বয়স
মাত্র সাড়ে চার বছর। যে বয়সে অন্য
শিশুরা বাবা-মায়ের হাত ধরে স্কুলে যায়, খেলাধুলা আর আনন্দে মেতে
থাকে, সেই বয়সেই ছোট্ট আবু বক্করের জীবনে নেমে এসেছে একের পর এক শূন্যতা।
মাত্র ১৭ মাস বয়সে
সে হারিয়েছে মাকে। মায়ের মৃত্যুর কিছুদিন পর বাবাও তাকে
ছেড়ে চলে গেছেন। এরপর আর ফিরে আসেননি।
বাবা-মায়ের স্নেহ থেকে বঞ্চিত আবু বক্কর এখন নানা-নানির কাছেই বেড়ে উঠছে।
পরিবার
সূত্রে জানা যায়, আবু বক্করের বাবা কাশেম শেখ ও মা ফাতেমাতুর
জোহোরা ওরফে ফাতেমা বেগম। মাত্র ১৭ মাস বয়সে
মাকে হারানোর পর কিছুদিনের মধ্যেই
বাবা তাকে ছেড়ে চলে যান। এরপর থেকে নানা কুদ্দুস হাওলাদার ও নানি সাজেদা
বেগমের কাছেই বেড়ে উঠছে সে।
নানা
কুদ্দুস হাওলাদার পেশায় রাজমিস্ত্রি। দিনমজুরির আয় দিয়ে কোনোভাবে
সংসার চালান তিনি। সেই সামান্য আয় দিয়ে নাতির
নিয়মিত চিকিৎসা ও রক্তের ব্যবস্থা
করা তার জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।
কুদ্দুস হাওলাদার বলেন, মেয়েটা মারা যাওয়ার পর থেকেই আবু বক্কর আমাদের কাছে। ওর বাবা চলে যাওয়ার পর আর কোনো খোঁজ নেয়নি। আমরা যতটুকু পারি ওর চিকিৎসা করাই। কিন্তু আমি রাজমিস্ত্রির কাজ করি। নিজের সংসার চালাব, নাকি ওর চিকিৎসার খরচ দেব—কিছুই বুঝতে পারি না। নিয়মিত রক্ত দিতে হয়। অনেক সময় রক্তের ব্যবস্থা করতেও কষ্ট হয়। সরকার ও সমাজের বিত্তবান মানুষ যদি আমার নাতির পাশে দাঁড়ান, তাহলে ওকে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব হবে।
নানি
সাজেদা বেগম বলেন, ছোটবেলা থেকেই ও আমাদের কাছেই
মানুষ হচ্ছে। বাবা-মা কেউ নেই।
ও খুব ভালো ছেলে, পড়াশোনার প্রতি অনেক আগ্রহ। কিন্তু অসুস্থ হওয়ার পর থেকে সবসময়
ভয় লাগে। কখন কী হয় বলা
যায় না। রক্তের জন্য অনেক চিন্তায় থাকতে হয়। আমার নাতিটাকে আমরা বাঁচাতে চাই। যারা পারেন, সবাই যদি একটু সহযোগিতা করেন, তাহলে ওর চিকিৎসা চালিয়ে
যেতে পারব।
স্থানীয়
বাসিন্দা রুম্মান মাহমুদ বলেন,আবু বক্কর খুব ভালো ছেলে। মাত্র ১৭ মাস বয়সে
ওর মা মারা যায়।
এরপর বাবা চলে যাওয়ায় নানা-নানির কাছেই মানুষ হচ্ছে। আমরা প্রতিদিন দেখি, খুব ভোরে উঠে মসজিদের মকতবে কিতাব পড়তে যায়। অন্য শিশুদের বাবা-মা তাদের নিয়ে
আসে, কিন্তু ওর তো কেউ
নেই। এর মধ্যে আবার
থ্যালাসেমিয়া হয়েছে। নিয়মিত রক্ত দিতে হয়। এক মাস রক্ত
না দিলে ওর অবস্থা খুব
খারাপ হয়ে যায়। ওর পেটও অনেক
বড় হয়ে গেছে। ওর নানা রাজমিস্ত্রির
কাজ করে—সংসার চালাবে, নাকি নাতির চিকিৎসা করবে? আমরা চাই সরকার ও বিত্তবানরা ওর
পাশে দাঁড়ান।
আরেক স্থানীয় বাসিন্দা মোঃ হামিদ বলেন, আমাদের বাচ্চাদের সঙ্গেই আবু বক্কর মকতবে পড়াশোনা করে। এখানে অনেক শিশু পড়লেও ও একমাত্র এতিম। বাবা-মা কেউ নেই, আবার শারীরিকভাবেও অসুস্থ। ছেলেটা খুব মেধাবী, পড়াশোনায় মনোযোগী। তার গলার কণ্ঠও অনেক সুন্দর। আমরা চাই সরকার শিশুটির চিকিৎসার বিষয়ে একটু নজর দিক।
আবু বক্করের শিক্ষক মোঃ রফিকুল ইসলাম বলেন, আমার এই মকতবে ৩৫ জন ছাত্রছাত্রী রয়েছে। তাদের মধ্যে সবচেয়ে মেধাবী ছাত্রদের একজন আবু বক্কর। মাত্র সাড়ে চার বছর বয়সে সে ১৫টি সূরা মুখস্থ করেছে। খুব মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করে। সুন্দর কণ্ঠে গজল গাইতে পারে, সূরা পড়তে পারে। সবচেয়ে দুঃখের বিষয় হলো, ওর মা নেই, বাবাও নেই। ওর খোঁজ নেওয়ার মতো শুধু নানা-নানি আছেন। এর মধ্যে থ্যালাসেমিয়া রোগে আক্রান্ত হয়েছে। ওর শরীরে রক্ত থাকে না, নিয়মিত রক্ত দিতে হয়। এত ছোট একটি এতিম শিশুর পাশে আমাদের সবার দাঁড়ানো উচিত।
