বহুপ্রতিক্ষার পর বাগেরহাট পৌরসভার প্রধান ও উপ-সড়কগুলোর অবকাঠামোগত উন্নয়নে কোটি কোটি টাকার বাজেট বরাদ্দ ও কাজ শুরু হলেও নির্মাণকাজের জঘন্য মান, জালিয়াতি এবং তদারকি নিয়ে মারাত্মক ক্ষোভ ও প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। কাজ চলাকালেই কোথাও কার্পেটিং উঠে গিয়ে তৈরি হচ্ছে বড় বড় গর্ত, কোথাও বা নতুন রোলার চালানো রাস্তায় জমছে বৃষ্টির পানি। আবার অনেক জায়গায় পুরোনো জীর্ণ সড়কের ওপর প্রয়োজনীয় বালু ও খোয়ার শক্ত ভিত্তি প্রস্তুত না করেই তড়িঘড়ি করে নামমাত্র কার্পেটিং করে সরকারি বিল হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
পৌরসভার সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সিটিসিআরপি প্রকল্পের আওতায় বাগেরহাট পৌরসভার ১০টি গুরুত্বপূর্ণ সড়কের উন্নয়ন কাজের জন্য শুরুতে ৮ কোটি ৫২ লাখ টাকা বরাদ্দ ধরা হলেও পরবর্তীতে সংশোধিত বিলে তা বাড়িয়ে ৯ কোটি ১৯ লাখ ৮০ হাজার টাকা করা হয়। ২০২৫ সালের ২৬ জুন থেকে ২০২৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত মেয়াদী এ প্রকল্পের আওতায় চারটির কাজ প্রায় শেষ, দুটি শেষ পর্যায়ে, কিছু চলমান এবং বাকি চারটি কাজ এখনো শুরুই হয়নি। তবে এ পর্যন্ত মোট বরাদ্দের প্রায় ৩ কোটি ৭৮ লাখ ৩৪ হাজার টাকা উত্তোলন করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
নথি অনুযায়ী টেন্ডারটি ‘মেসার্স জহিরুল হক দুলাল’ ও কুড়িগ্রামের একটি প্রথম শ্রেণীর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নামে হলেও বাস্তবে মাঠপর্যায়ে সমস্ত কাজ নিয়ন্ত্রণ করছেন স্থানীয়ভাবে 'খোকন' নামে পরিচিত এক প্রভাবশালী ব্যক্তি। এলাকাবাসীর তীব্র প্রশ্ন- গত ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে স্বৈরাচারী শাসনের পতনের পরও কীভাবে আগের সরকারের আশীর্বাদপুষ্ট ওই বিতর্কিত ঠিকাদারি সিন্ডিকেটই ঘুরেফিরে সব কাজ নিয়ন্ত্রণ করছে? ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়েও কি ঠিকাদারি ব্যবস্থার নামে সেই পুরানো অনিয়ম ও লুটেরাই বহাল তবিয়তে রয়ে গেল?
সরেজমিনে তদন্তে উঠে এসেছে চরম অনিয়মের চিত্র। ১.৪৪০ কিলোমিটার দীর্ঘ 'মিঠাপুকুর পার মসজিদ থেকে নূর মসজিদ মোড় হয়ে এলজিইডি অফিস' সড়কের কাজ ৯৯ শতাংশ শেষ দাবি করা হলেও কাজ হস্তান্তরের আগেই বিভিন্ন স্থানে কার্পেটিং উঠে বিপজ্জনক খানাখন্দ তৈরি হয়েছে। ৩৪৩ মিটার দীর্ঘ 'বাসাভাটি আমতলা স্কুল থেকে টোল অফিস হয়ে পুটিমারি ব্রিজ' সড়কের ৮০ শতাংশ কাজ শেষের পথেই খোয়া উঠে গিয়ে তৈরি হয়েছে জলাবদ্ধতা। এছাড়া ৩ কোটি ৩৪ লাখ ৬৫ হাজার টাকা ব্যয়ে নির্মিতব্য ১.৬৯৩ কিলোমিটারের 'রাহাতের মোড় থেকে পুরাতন বাজার হয়ে চানমারি ব্রিজ' সড়কের কাজ হয়েছে মাত্র ৩৮ শতাংশ।
স্থানীয় বাসিন্দা আসাদ, শাহিন, জনি ও সাবু অভিযোগ করে বলেন, পুরোনো সড়ক খুঁড়ে নির্দিষ্ট গভীরতায় শক্ত বেড তৈরির নিয়ম থাকলেও তা সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে সামান্য খোয়া ফেলে রোলার চালিয়ে তার ওপর কার্পেটিং করা হয়েছে। কাজের সিডিউল দেখতে চাইলে ঠিকাদারের লোকেরা সাধারণ মানুষকে তা দেখায়নি। নিম্নমানের তিন নম্বর ইট ব্যবহারের প্রতিবাদ জানিয়ে এলাকাবাসী একপর্যায়ে কাজ বন্ধ করে দিলেও স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের সহযোগিতায় আবার একই নিম্নমানের সামগ্রী দিয়ে কাজ চালু করা হয়। সড়কের নিচু জায়গায় পানি জমার আপত্তি জানালে ঠিকাদারের পক্ষ থেকে বলা হয়- "বাজেট অনুযায়ী এখন এভাবেই হবে, ভেঙে গেলে পরে আবার করা হবে।"
