দেবীগঞ্জের জলপাই যাচ্ছে দেশের নানা প্রান্তে, প্রতিদিন অর্ধকোটি টাকার বেচাকেনা
পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জ উপজেলার দেবদারুতলা জলপাইয়ের হাটে জমে উঠেছে মৌসুমি বেচাকেনা। উত্তরবঙ্গের অন্যতম বৃহৎ এই পাইকারি বাজারে প্রতিদিন কেনাবেচা হচ্ছে ১৪০ থেকে ২০০ টন জলপাই। এতে দৈনিক লেনদেনের পরিমাণ দাঁড়াচ্ছে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ লাখ টাকা। এখানকার জলপাই সরবরাহ করা হচ্ছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে, পাশাপাশি যাচ্ছে বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানেও। তবে বিপুল বেচাকেনার এই বাজারে জলপাই সংরক্ষণের জন্য নেই কোনো হিমাগার।মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) সরেজমিনে দেখা যায়, হাটজুড়ে জলপাইয়ের স্তূপ। কোথাও চলছে ওজন, কোথাও আকার অনুযায়ী বাছাই। বাছাই শেষে জলপাই পরিষ্কার করে বস্তাবন্দী করা হচ্ছে। এসব কাজে পুরুষ শ্রমিকদের পাশাপাশি অংশ নিচ্ছেন বিপুলসংখ্যক নারী শ্রমিকও।জলপাই মৌসুমে পঞ্চগড়ের বিভিন্ন এলাকা ছাড়াও পার্শ্ববর্তী দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও ও নীলফামারী জেলা থেকে কৃষক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা জলপাই নিয়ে আসেন এই হাটে। ব্যাটারিচালিত ভ্যান, ইজিবাইক, নছিমনসহ বিভিন্ন যানবাহনে করে এসব জলপাই পৌঁছায় বাজারে। কারও কাছে এটি নিজের গাছের ফল বিক্রির জায়গা, আবার কারও কাছে বছরের পর বছর ধরে জীবিকা নির্বাহের অন্যতম মাধ্যম।দেবীগঞ্জ সদর ইউনিয়নের পূর্ব দেবীডুবা এলাকার কৃষক নজরুল ইসলাম এবার প্রথমবারের মতো নিজের গাছের জলপাই নিয়ে এসেছেন হাটে। তিনি বলেন, “একটি গাছে এবার প্রথম জলপাই ধরেছে। ১৬ টাকা কেজি দরে ৫৩ কেজি জলপাই বিক্রি করেছি। যে দাম পেয়েছি, তাতে আমি খুশি।”পঞ্চগড় থেকে আসা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী মতিউর রহমান বলেন, “৭ থেকে ৮ বছর ধরে আমরা তিনজন মিলে বিভিন্ন গ্রাম থেকে জলপাই কিনে এই হাটে এনে বিক্রি করি। দিনশেষে জনপ্রতি এক হাজার থেকে বারো শ টাকা পর্যন্ত লাভ থাকে।”স্থানীয় পাইকার মো. বেলাল হোসেন দীর্ঘদিন ধরে জলপাইয়ের ব্যবসা করছেন। তিনি বলেন, “প্রতিদিন প্রায় ২৫ থেকে ৩০ টন জলপাই কেনাবেচা করি। এর কিছু প্রাণ কোম্পানিতে যায়। বাকিগুলো ঢাকা, বরিশাল, যশোরসহ দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় পাঠানো হয়। এ ছাড়া দেবীগঞ্জের জলপাই দেশের বাইরেও যায়।”চট্টগ্রাম থেকে আসা ব্যবসায়ী আব্দুল কাদের বলেন, “এই বাজার থেকে প্রতিদিন ৮ থেকে ১০ টন জলপাই কিনি। আমার মতো চট্টগ্রামের আরও পাইকার আছেন, যারা ১০ থেকে ১৫ টন করে জলপাই কেনেন। এসব জলপাই বিভিন্ন কোম্পানিতে সরবরাহের পাশাপাশি দেশের অন্যান্য জেলাতেও পাঠানো হয়।”দেবদারুতলা জলপাইয়ের হাট শুধু কেনাবেচার কেন্দ্র নয়, মৌসুমে এটি কয়েক শ মানুষের কর্মসংস্থানেরও উৎস। প্রতিদিন প্রায় ২০০ থেকে ২৫০ জন শ্রমিক বিভিন্ন পাইকারের হয়ে জলপাই কেনা, বাছাই, পরিষ্কার ও ট্রাকে বোঝাইয়ের কাজ করেন। