কুবি শিক্ষার্থীদের আবেগের অন্য নাম ‘চিঠি চত্বর’
একসময় যোগাযোগ মানে কেবল ভাবের আদান-প্রদান ছিল না; যোগাযোগ ছিল কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তির প্রত্যুত্তর গ্রহণের একটি সুদীর্ঘ প্রতীক্ষার নাম। সেই হলুদ খাম কিংবা নীল ইনল্যান্ড কাগজের ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে থাকত মানুষের বুকভরা হাসি, আবেগ কিংবা বেদনার স্মারক। চিঠি ছিল এক টুকরো কাগুজে প্রাণ যেখানে মিশে থাকত প্রিয়জনের হাতের স্পর্শ, কালির ঘ্রাণ আর বুকের ভেতর লালন করা এক সমুদ্র ভালোবাসা।চিঠির এই চিরন্তন আবেগকে ধারণ করতেই ২০২২ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে (কুবি) জন্ম নিয়েছিল ‘চিঠি চত্বর’। বিশ্ববিদ্যালয়ের এক কোণে জমে থাকা অবহেলা আর ময়লার স্তূপকে পাশ কাটিয়ে একদল স্বপ্নবাজ তরুণের ছোঁয়ায় জন্ম নিয়েছিল এই নস্টালজিক সোপান। বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রাফিতি সংগঠন 'বৃত্ত কুবি'-র সদস্যদের নিপুণ তুলির টানে আর অক্লান্ত পরিশ্রমে প্রাণহীন সেই স্থানটি হয়ে উঠেছিল অনুভূতির এক জীবন্ত গ্যালারি।চত্বরের মধ্যমণি হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল একটি তপ্ত লাল ডাকবাক্স। কেবল সাজসজ্জাই নয়, চিঠিগুলো গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার জন্য ছিল একদল নিবেদিতপ্রাণ 'ডাকপিয়ন'। উদ্বোধনের আগে থেকেই 'বৃত্ত কুবি'-র ঠিকানায় জমা হতে শুরু করেছিল অজস্র চিঠি। কেউ লিখেছিল প্রিয় বন্ধুর কাছে, কেউবা অজানা কোনো অনুরাগে। 'বৃত্ত কুবি'-র স্বপ্ন ছিল, এই ছোট চত্বরটি হবে পুরো বাংলাদেশের মানুষের সাথে কুবিয়ানদের চিঠির মাধ্যমে হৃদয়ের সেতুবন্ধন তৈরির এক মহাকাব্যিক কেন্দ্র।তবে সময়ের নিষ্ঠুর আবর্তে আজ সেই স্বপ্ন মলিন। যে জায়গাটি ময়লার স্তূপ থেকে উদ্ধার করে ফুলের মতো সাজানো হয়েছিল, কালের বিবর্তনে আজ তা আবারও সেই শ্রীহীন অবহেলার স্তূপেই পরিণত হয়েছে। রঙচটা সেই দেয়াল যেন একাকী দাঁড়িয়ে বিলাপ করছে। হারিয়ে গিয়েছে সেই তপ্ত লাল ডাকবাক্সটিও। একসময় যেখানে ছিল আড্ডা আর আবেগের গুঞ্জন, সেখানে আজ জমাট বেঁধেছে নিস্তব্ধতা আর অবজ্ঞার ধুলোবালি।নৃবিজ্ঞান বিভাগের ২০২০-২০২১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী আফিয়া মাস্-উদা মিথিলা চিঠি চত্বরের বর্তমান বেহাল দশায় গভীর ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করে বলেন,"চিঠি চত্বরের জায়গাটি আবার আগের অপরিচ্ছন্ন অবস্থায় ফিরে যাওয়াটা একজন শিক্ষার্থী হিসেবে আমাকে সত্যিই হতাশ করে। মনে হয়েছিল চিঠির ঐতিহ্য যেন আবার জীবন্ত হয়ে উঠেছে। কিন্তু এখন সেই জায়গাটিই অবহেলা ও ময়লায় ঢেকে যেতে দেখে খুব খারাপ লাগে; মনে হয় আমরা আমাদের সেই সুন্দর স্মৃতি ও ঐতিহ্যটাকে ধরে রাখতে পারলাম না।"'