শুধু নিম্নমানের কাজই নয়, স্থানীয় বয়োজ্যেষ্ঠ নাগরিক ও তদারকি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সাথে ঠিকাদার খোকনের অপব্যবহার ও দুর্ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে। সম্প্রতি নির্মাণকাজের অনিয়ম নিয়ে কৈফিয়ত চাওয়ায় প্রায় ৭০ বছর বয়সী এক প্রবীণ নারী বাসিন্দাকে ঠিকাদার গালিগালাজ করে লাঞ্ছিত করেছেন বলে স্থানীয়রা জানান। এছাড়া বিগত কোভিড-১৯ কালীন প্রকল্পে 'সোহেল কনস্ট্রাকশন'-এর নামে মোল্লাবাড়ির রাস্তা, ফরিদা মসজিদ সড়ক, ভিআইপি রোড ও পিটিআই স্কুল রোডের ড্রেন ও স্ল্যাব নির্মাণেও এই একই ব্যক্তির বিরুদ্ধে কোটি কোটি টাকার অনিয়মের নজির রয়েছে।
কাজের তথ্য ও অনিয়মের বিষয়ে ঠিকাদার খোকনের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রথমে সাংবাদিকদের সাথে সামনাসামনি বসে চা পানের দাওয়াত দিয়ে বিষয়টি রফা করার চেষ্টা করেন। পরবর্তীতে অনিয়মের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি তীব্র উত্তেজিত হয়ে ওঠেন এবং সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে "সব সাংবাদিক চাঁদাবাজ" বলে গালিগালাজ ও কটূক্তি করেন এবং কোনো ব্যাখা দিতে অস্বীকৃতি জানান।
এ বিষয়ে বাগেরহাট পৌরসভার প্রশাসক মেজবাহ উদ্দিন জানান, "পৌরসভার সড়ক উন্নয়ন কাজগুলো প্রতিনিয়ত তদারকি করা হচ্ছে। কোথাও কোনো সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হলে বা কাজে অনিয়ম প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারের মাধ্যমে তা পুনঃনির্মাণ করা হবে এবং প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"

বুধবার, ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বহুপ্রতিক্ষার পর বাগেরহাট পৌরসভার প্রধান ও উপ-সড়কগুলোর অবকাঠামোগত উন্নয়নে কোটি কোটি টাকার বাজেট বরাদ্দ ও কাজ শুরু হলেও নির্মাণকাজের জঘন্য মান, জালিয়াতি এবং তদারকি নিয়ে মারাত্মক ক্ষোভ ও প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। কাজ চলাকালেই কোথাও কার্পেটিং উঠে গিয়ে তৈরি হচ্ছে বড় বড় গর্ত, কোথাও বা নতুন রোলার চালানো রাস্তায় জমছে বৃষ্টির পানি। আবার অনেক জায়গায় পুরোনো জীর্ণ সড়কের ওপর প্রয়োজনীয় বালু ও খোয়ার শক্ত ভিত্তি প্রস্তুত না করেই তড়িঘড়ি করে নামমাত্র কার্পেটিং করে সরকারি বিল হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
পৌরসভার সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সিটিসিআরপি প্রকল্পের আওতায় বাগেরহাট পৌরসভার ১০টি গুরুত্বপূর্ণ সড়কের উন্নয়ন কাজের জন্য শুরুতে ৮ কোটি ৫২ লাখ টাকা বরাদ্দ ধরা হলেও পরবর্তীতে সংশোধিত বিলে তা বাড়িয়ে ৯ কোটি ১৯ লাখ ৮০ হাজার টাকা করা হয়। ২০২৫ সালের ২৬ জুন থেকে ২০২৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত মেয়াদী এ প্রকল্পের আওতায় চারটির কাজ প্রায় শেষ, দুটি শেষ পর্যায়ে, কিছু চলমান এবং বাকি চারটি কাজ এখনো শুরুই হয়নি। তবে এ পর্যন্ত মোট বরাদ্দের প্রায় ৩ কোটি ৭৮ লাখ ৩৪ হাজার টাকা উত্তোলন করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
নথি অনুযায়ী টেন্ডারটি ‘মেসার্স জহিরুল হক দুলাল’ ও কুড়িগ্রামের একটি প্রথম শ্রেণীর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নামে হলেও বাস্তবে মাঠপর্যায়ে সমস্ত কাজ নিয়ন্ত্রণ করছেন স্থানীয়ভাবে 'খোকন' নামে পরিচিত এক প্রভাবশালী ব্যক্তি। এলাকাবাসীর তীব্র প্রশ্ন- গত ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে স্বৈরাচারী শাসনের পতনের পরও কীভাবে আগের সরকারের আশীর্বাদপুষ্ট ওই বিতর্কিত ঠিকাদারি সিন্ডিকেটই ঘুরেফিরে সব কাজ নিয়ন্ত্রণ করছে? ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়েও কি ঠিকাদারি ব্যবস্থার নামে সেই পুরানো অনিয়ম ও লুটেরাই বহাল তবিয়তে রয়ে গেল?