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক নারী শ্রমিক রয়েছেন।মৌসুমি শ্রমিক সাব্বির ইসলাম বলেন, “এবার নতুন করে কাজ করছি। আমার মহাজন প্রতিদিন ২০ থেকে ২৫ টন জলপাই কেনেন। আমি জলপাই বাছাইয়ের কাজ করি।”হাটে ৩০ সদস্যের একটি নারী শ্রমিক দলকে জলপাই বাছাই ও বোঁটা ছাড়ানোর কাজ করতে দেখা যায়।তাঁদের একজন সাবিত্রী দাস বলেন, “সকাল ৮টায় আসি, বিকেল ৫টায় যাই। আমাদের কাজ জলপাই বাছাই করা ও বোঁটা ছাড়ানো। সারাদিন কাজ করে ৩০০ টাকা পাই।”উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেবীগঞ্জ উপজেলায় ৩ হেক্টর জমিতে জলপাই চাষ হয়। স্থানীয় উৎপাদন তুলনামূলক কম হলেও পঞ্চগড়সহ আশপাশের কয়েকটি জেলা থেকে জলপাই আসায় দেবদারুতলা হাটটি বড় পাইকারি বাজারে পরিণত হয়েছে।দেবীগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. নাঈম মোর্শেদ বলেন, দেবদারুতলা উত্তরবঙ্গের বৃহত্তম জলপাইয়ের হাট। প্রতিবছর অক্টোবর থেকে জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত এখানে জলপাই কেনাবেচা চলে। যোগাযোগব্যবস্থা ভালো হওয়ায় দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পাইকারেরা এই হাটে জলপাই কিনতে আসেন। হাটটি দেবীগঞ্জ তথা পঞ্চগড়ের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।বিপুল পরিমাণ জলপাই কেনাবেচা হলেও দেবদারুতলা হাটে সংরক্ষণের জন্য নেই কোনো হিমাগার। ফলে কেনাবেচার পর দ্রুত জলপাই দেশের বিভিন্ন গন্তব্যে পাঠাতে হয়। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, হাটের পরিধি বাড়ানো এবং আধুনিক সংরক্ষণব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে জলপাই ব্যবসার সম্ভাবনা আরও বাড়বে।হাটের ইজারাদার কাদেরী কিবরিয়া রানা বলেন, “এই হাটে প্রতিদিন ১৪০ থেকে ২০০ টন জলপাই কেনাবেচা হয়। সংরক্ষণাগার বা হিমাগার না থাকায় প্রতিদিনের জলপাই সেদিনই দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠাতে হয়। সরকারিভাবে হিমাগার স্থাপন এবং আশপাশের অবৈধ স্থাপনা সরানো হলে হাটটির পরিসর বাড়বে এবং এটি আরও পরিচিতি পাবে।”দেবীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইন্দ্রজিত সাহা বলেন, উত্তরবঙ্গের বৃহত্তম জলপাইয়ের এই হাট সম্প্রসারণের জন্য এখানে থাকা অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের উদ্যোগ নেওয়া হবে। এ ছাড়া এখানে জলপাই উৎপাদন হয়। তাই ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে একটি হিমাগার স্থাপনের বিষয়ে কৃষি মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হবে।সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, হাটের পরিধি সম্প্রসারণ, অবৈধ স্থাপনা অপসারণ এবং আধুনিক সংরক্ষণব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে দেবদারুতলা জলপাইয়ের হাট আরও সমৃদ্ধ হবে। এতে কৃষক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা ন্যায্যমূল্য পাওয়ার সুযোগ পাবেন, বাড়বে কর্মসংস্থান এবং স্থানীয় অর্থনীতিতে যুক্ত হবে নতুন সম্ভাবনা।