জরুরি প্রতিক্রিয়া দল গঠন করেছে।তিনি বলেন, 'নিউ মার্কেট, ধানমন্ডি হকার্স মার্কেট, বকশীবাজার, চানমারি মোড়, রাজারবাগ ও ফকিরাপুলসহ গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় জলাবদ্ধতা মোকাবিলায় অস্থায়ী পাম্পের সংখ্যা ২টি থেকে বাড়িয়ে ৮টি করা হয়েছে।'নিয়মিত পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের পাশাপাশি ড্রেন পরিষ্কারের জন্য ঠিকাদারও নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।সাফিউল্লাহ বলেন, 'বিডিআর এলাকার একটি আউটলেট বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর নিউ মার্কেট ও মিরপুর রোড এলাকায় পানি নিষ্কাশন ধীর হয়ে পড়ে, ফলে জলাবদ্ধতা বেড়েছে।'সমস্যা সমাধানে ধানমন্ডি, নিউ মার্কেট ও বকশীবাজার এলাকার ড্রেনেজ সংযোগ উন্নয়নে ২৫০ থেকে ৩০০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প প্রস্তাব করা হয়েছে বলে জানান তিনি।তিনি বলেন, 'প্রস্তাবটি ইতোমধ্যে বাজেট বরাদ্দের জন্য জমা দেওয়া হয়েছে। অনুমোদন পেলে এটি স্থায়ী সমাধান দিতে পারে।'এই প্রকল্পের আওতায় নদীর দিকে ড্রেনেজ আউটলেট সম্প্রসারণ এবং সদরঘাট ও চকবাজারসহ বিভিন্ন এলাকার মাধ্যমে একাধিক পানি নিষ্কাশন পথ তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে।এছাড়া জিরানি, কালুনগর, হাজারীবাগ ও শ্যামপুর এলাকায় খাল পুনরুদ্ধার প্রকল্প নিয়েও কাজ করছে ডিএসসিসি।অন্যদিকে ডিএনসিসির প্রধান প্রকৌশলী সৈয়দ রাকিবুল হাসান বলেন, বর্তমানে সংস্থাটি ২৯টি খাল তত্ত্বাবধান করছে। তবে এই বর্ষায় পাঁচটি খাল ও মিরপুর এলাকাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত খালগুলোর মধ্যে রয়েছে সাংবাদীক খাল, বাউনিয়া খাল, ২২-ফিট খাল, রামচন্দ্রপুর খাল, টোলারবাগ খাল ও কল্যাণপুর খাল।তিনি বলেন, 'আমাদের লক্ষ্য হলো যতটা সম্ভব মিরপুরকে জলাবদ্ধতামুক্ত রাখা।'তার মতে, ভারী বৃষ্টির পর লক্ষ্যভুক্ত এলাকায় এক থেকে দুই ঘণ্টার মধ্যে পানি নেমে যাওয়ার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে চায় ডিএনসিসি।তিনি জানান, কল্যাণপুর ও টোলারবাগ এলাকায় পরিষ্কার ও খনন কাজ চলছে এবং কাদা ও আবর্জনা জমা ঠেকাতে কর্মীরা নিয়মিত কাজ করছেন।বক্স কালভার্ট পরিষ্কার করা কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় ভবিষ্যতে রোবট বা যান্ত্রিক সরঞ্জাম ব্যবহারের বিষয়ও বিবেচনা করছে ডিএনসিসি।তবে আশকোনা, দক্ষিণখান ও উত্তরখানসহ বেশ কয়েকটি এলাকায় খাল ও জলাভূমি দখল এবং সঠিক আউটলেট না থাকায় ভয়াবহ ড্রেনেজ সংকট রয়ে গেছে বলে স্বীকার করেন তিনি।তিনি বলেন, 'অনেক জায়গায় পানি যাওয়ার কোনো পথই নেই।'রাকিবুল আরও বলেন, দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য খালগুলোকে সঠিক নকশা ও পরিকল্পনা অনুযায়ী পুনরুদ্ধারসহ বড় পরিসরের প্রকল্প প্রয়োজন।
তিনি বলেন, 'অস্থায়ী ব্যবস্থা দিয়ে চিরকাল চলা সম্ভব নয়। খাল নেটওয়ার্কের স্থায়ী পুনরুদ্ধার জরুরি।'