প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শারদীয় দুর্গোৎসবের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হলেও শেষ হয়নি উৎসবের আনন্দ-উচ্ছ্বাস। দেবী দুর্গা বিদায় নিয়েছেন, কিন্তু মেলা, জিলাপি আর মিষ্টির ঘ্রাণে এখনো উৎসবমুখর কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার বিভিন্ন এলাকা। মেলাকে ঘিরে হাটবাজারগুলোতে মানুষের পদচারণায় সৃষ্টি হয়েছে প্রাণচাঞ্চল্য। জিলাপি, খুড়মা ও মিষ্টির দোকানগুলোতে ক্রেতাদের ভিড় যেন জানান দিচ্ছে, দেবীর বিদায়ের পরও উৎসবের রেশ রয়ে গেছে মানুষের মনে।
বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত উপজেলার বালারহাট বাজার ও ফুলবাড়ী কাচারী মাঠের জিলাপি ও মিষ্টির দোকানগুলোতে ক্রেতাদের উপচেপড়া ভিড় দেখা গেছে। কেউ পরিবারের সদস্যদের নিয়ে দোকানে বসে জিলাপি খাচ্ছেন, আবার কেউ বাড়ির স্বজনদের জন্য কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। মেলাকে ঘিরে এমন দৃশ্য গ্রামবাংলার চিরচেনা ঐতিহ্য ও উৎসবের আনন্দকে আরও প্রাণবন্ত করে তুলেছে।
বাঙালির লোকজ সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ মেলা। আর মেলা মানেই জিলাপি, খুড়মা, মিষ্টি ও নানা রকম খাবারের সমাহার। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা এই ঐতিহ্য শুধু কেনাকাটার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং স্বজনদের সঙ্গে সময় কাটানো, পরিচিত মানুষের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ এবং পারিবারিক আনন্দ ভাগাভাগি করারও একটি উপলক্ষ।
বালারহাটের জিলাপি বিক্রেতা শংকর চন্দ্র পাল জানান, শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে সপ্তমীর দিন থেকে বৃহস্পতিবার দুপুর পর্যন্ত জিলাপি ও খুড়মা বিক্রি করে প্রায় ৯০ হাজার টাকা আয় হয়েছে। সব খরচ বাদ দিয়ে এ সময়ে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা লাভ হবে বলে আশা করছেন তিনি।
শংকর চন্দ্র পাল বলেন, “পূজা উপলক্ষে মেলায় জিলাপি ও মিষ্টির চাহিদা অনেক বেড়ে যায়। ক্রেতারা দোকানে বসে খাওয়ার পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদের জন্যও কিনে নিয়ে যান। বর্তমানে চিনির জিলাপি প্রতি কেজি ১৫০ টাকা, গুড়ের জিলাপি ১৪০ টাকা, খুড়মা ১২০ টাকা এবং মানভেদে মিষ্টি ২০০ থেকে ২৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করছি। বেচাকেনা ভালো হওয়ায় আমরা খুশি।
একই এলাকার জিলাপি বিক্রেতা শ্যামল চন্দ্র পাল ও ফজলু রহমান জানান, পূজা ও মেলাকে কেন্দ্র করে জিলাপি-মিষ্টির দোকানে ক্রেতাদের আগ্রহ বেড়ে যায়। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে মেলায় ঘুরতে এসে অনেকেই পছন্দের খাবার কিনে নিয়ে যান। এতে একদিকে মানুষের উৎসবের আনন্দ বাড়ে, অন্যদিকে স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও বাড়তি আয়ের সুযোগ পান।
ফুলবাড়ী কাচারী মাঠের জিলাপি বিক্রেতা মইনুল ইসলাম জানান, গত ১৪ অক্টোবর তিনি দোকান বসিয়েছেন। বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) দুপুর পর্যন্ত তাঁর দোকানে প্রায় ৬০ হাজার টাকার বিক্রি হয়েছে। দোকানে দুইজন কারিগর ও চারজন কর্মচারী রয়েছেন। সব খরচ বাদ দিয়ে এ পর্যন্ত পাঁচ থেকে ছয় হাজার টাকা আয় হয়েছে বলে জানান তিনি।
আয়ের পরিমাণ তুলনামূলক কম হওয়ার কারণ জানতে চাইলে মইনুল ইসলাম বলেন, কর্মচারীদের মজুরি ও অন্যান্য উপকরণের দাম বেড়ে যাওয়ায় লাভ কম হচ্ছে। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা পর্যন্ত দোকান চালু রাখার পরিকল্পনা রয়েছে বলেও জানান তিনি।
