বিপ্লবী বার্তা

মূল পাতা

এক্সক্লুসিভ

বৃষ্টিতে ভেজে বই-খাতা, রোদে পুড়ে ক্লাস পলিথিনের ছাপড়াঘরেই ৫ বছর

বৃষ্টিতে ভেজে বই-খাতা, রোদে পুড়ে ক্লাস পলিথিনের ছাপড়াঘরেই ৫ বছর
ছবিঃ বিপ্লবী বার্তা

বাইরে মুষলধারে বৃষ্টি। পলিথিনে ঢাকা গোলপাতার ছাপড়াঘরের ছাউনির ফাঁক দিয়ে টুপটাপ পানি পড়ছে। ভিজে যাচ্ছে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের বই-খাতা। ক্লাস নেওয়ার মতো পরিবেশ না থাকায় কখনো ছোট্ট অফিস কক্ষেই গাদাগাদি করে বসতে হচ্ছে তাদের। আবার বৃষ্টি থামলে শুরু হয় প্রচণ্ড গরম। বৈদ্যুতিক পাখা নেই, নেই নিরাপদ শ্রেণিকক্ষ। এভাবেই বছরের পর বছর শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ উপজেলার ১৯০ নং পশ্চিম তেলিগাতী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৯৬ শিক্ষার্থী।
 
প্রায় পাঁচ বছর ধরে বিদ্যালয়টির শিক্ষার্থীদের এমন দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। ১৯৮৯ সালে প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়টির পুরোনো ভবন ২০২২ সালে নিলাম প্রক্রিয়ায় অপসারণ করা হয়। এরপর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও নির্মাণ হয়নি নতুন কোনো ভবন। ফলে পলিথিন টাঙানো জরাজীর্ণ গোলপাতার ছাপড়াঘরেই চলছে পাঠদান।
 
শুধু অবকাঠামো সংকট নয়, বিদ্যালয়টিতে রয়েছে তীব্র শিক্ষক সংকটও। ছয়টি শিক্ষক পদের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত রয়েছেন মাত্র তিনজন। ২০২৪ সাল থেকে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য। সহকারী শিক্ষক রজিনা আক্তার ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করছেন। ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষ থেকে সহকারী শিক্ষকের আরও দুটি পদ শূন্য রয়েছে।
 
শিক্ষক সংকটের মধ্যেই দুই শিফটে তিনটি শ্রেণির পাঠদান পরিচালনা করতে হচ্ছে। শ্রেণিকক্ষে নেই বৈদ্যুতিক পাখা। বৃষ্টির সময় ছাউনির ফাঁক দিয়ে পানি পড়ে। তখন বই-খাতা বাঁচাতে শিক্ষার্থীদের ছোটাছুটি করতে হয়। পরিস্থিতি বেশি খারাপ হলে অফিস কক্ষেই নেওয়া হয় ক্লাস পরীক্ষা।
 
বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী রিয়া খাতুন বলেন ,বৃষ্টি হলে আমাদের বই-খাতা ভিজে যায়। তখন ঠিকমতো ক্লাস করতে পারি না। আবার গরমের সময় ছাপড়ার ভেতরে অনেক গরম লাগে। আমরা আর এভাবে ক্লাস করতে চাই না। আমাদের জন্য দ্রুত একটি নতুন স্কুল ভবন দরকার।
 
শিক্ষার্থীর অভিভাবক আলম শেখ বলেন, শিক্ষকরা আন্তরিকভাবে পড়ান, কিন্তু স্কুলের পরিবেশ খুব খারাপ। বৃষ্টি হলে শিশুদের বই-খাতা ভিজে যায়, রোদে প্রচণ্ড গরমে কষ্ট করে ক্লাস করতে হয়। কারণে অনেক অভিভাবক সন্তানদের অন্য স্কুল বা মাদ্রাসায় নিয়ে যাচ্ছেন। সরকার দ্রুত ভবন নির্মাণ করলে এই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আবার স্বাভাবিক পরিবেশে পড়াশোনা করতে পারবে।
 
স্থানীয় বাসিন্দা মোঃ তরিকুল ইসলাম বলেন,এই বিদ্যালয়ে আমাদের এলাকার অনেক শিশু পড়াশোনা করে। অথচ এত বছরেও একটি ভবন হয়নি। শিশুদের এভাবে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে পড়াশোনা করতে দেখা খুবই কষ্টের। সরকার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অনুরোধ, দ্রুত বিদ্যালয়ের ভবন নির্মাণের ব্যবস্থা করা হোক।
 
বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকরা জানান, ভবন না থাকায় শিক্ষক-শিক্ষার্থী সবাই চরম দুর্ভোগে রয়েছেন। প্রতিকূল পরিবেশের কারণে অনেক অভিভাবক সন্তানদের অন্যত্র ভর্তি করিয়ে দিচ্ছেন। বিষয়টি একাধিকবার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।
 
বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক রজিনা আক্তার বলেন,পুরোনো ভবন অপসারণের পর ২০২৩ সালে ক্ষুদ্র মেরামতের বরাদ্দ থেকে একটি ছোট টিনশেড অফিস কক্ষ নির্মাণ করা হয়েছিল। বর্তমানে শিক্ষকরা সেখানে অফিসের কাজ করেন। বৃষ্টির সময় শিক্ষার্থীদেরও ওই কক্ষেই ক্লাস পরীক্ষা নিতে হয়।
 
তিনি আরও বলেন,নতুন ভবন নির্মাণের জন্য উপজেলা শিক্ষা অফিসে একাধিকবার আবেদন করা হয়েছে। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট ক্লাস্টার পরিদর্শকদেরও জানানো হয়েছে। তবে এখনো নতুন ভবন নির্মাণের কোনো কার্যকর অগ্রগতি দেখা যায়নি।
 
বিষয়ে বাগেরহাট প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার নাসরীন আক্তার বলেন, ১৯০ নং পশ্চিম তেলিগাতী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভবন সংকটের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অবহিত করা হয়েছে। নতুন ভবনের জন্য বিদ্যালয়টির নাম একাধিকবার প্রস্তাবনায় রয়েছে। পরবর্তী বরাদ্দে বিদ্যালয়টি নতুন ভবনের তালিকায় থাকবে বলে আশা করছি।
 
স্থানীয়দের দাবি, বছরের পর বছর পলিথিনের ছাপড়াঘরে শিশুদের পাঠদান কোনোভাবেই স্বাভাবিক শিক্ষা পরিবেশ হতে পারে না। দ্রুত নিরাপদ স্থায়ী ভবন নির্মাণ করা না হলে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা কার্যক্রম আরও ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

আপনার মতামত লিখুন

বিপ্লবী বার্তা

মঙ্গলবার, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬


বৃষ্টিতে ভেজে বই-খাতা, রোদে পুড়ে ক্লাস পলিথিনের ছাপড়াঘরেই ৫ বছর

প্রকাশের তারিখ : ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

বাইরে মুষলধারে বৃষ্টি। পলিথিনে ঢাকা গোলপাতার ছাপড়াঘরের ছাউনির ফাঁক দিয়ে টুপটাপ পানি পড়ছে। ভিজে যাচ্ছে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের বই-খাতা। ক্লাস নেওয়ার মতো পরিবেশ না থাকায় কখনো ছোট্ট অফিস কক্ষেই গাদাগাদি করে বসতে হচ্ছে তাদের। আবার বৃষ্টি থামলে শুরু হয় প্রচণ্ড গরম। বৈদ্যুতিক পাখা নেই, নেই নিরাপদ শ্রেণিকক্ষ। এভাবেই বছরের পর বছর শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ উপজেলার ১৯০ নং পশ্চিম তেলিগাতী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৯৬ শিক্ষার্থী।
 
প্রায় পাঁচ বছর ধরে বিদ্যালয়টির শিক্ষার্থীদের এমন দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। ১৯৮৯ সালে প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়টির পুরোনো ভবন ২০২২ সালে নিলাম প্রক্রিয়ায় অপসারণ করা হয়। এরপর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও নির্মাণ হয়নি নতুন কোনো ভবন। ফলে পলিথিন টাঙানো জরাজীর্ণ গোলপাতার ছাপড়াঘরেই চলছে পাঠদান।
 
শুধু অবকাঠামো সংকট নয়, বিদ্যালয়টিতে রয়েছে তীব্র শিক্ষক সংকটও। ছয়টি শিক্ষক পদের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত রয়েছেন মাত্র তিনজন। ২০২৪ সাল থেকে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য। সহকারী শিক্ষক রজিনা আক্তার ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করছেন। ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষ থেকে সহকারী শিক্ষকের আরও দুটি পদ শূন্য রয়েছে।
 
