সকালে বাবার লাশ, রাতে ডিউটি আবার সকালে পরীক্ষার টেবিল
বাবাকে শেষ বিদায় জানিয়ে বিকেলে সম্পন্ন করেছেন দাফন। শোকের তীব্র ভারে ন্যুব্জ পরিবারকে একটু সান্ত্বনা বা সময় দেওয়ার সুযোগটুকুও পাননি। রাত নামতেই চোখের পানি মুছে হাতে বই নিয়ে তাকে ছুটতে হয়েছে এটিএম বুথের নাইট ডিউটিতে, কারণ পুরো পরিবারের জীবিকার ভার এখন তারই কাঁধে। আর ঠিক পরদিন অর্থাৎ আজ সকালেই তাকে বসতে হয়েছে উচ্চ মাধ্যমিক (এইচএসসি) পরীক্ষার হলে। একদিকে পিতৃহারা হওয়ার অসহনীয় যন্ত্রণা, অন্যদিকে সংসারের কঠিন দায় এবং ভবিষ্যৎ গড়ার লড়াই- এই দুইয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে অনন্য এক জীবন্ত সংগ্রামের গল্প রচনা করছেন বাগেরহাটের অদম্য তরুণ ইকন।বাগেরহাট শহরের মুনিগঞ্জ মেডিকেল স্কুল রোড এলাকার বাসিন্দা সদ্যপ্রয়াত ইসরাফিল দাড়িয়ার ছোট ছেলে ইকন। পরিবার সূত্রে জানা যায়, মঙ্গলবার (২১ জুলাই) ভোরে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন ৪৫ বছর বয়সী ইসরাফিল দাড়িয়া। সকাল ৬টার দিকে তাকে বাগেরহাট ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। জীবিকার তাগিদে ইসরাফিল নিজে মোটরসাইকেল চালিয়ে কোনোমতে সংসার চালাতেন। মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী ও দুই ছেলেকে রেখে যান। জোহরের নামাজের পর জানাজা শেষে তার মরদেহ গোপালগঞ্জে গ্রামের বাড়িতে নিয়ে মায়ের কবরের পাশে দাফন করা হয়।ইকনের পারিবারিক ইতিহাস যেন আরও মর্মান্তিক। পরিবার জানায়, বড় ছেলে ইমন একসময় বাবার সাথে মোটরসাইকেল চালিয়ে সংসারে সহায়তা করতেন। কিন্তু এক সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয়ে তিনি মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। এর পর থেকে পুরো সংসারের একমাত্র ভরসা হয়ে ওঠে ছোট ছেলে ইকন। সে বাগেরহাট খান জাহান আলী ডিগ্রি কলেজের মানবিক বিভাগের চলতি বছরের এইচএসসি পরীক্ষার্থী। পরিবারের খরচ ও ভাইয়ের চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে পড়াশোনার পাশাপাশি বাগেরহাট শহরের রেলরোড এলাকায় কৃষি ব্যাংকের একটি এটিএম বুথে রাতের শিফটে সিকিউরিটির দায়িত্ব পালন করছে ইকন।বাবার দাফন সম্পন্ন করে মঙ্গলবার রাতেই তিনি দায়িত্বের খাতিরে কর্মস্থলে ফিরে যান। রাত ১০টার দিকেও এটিএম বুথে বসে চোখে জল নিয়ে একদিকে ডিউটি সামলাতে এবং অন্যদিকে বইয়ের পাতায় চোখ মেলাতে দেখা যায় তাকে। কারণ আজ তার ‘ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি’ বিষয়ের পরীক্ষা।ইকনের এই অদম্য মানসিকতা ও দায়িত্ববোধে স্তব্ধ স্থানীয়রা। বাগেরহাট খান জাহান আলী ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ খোন্দকার আছিফ উদ্দিন রাখী গভীর সহানুভূতি প্রকাশ করে বলেন, 'ইকন আমাদের কলেজের অত্যন্ত দায়িত্বশীল একজন ছাত্র। জীবনের এই কঠিন মুহূর্তে এত বড় শোক বুকে চেপেও সে পরিবারের দায়িত্ব ও পরীক্ষা একসাথে সামলাচ্ছে, যা সত্যি অনুপ্রেরণাদায়ক। কলেজের পক্ষ থেকে আমরা সার্বক্ষণিক তার পাশে আছি এবং প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহযোগিতা দেওয়া হবে। আমরা তার প্রয়াত বাবার রুহের মাগফিরাত কামনা করছি।'