তিনি আরও বলেন, মেলায় মানুষের ভিড় ও জিলাপির দোকানে বেচাকেনার চিত্রই বলে দিচ্ছে, দেবী বিদায় নিলেও উৎসবের রেশ রয়ে গেছে মানুষের মনে। মেলা, জিলাপি, মিষ্টি আর পারিবারিক আনন্দের মধ্য দিয়ে গ্রামবাংলার ঐতিহ্য যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে পেয়েছে।
বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ ফুলবাড়ী উপজেলা শাখার সভাপতি কার্তিক চন্দ্র সরকার এবং বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ ফুলবাড়ী উপজেলা শাখার সভাপতি সুনীল চন্দ্র রায় জানান, সনাতন ধর্মাবলম্বীরা আনন্দ, উৎসাহ ও ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে পাঁচ দিনব্যাপী শারদীয় দুর্গোৎসব উদ্যাপন করেছেন। বুধবার প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শান্তিপূর্ণভাবে দুর্গোৎসবের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটে।
তাঁরা আরও জানান, বৃহস্পতিবার সকাল থেকে সন্ধ্যা, এমনকি রাত পর্যন্ত ফুলবাড়ী, বালারহাট, খড়িবাড়ী, বড়ভিটা, গঙ্গাহাট ও নেওয়াশী বাজারসহ উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় পূজার আমেজ বিরাজ করছে। এখনো জিলাপি, মিষ্টি ও মনিহারি দোকানগুলোতে বেচাকেনা চলছে। তাঁদের আশা, শুক্রবার পর্যন্ত এসব এলাকায় পূজাকে ঘিরে উৎসবের আমেজ বজায় থাকবে।
সব মিলিয়ে, প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে দুর্গোৎসবের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হলেও ফুলবাড়ীর বিভিন্ন এলাকার মেলা ও হাটবাজারে মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি উৎসবের আনন্দকে দীর্ঘায়িত করছে। জিলাপি-মিষ্টির স্বাদ, স্বজনদের সঙ্গে সময় কাটানো আর মেলার চিরচেনা আবহে দেবীর বিদায়ের পরও মুখর হয়ে আছে গ্রামবাংলার জনপদ।

বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২২ অক্টোবর ২০২৬
প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শারদীয় দুর্গোৎসবের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হলেও শেষ হয়নি উৎসবের আনন্দ-উচ্ছ্বাস। দেবী দুর্গা বিদায় নিয়েছেন, কিন্তু মেলা, জিলাপি আর মিষ্টির ঘ্রাণে এখনো উৎসবমুখর কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার বিভিন্ন এলাকা। মেলাকে ঘিরে হাটবাজারগুলোতে মানুষের পদচারণায় সৃষ্টি হয়েছে প্রাণচাঞ্চল্য। জিলাপি, খুড়মা ও মিষ্টির দোকানগুলোতে ক্রেতাদের ভিড় যেন জানান দিচ্ছে, দেবীর বিদায়ের পরও উৎসবের রেশ রয়ে গেছে মানুষের মনে।
বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত উপজেলার বালারহাট বাজার ও ফুলবাড়ী কাচারী মাঠের জিলাপি ও মিষ্টির দোকানগুলোতে ক্রেতাদের উপচেপড়া ভিড় দেখা গেছে। কেউ পরিবারের সদস্যদের নিয়ে দোকানে বসে জিলাপি খাচ্ছেন, আবার কেউ বাড়ির স্বজনদের জন্য কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। মেলাকে ঘিরে এমন দৃশ্য গ্রামবাংলার চিরচেনা ঐতিহ্য ও উৎসবের আনন্দকে আরও প্রাণবন্ত করে তুলেছে।
বাঙালির লোকজ সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ মেলা। আর মেলা মানেই জিলাপি, খুড়মা, মিষ্টি ও নানা রকম খাবারের সমাহার। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা এই ঐতিহ্য শুধু কেনাকাটার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং স্বজনদের সঙ্গে সময় কাটানো, পরিচিত মানুষের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ এবং পারিবারিক আনন্দ ভাগাভাগি করারও একটি উপলক্ষ।
বালারহাটের জিলাপি বিক্রেতা শংকর চন্দ্র পাল জানান, শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে সপ্তমীর দিন থেকে বৃহস্পতিবার দুপুর পর্যন্ত জিলাপি ও খুড়মা বিক্রি করে প্রায় ৯০ হাজার টাকা আয় হয়েছে। সব খরচ বাদ দিয়ে এ সময়ে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা লাভ হবে বলে আশা করছেন তিনি।