শিক্ষক সংকটের মধ্যেই দুই শিফটে তিনটি শ্রেণির পাঠদান পরিচালনা করতে হচ্ছে। শ্রেণিকক্ষে নেই বৈদ্যুতিক পাখা। বৃষ্টির সময় ছাউনির ফাঁক দিয়ে পানি পড়ে। তখন বই-খাতা বাঁচাতে শিক্ষার্থীদের ছোটাছুটি করতে হয়। পরিস্থিতি বেশি খারাপ হলে অফিস কক্ষেই নেওয়া হয় ক্লাস পরীক্ষা।
 
বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী রিয়া খাতুন বলেন ,বৃষ্টি হলে আমাদের বই-খাতা ভিজে যায়। তখন ঠিকমতো ক্লাস করতে পারি না। আবার গরমের সময় ছাপড়ার ভেতরে অনেক গরম লাগে। আমরা আর এভাবে ক্লাস করতে চাই না। আমাদের জন্য দ্রুত একটি নতুন স্কুল ভবন দরকার।
 
শিক্ষার্থীর অভিভাবক আলম শেখ বলেন, শিক্ষকরা আন্তরিকভাবে পড়ান, কিন্তু স্কুলের পরিবেশ খুব খারাপ। বৃষ্টি হলে শিশুদের বই-খাতা ভিজে যায়, রোদে প্রচণ্ড গরমে কষ্ট করে ক্লাস করতে হয়। কারণে অনেক অভিভাবক সন্তানদের অন্য স্কুল বা মাদ্রাসায় নিয়ে যাচ্ছেন। সরকার দ্রুত ভবন নির্মাণ করলে এই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আবার স্বাভাবিক পরিবেশে পড়াশোনা করতে পারবে।
 
স্থানীয় বাসিন্দা মোঃ তরিকুল ইসলাম বলেন,এই বিদ্যালয়ে আমাদের এলাকার অনেক শিশু পড়াশোনা করে। অথচ এত বছরেও একটি ভবন হয়নি। শিশুদের এভাবে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে পড়াশোনা করতে দেখা খুবই কষ্টের। সরকার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অনুরোধ, দ্রুত বিদ্যালয়ের ভবন নির্মাণের ব্যবস্থা করা হোক।
 
বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকরা জানান, ভবন না থাকায় শিক্ষক-শিক্ষার্থী সবাই চরম দুর্ভোগে রয়েছেন। প্রতিকূল পরিবেশের কারণে অনেক অভিভাবক সন্তানদের অন্যত্র ভর্তি করিয়ে দিচ্ছেন। বিষয়টি একাধিকবার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।
 
বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক রজিনা আক্তার বলেন,পুরোনো ভবন অপসারণের পর ২০২৩ সালে ক্ষুদ্র মেরামতের বরাদ্দ থেকে একটি ছোট টিনশেড অফিস কক্ষ নির্মাণ করা হয়েছিল। বর্তমানে শিক্ষকরা সেখানে অফিসের কাজ করেন। বৃষ্টির সময় শিক্ষার্থীদেরও ওই কক্ষেই ক্লাস পরীক্ষা নিতে হয়।
 
তিনি আরও বলেন,নতুন ভবন নির্মাণের জন্য উপজেলা শিক্ষা অফিসে একাধিকবার আবেদন করা হয়েছে। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট ক্লাস্টার পরিদর্শকদেরও জানানো হয়েছে। তবে এখনো নতুন ভবন নির্মাণের কোনো কার্যকর অগ্রগতি দেখা যায়নি।
 
বিষয়ে বাগেরহাট প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার নাসরীন আক্তার বলেন, ১৯০ নং পশ্চিম তেলিগাতী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভবন সংকটের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অবহিত করা হয়েছে। নতুন ভবনের জন্য বিদ্যালয়টির নাম একাধিকবার প্রস্তাবনায় রয়েছে। পরবর্তী বরাদ্দে বিদ্যালয়টি নতুন ভবনের তালিকায় থাকবে বলে আশা করছি।
 
স্থানীয়দের দাবি, বছরের পর বছর পলিথিনের ছাপড়াঘরে শিশুদের পাঠদান কোনোভাবেই স্বাভাবিক শিক্ষা পরিবেশ হতে পারে না। দ্রুত নিরাপদ স্থায়ী ভবন নির্মাণ করা না হলে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা কার্যক্রম আরও ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।


বিপ্লবী বার্তা

প্রকাশক
শেখ মাহমুদ উজ্জ্বল
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক
কাইয়ুম তালুকদার (কানন)
উপদেষ্টা সম্পাদক
ড. জাহিদ আহমেদ চৌধুরী

কপিরাইট © ২০২৬ । বিপ্লবী বার্তা