বৃত্ত কুবি'-র বর্তমান কমিটির সভাপতি তাওহীদ হোসেন সানি বলেন, "সবকিছু মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ, ইনবক্সে চলে যাওয়ায় চিঠি লেখার সংস্কৃতি প্রায় হারিয়ে গেছে। সেই অনুভূতিটা ফিরিয়ে আনতেই আমাদের এই উদ্যোগ ছিল। শিক্ষার্থীরা চিঠি লিখত, আর বৃত্ত কুবি ঠিকানামতো পৌঁছে দিত।"এই চিঠি চত্বর হারিয়ে যাওয়ার মূল কারণ হিসেবে তিনি সাংগঠনিক গতিশীলতার অভাবকে দায়ী করেন। সাবেক সভাপতি-সম্পাদক ক্যাম্পাস ছেড়ে দেওয়ায় নেতৃত্বে শূন্যতা তৈরি হয় এবং নতুন নেতৃত্বও ঠিকভাবে গঠিত হয়নি। পাশাপাশি পৃষ্ঠপোষকতার অভাব ও শিক্ষার্থীদের কম আগ্রহও এর ওপর প্রভাব ফেলেছে। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, "বাস্তবতা হলো, চিঠি সবাই পেতে চায়; কিন্তু লিখতে বসে কয়জন?"বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ সোহরাব উদ্দিন এই পরিস্থিতির পেছনে ধারাবাহিকতার অভাবকে দায়ী করেছেন। তিনি বলেন,"সমগ্র কমিউনিটি দীর্ঘদিন কোনো ধারাবাহিক প্রক্রিয়ায় থাকতে চায় না। প্রথম দিন দশজন থাকে, পরে আটজন, সাতজন দশ দিন পর গাছে পানি দেওয়ার কাউকে পাওয়া যায় না। আমরা ভালো কাজের চেয়ে তার প্রচার বেশি করি; কিন্তু নিয়মিত থাকি না।"তিনি আরও যোগ করেন, "চিঠি চত্বরের পরিকল্পনা ছিল প্রতি বৃহস্পতিবার গান, সপ্তাহান্তে চিঠি পৌঁছে দেওয়া। কাগজে লেখা একটি চিঠির আবেদন আলাদা। 'আমাকে ক্ষমা করে দিও' এক টুকরো চিরকুটই অনেক ভুল বোঝাবুঝি মিটিয়ে দিতে পারে। কিন্তু এই কাজের জন্য নিয়মিত প্রক্রিয়া ও দায়িত্ব দরকার ছিল। তাই আবার শুরু করতে হলে ভেবে-চিন্তে করতে হবে। কারণ আবার বন্ধ হলে এটি সংগঠনের জন্য নেতিবাচক দৃষ্টান্ত হয়ে যাবে।"স্মৃতিতে সতেজ লাল ডাকবাক্সচিঠি চত্বর হয়তো আজ হারিয়ে গেছে, কিন্তু তার সেই অল্প কদিনের পথচলা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে এক অমর স্মৃতি হয়ে থাকবে। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় আমরা যতটা দ্রুত ডিজিটাল হতে চেয়েছি, ততটা দ্রুত হয়তো নিজের শেকড় আর আবেগগুলোকে আগলে রাখতে শিখিনি।আজ চত্বরটি হয়তো ময়লার স্তূপে ঢাকা পড়েছে, কিন্তু সেই লাল ডাকবাক্সে ফেলে আসা অনুভূতিগুলো আজও কুবিয়ানদের স্মৃতিতে অম্লান।