চিকিৎসক ঔষধ ও জনবল সংকটে নিজেই অসুস্থ
ঝালকাঠি জেলার রাজাপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসক ও জনবল সংকটের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় ওষুধের অভাবে ব্যাহত হচ্ছে প্রায় দুই লক্ষাধিক মানুষের চিকিৎসাসেবা। ৫০ শয্যাবিশিষ্ট এ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অনুমোদিত ১৯৪টি পদের মধ্যে ১০০টি দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক না থাকায় এবং ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ সরবরাহ বন্ধ থাকায় দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন রাজাপুর এবং পার্শ্ববর্তী উপজেলা কাঠালিয়ার বেশ কিছু ইউনিয়নের দুই লক্ষাধিক মানুষ।ঝালকাঠি জেলার রাজাপুর উপজেলায় ১৯৭০ সালে ৩১ শয্যাবিশিষ্ট হিসেবে রাজাপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স তার যাত্রা শুরু করে। পরবর্তী সময়ে স্থানীয় জনগণের স্বাস্থ্যসেবার চাহিদা বাড়ায় এটি ৫০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালে উন্নীত করা হয়।স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্রে জানা গেছে, শূন্য পদগুলোর মধ্যে চিকিৎসকের পদ ৩০টি, দ্বিতীয় শ্রেণির কর্মচারীর ৮টি, তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারীর ৪৫টি এবং চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীর ১৭টি। এসব পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য থাকায় হাসপাতালের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।হাসপাতালটিতে অপারেশন থিয়েটার স্থাপন করা হলেও প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও জনবলের অভাবে সেখানে অস্ত্রোপচার কার্যক্রম পরিচালনা করা যাচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে, প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় এক্সরে সেবাও বন্ধ রয়েছে। প্রায় ১০ বছর ধরে অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে থাকায় এক্সরে মেশিনটি নষ্ট হয়ে গেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। ফলে এক্সরে ও ছোটখাটো অস্ত্রোপচারের জন্য রোগীদের বেসরকারি ক্লিনিকের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এতে বাড়তি খরচের চাপে পড়ছেন নিম্ন আয়ের মানুষ।সম্প্রতি বেলা সাড়ে ১১টার দিকে সরেজমিনে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে রোগীদের ভিড় দেখা যায়। হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, প্রতিদিন উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ও প্রত্যন্ত এলাকা থেকে প্রায় ৫০০ থেকে ৬০০ রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন। অথচ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তাসহ সাধারণ রোগী দেখার জন্য চিকিৎসক রয়েছেন মাত্র তিনজন। এতে একজন চিকিৎসককে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২০০ রোগী সামলাতে হচ্ছে। ফলে চিকিৎসকদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হচ্ছে এবং রোগীদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে।এছাড়াও চলার পথের সিড়ি এবং টয়লেট নোংরা।রোগী অপেক্ষার জায়গায় প্রায় ফ্যান নষ্ট। দেয়ালে পলেস্তারা খসে পড়েছে।রোগী বসার স্থান সংকট। সাতুরিয়া এলাকার দেলোয়ার হোসেন ও বাঘড়ীর এলাকার শাহিন শিকদার অভিযোগ করে বলেন চিকিৎসক সংকটের কারণে জরুরি বিভাগে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা পেতে ভোগান্তিতে পড়তে হয়। কখনো কখনো চিকিৎসকের পরিবর্তে হাসপাতালের অন্যান্য কর্মচারীকে দিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসা, ব্যান্ডেজ ও সেলাইয়ের মতো কাজ করানো হয় বলেও অভিযোগ করেছেন তাঁরা। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অফিস সূত্রে জানা গেছে, আবাসিক মেডিকেল অফিসার, নাক-কান-গলা, সার্জারি, হৃদ্রোগ, চক্ষু, চর্ম ও যৌনরোগ, মেডিসিন, শিশু ও অ্যানেসথেসিয়াসহ বিভিন্ন বিভাগের জুনিয়র কনসালট্যান্ট এবং সহকারী সার্জন ও মেডিকেল অফিসারের পদ শূন্য রয়েছে। পাশাপাশি নার্সিং সুপারভাইজার, সিনিয়র স্টাফ নার্সসহ দ্বিতীয় শ্রেণির কর্মচারীদের পদেও জনবল ঘাটতি রয়েছে।তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারীদের মধ্যে মেডিকেল টেকনোলজিস্ট, ফার্মাসিস্ট, স্বাস্থ্য পরিদর্শক, সহকারী স্বাস্থ্য পরিদর্শক, স্বাস্থ্য সহকারী, অফিস সহকারীসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদ শূন্য রয়েছে। চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের মধ্যেও অফিস সহায়ক, ওয়ার্ড বয়, আয়া, বাবুর্চি ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীর পদে পর্যাপ্ত জনবল নেই। এতে হাসপাতালের চিকিৎসা ও আনুষঙ্গিক কার্যক্রম পরিচালনায় সমস্যা তৈরি হচ্ছে।উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. আবুল খায়ের মাহমুদ রাসেল বলেন, “বর্তমানে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ছাড়াই আমিসহ তিনজন চিকিৎসক দিয়ে চিকিৎসা কার্যক্রম চালাতে হচ্ছে। চিকিৎসক সংকটের কারণে প্রতিদিন একজন চিকিৎসককে গড়ে প্রায় ২০০ রোগীর সেবা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। অন্যদিকে, ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ সরবরাহ না থাকায় রোগীদের এসব ওষুধ দেওয়া যাচ্ছে না। এ বিষয়ে ঊর্ধ্বতন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বারবার অবহিত করেও সমাধান পাওয়া যায়নি।”রাজাপুর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক ও জনবল সংকট নিরসন এবং প্রয়োজনীয় ওষুধের সরবরাহ নিশ্চিত করতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন উপজেলার নাগরিক সমাজ। তাঁদের প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপে হাসপাতালটিতে স্বাভাবিক চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত হবে।