সরেজমিনে তদন্তে উঠে এসেছে চরম অনিয়মের চিত্র। ১.৪৪০ কিলোমিটার দীর্ঘ 'মিঠাপুকুর পার মসজিদ থেকে নূর মসজিদ মোড় হয়ে এলজিইডি অফিস' সড়কের কাজ ৯৯ শতাংশ শেষ দাবি করা হলেও কাজ হস্তান্তরের আগেই বিভিন্ন স্থানে কার্পেটিং উঠে বিপজ্জনক খানাখন্দ তৈরি হয়েছে। ৩৪৩ মিটার দীর্ঘ 'বাসাভাটি আমতলা স্কুল থেকে টোল অফিস হয়ে পুটিমারি ব্রিজ' সড়কের ৮০ শতাংশ কাজ শেষের পথেই খোয়া উঠে গিয়ে তৈরি হয়েছে জলাবদ্ধতা। এছাড়া ৩ কোটি ৩৪ লাখ ৬৫ হাজার টাকা ব্যয়ে নির্মিতব্য ১.৬৯৩ কিলোমিটারের 'রাহাতের মোড় থেকে পুরাতন বাজার হয়ে চানমারি ব্রিজ' সড়কের কাজ হয়েছে মাত্র ৩৮ শতাংশ।
স্থানীয় বাসিন্দা আসাদ, শাহিন, জনি ও সাবু অভিযোগ করে বলেন, পুরোনো সড়ক খুঁড়ে নির্দিষ্ট গভীরতায় শক্ত বেড তৈরির নিয়ম থাকলেও তা সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে সামান্য খোয়া ফেলে রোলার চালিয়ে তার ওপর কার্পেটিং করা হয়েছে। কাজের সিডিউল দেখতে চাইলে ঠিকাদারের লোকেরা সাধারণ মানুষকে তা দেখায়নি। নিম্নমানের তিন নম্বর ইট ব্যবহারের প্রতিবাদ জানিয়ে এলাকাবাসী একপর্যায়ে কাজ বন্ধ করে দিলেও স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের সহযোগিতায় আবার একই নিম্নমানের সামগ্রী দিয়ে কাজ চালু করা হয়। সড়কের নিচু জায়গায় পানি জমার আপত্তি জানালে ঠিকাদারের পক্ষ থেকে বলা হয়- "বাজেট অনুযায়ী এখন এভাবেই হবে, ভেঙে গেলে পরে আবার করা হবে।"
শুধু নিম্নমানের কাজই নয়, স্থানীয় বয়োজ্যেষ্ঠ নাগরিক ও তদারকি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সাথে ঠিকাদার খোকনের অপব্যবহার ও দুর্ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে। সম্প্রতি নির্মাণকাজের অনিয়ম নিয়ে কৈফিয়ত চাওয়ায় প্রায় ৭০ বছর বয়সী এক প্রবীণ নারী বাসিন্দাকে ঠিকাদার গালিগালাজ করে লাঞ্ছিত করেছেন বলে স্থানীয়রা জানান। এছাড়া বিগত কোভিড-১৯ কালীন প্রকল্পে 'সোহেল কনস্ট্রাকশন'-এর নামে মোল্লাবাড়ির রাস্তা, ফরিদা মসজিদ সড়ক, ভিআইপি রোড ও পিটিআই স্কুল রোডের ড্রেন ও স্ল্যাব নির্মাণেও এই একই ব্যক্তির বিরুদ্ধে কোটি কোটি টাকার অনিয়মের নজির রয়েছে।
কাজের তথ্য ও অনিয়মের বিষয়ে ঠিকাদার খোকনের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রথমে সাংবাদিকদের সাথে সামনাসামনি বসে চা পানের দাওয়াত দিয়ে বিষয়টি রফা করার চেষ্টা করেন। পরবর্তীতে অনিয়মের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি তীব্র উত্তেজিত হয়ে ওঠেন এবং সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে "সব সাংবাদিক চাঁদাবাজ" বলে গালিগালাজ ও কটূক্তি করেন এবং কোনো ব্যাখা দিতে অস্বীকৃতি জানান।
এ বিষয়ে বাগেরহাট পৌরসভার প্রশাসক মেজবাহ উদ্দিন জানান, "পৌরসভার সড়ক উন্নয়ন কাজগুলো প্রতিনিয়ত তদারকি করা হচ্ছে। কোথাও কোনো সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হলে বা কাজে অনিয়ম প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারের মাধ্যমে তা পুনঃনির্মাণ করা হবে এবং প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"

আপনার মতামত লিখুন