বিপ্লবী বার্তা

বিপন্ন কুটির শিল্প! রৌমারীর বাঘমারায় তাঁত আছে, নেই তাঁতিদের মুখের হাসি

একসময় যে তাঁতের খটখট শব্দে মুখরিত থাকত গ্রাম, সুতার টানে বোন হতো রঙিন স্বপ্ন—আজ সেই তাঁত শিল্প নানা সংকটে জর্জরিত। কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার ৩নং বন্দবের ইউনিয়নের বাঘমারা গ্রামে এখনও নিভৃতে গড়ে উঠছে স্বল্পমূল্যের আকর্ষণীয় তাঁতের শাড়ি। এখানকার তাঁতিদের হাতের সুনিপুণ ছোঁয়ায় বুনে চলা শাড়ি রৌমারীর গণ্ডি পেরিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছে যাচ্ছে ঠিকই, তবে যার ঘামে তৈরি হচ্ছে এই বস্ত্র, সেই তাঁতির ভাগ্যের কোনো বদল ঘটছে না।বাঘমারা গ্রামের তাঁতি মো. জিহাদ হাসান (পিতা: মো. শহিদুল)। প্রতিদিনের সূর্য ওঠার সাথে সাথেই শুরু হয় তাঁর ও তাঁর পরিবারের কর্মযজ্ঞ। জিহাদ হাসান জানান, "পরিবারের সব সদস্য মিলে সারা দিন পরিশ্রম করে আমরা মাত্র একটি শাড়ি বুনতে পারি। আর এক দিন খাটার পর তার বিনিময়ে মজুরি পাই মাত্র ৭০০ টাকা।" দ্রব্যমূল্যের এই ঊর্ধ্বগতির বাজারে পুরো পরিবারের ঘামঝরানো শ্রমের বিনিময়ে ৭০০ টাকা আয় করে সংসার চালানো কতটা কষ্টকর, তা ভাষায় প্রকাশ করার অপেক্ষা রাখে না। প্রতিবেশী আফজাল মিয়ার কণ্ঠেও ঝরল একই আক্ষেপ। তিনি বলেন, "বাঘমারার তাঁতিদের বুনে দেওয়া শাড়ি রৌমারী ছাড়াও দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হচ্ছে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, মধ্যস্বত্বভোগী ও বাজারের অসামঞ্জস্যতার কারণে কারিগররা তাদের পরিশ্রমের ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেন না। কম দামে শাড়ি কিনে নিয়ে বড় বড় বাজারে দ্বিগুণ মূল্যে বিক্রি হলেও সুতা ও শ্রমের মূল কারিগররা রয়ে যাচ্ছেন বঞ্চিত।" স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কাঁচামালের অগ্নিমূল্য, সরকারি প্রণোদনার অভাব এবং বাজারজাতকরণের সঠিক ব্যবস্থার অভাবে বাঘমারার এই ঐতিহ্যবাহী তাঁত শিল্প আজ বিলুপ্তির পথে। সুতার দাম দিন দিন বাড়লেও শাড়ির উৎপাদন মজুরি বাড়ছে না। ফলে বাধ্য হয়ে অনেকেই পূর্বপুরুষের এই পেশা ছেড়ে ভিন্ন পেশায় ঝুঁকছেন। রৌমারীর বাঘমারা গ্রামের এই নিভৃত শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে এবং তাঁতি পরিবারগুলোর মুখে হাসি ফোটাতে অবিলম্বে সরকারি ও বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন। স্বল্প সুদে ঋণ সুবিধা, উন্নত সুতা ও রঙ সরবরাহ এবং উৎপাদিত পণ্যের সরাসরি বাজারজাতকরণের সুযোগ তৈরি করে দিলে একদিকে যেমন বাঘমারার এই হস্তশিল্প ঐতিহ্য রক্ষা পাবে, অন্যদিকে স্বাবলম্বী হবে বহু অসচ্ছল পরিবার।অবহেলা আর বঞ্চনার শিকার বাঘমারার এই তাঁতিদের পাশে দাঁড়ানো এখন সময়ের দাবি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সুদৃষ্টিই পারে রৌমারীর এই হস্তশিল্পকে নতুন জীবন দিতে।

বিপন্ন কুটির শিল্প! রৌমারীর বাঘমারায় তাঁত আছে, নেই তাঁতিদের মুখের হাসি