শংকর চন্দ্র পাল বলেন, “পূজা উপলক্ষে মেলায় জিলাপি ও মিষ্টির চাহিদা অনেক বেড়ে যায়। ক্রেতারা দোকানে বসে খাওয়ার পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদের জন্যও কিনে নিয়ে যান। বর্তমানে চিনির জিলাপি প্রতি কেজি ১৫০ টাকা, গুড়ের জিলাপি ১৪০ টাকা, খুড়মা ১২০ টাকা এবং মানভেদে মিষ্টি ২০০ থেকে ২৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করছি। বেচাকেনা ভালো হওয়ায় আমরা খুশি।
একই এলাকার জিলাপি বিক্রেতা শ্যামল চন্দ্র পাল ও ফজলু রহমান জানান, পূজা ও মেলাকে কেন্দ্র করে জিলাপি-মিষ্টির দোকানে ক্রেতাদের আগ্রহ বেড়ে যায়। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে মেলায় ঘুরতে এসে অনেকেই পছন্দের খাবার কিনে নিয়ে যান। এতে একদিকে মানুষের উৎসবের আনন্দ বাড়ে, অন্যদিকে স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও বাড়তি আয়ের সুযোগ পান।
ফুলবাড়ী কাচারী মাঠের জিলাপি বিক্রেতা মইনুল ইসলাম জানান, গত ১৪ অক্টোবর তিনি দোকান বসিয়েছেন। বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) দুপুর পর্যন্ত তাঁর দোকানে প্রায় ৬০ হাজার টাকার বিক্রি হয়েছে। দোকানে দুইজন কারিগর ও চারজন কর্মচারী রয়েছেন। সব খরচ বাদ দিয়ে এ পর্যন্ত পাঁচ থেকে ছয় হাজার টাকা আয় হয়েছে বলে জানান তিনি।
আয়ের পরিমাণ তুলনামূলক কম হওয়ার কারণ জানতে চাইলে মইনুল ইসলাম বলেন, কর্মচারীদের মজুরি ও অন্যান্য উপকরণের দাম বেড়ে যাওয়ায় লাভ কম হচ্ছে। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা পর্যন্ত দোকান চালু রাখার পরিকল্পনা রয়েছে বলেও জানান তিনি।
তিনি আরও বলেন, মেলায় মানুষের ভিড় ও জিলাপির দোকানে বেচাকেনার চিত্রই বলে দিচ্ছে, দেবী বিদায় নিলেও উৎসবের রেশ রয়ে গেছে মানুষের মনে। মেলা, জিলাপি, মিষ্টি আর পারিবারিক আনন্দের মধ্য দিয়ে গ্রামবাংলার ঐতিহ্য যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে পেয়েছে।
বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ ফুলবাড়ী উপজেলা শাখার সভাপতি কার্তিক চন্দ্র সরকার এবং বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ ফুলবাড়ী উপজেলা শাখার সভাপতি সুনীল চন্দ্র রায় জানান, সনাতন ধর্মাবলম্বীরা আনন্দ, উৎসাহ ও ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে পাঁচ দিনব্যাপী শারদীয় দুর্গোৎসব উদ্যাপন করেছেন। বুধবার প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শান্তিপূর্ণভাবে দুর্গোৎসবের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটে।
তাঁরা আরও জানান, বৃহস্পতিবার সকাল থেকে সন্ধ্যা, এমনকি রাত পর্যন্ত ফুলবাড়ী, বালারহাট, খড়িবাড়ী, বড়ভিটা, গঙ্গাহাট ও নেওয়াশী বাজারসহ উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় পূজার আমেজ বিরাজ করছে। এখনো জিলাপি, মিষ্টি ও মনিহারি দোকানগুলোতে বেচাকেনা চলছে। তাঁদের আশা, শুক্রবার পর্যন্ত এসব এলাকায় পূজাকে ঘিরে উৎসবের আমেজ বজায় থাকবে।
সব মিলিয়ে, প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে দুর্গোৎসবের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হলেও ফুলবাড়ীর বিভিন্ন এলাকার মেলা ও হাটবাজারে মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি উৎসবের আনন্দকে দীর্ঘায়িত করছে। জিলাপি-মিষ্টির স্বাদ, স্বজনদের সঙ্গে সময় কাটানো আর মেলার চিরচেনা আবহে দেবীর বিদায়ের পরও মুখর হয়ে আছে গ্রামবাংলার জনপদ।

আপনার মতামত লিখুন