এ বিষয়ে রামপাল উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মোঃ শাহিনুর রহমান বলেন, বিষয়টি আমাদের নজরে এলে শিশুটির পরিবারের সঙ্গে কথা বলে তার বর্তমান অবস্থা ও চিকিৎসাসংক্রান্ত তথ্য যাচাই করা হবে। সমাজসেবা অধিদপ্তরের প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী শিশুটি কোনো সহায়তার আওতায় আসার সুযোগ রয়েছে কি না, তা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করা হবে। একই সঙ্গে শিশুটির চিকিৎসা ও রক্তের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি মানবিকভাবে দেখার জন্য সমাজের বিত্তবান ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোর প্রতি আহ্বান জানাই।
শিক্ষক, স্থানীয় বাসিন্দা ও স্বজনদের ভাষ্য, শারীরিক অসুস্থতার সঙ্গে লড়াই করেও পড়াশোনা ও ধর্মীয় শিক্ষায় এগিয়ে যাচ্ছে আবু বক্কর। তার বয়সী শিশুরা যখন বাবা-মায়ের আদর-স্নেহে বেড়ে উঠছে, তখন সে নানা-নানির সীমিত সামর্থ্যের মধ্যে বেঁচে থাকার লড়াই করছে।
স্থানীয়দের দাবি, থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত এই মেধাবী এতিম শিশুটির চিকিৎসায় সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি সমাজের বিত্তবান ও মানবিক মানুষরা এগিয়ে এলে তার নিয়মিত চিকিৎসা ও রক্তের ব্যবস্থা করা সম্ভব হবে।

রোববার, ৩০ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ৩০ আগস্ট ২০২৬
বয়স
মাত্র সাড়ে চার বছর। যে বয়সে অন্য
শিশুরা বাবা-মায়ের হাত ধরে স্কুলে যায়, খেলাধুলা আর আনন্দে মেতে
থাকে, সেই বয়সেই ছোট্ট আবু বক্করের জীবনে নেমে এসেছে একের পর এক শূন্যতা।
মাত্র ১৭ মাস বয়সে
সে হারিয়েছে মাকে। মায়ের মৃত্যুর কিছুদিন পর বাবাও তাকে
ছেড়ে চলে গেছেন। এরপর আর ফিরে আসেননি।
বাবা-মায়ের স্নেহ থেকে বঞ্চিত আবু বক্কর এখন নানা-নানির কাছেই বেড়ে উঠছে।
পরিবার
সূত্রে জানা যায়, আবু বক্করের বাবা কাশেম শেখ ও মা ফাতেমাতুর
জোহোরা ওরফে ফাতেমা বেগম। মাত্র ১৭ মাস বয়সে
মাকে হারানোর পর কিছুদিনের মধ্যেই
বাবা তাকে ছেড়ে চলে যান। এরপর থেকে নানা কুদ্দুস হাওলাদার ও নানি সাজেদা
বেগমের কাছেই বেড়ে উঠছে সে।
নানা
কুদ্দুস হাওলাদার পেশায় রাজমিস্ত্রি। দিনমজুরির আয় দিয়ে কোনোভাবে
সংসার চালান তিনি। সেই সামান্য আয় দিয়ে নাতির
নিয়মিত চিকিৎসা ও রক্তের ব্যবস্থা
করা তার জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।
কুদ্দুস হাওলাদার বলেন, মেয়েটা মারা যাওয়ার পর থেকেই আবু বক্কর আমাদের কাছে। ওর বাবা চলে যাওয়ার পর আর কোনো খোঁজ নেয়নি। আমরা যতটুকু পারি ওর চিকিৎসা করাই। কিন্তু আমি রাজমিস্ত্রির কাজ করি। নিজের সংসার চালাব, নাকি ওর চিকিৎসার খরচ দেব—কিছুই বুঝতে পারি না। নিয়মিত রক্ত দিতে হয়। অনেক সময় রক্তের ব্যবস্থা করতেও কষ্ট হয়। সরকার ও সমাজের বিত্তবান মানুষ যদি আমার নাতির পাশে দাঁড়ান, তাহলে ওকে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব হবে।
নানি
সাজেদা বেগম বলেন, ছোটবেলা থেকেই ও আমাদের কাছেই
মানুষ হচ্ছে। বাবা-মা কেউ নেই।
ও খুব ভালো ছেলে, পড়াশোনার প্রতি অনেক আগ্রহ। কিন্তু অসুস্থ হওয়ার পর থেকে সবসময়
ভয় লাগে। কখন কী হয় বলা
যায় না। রক্তের জন্য অনেক চিন্তায় থাকতে হয়। আমার নাতিটাকে আমরা বাঁচাতে চাই। যারা পারেন, সবাই যদি একটু সহযোগিতা করেন, তাহলে ওর চিকিৎসা চালিয়ে
যেতে পারব।
স্থানীয়
বাসিন্দা রুম্মান মাহমুদ বলেন,আবু বক্কর খুব ভালো ছেলে। মাত্র ১৭ মাস বয়সে
ওর মা মারা যায়।
এরপর বাবা চলে যাওয়ায় নানা-নানির কাছেই মানুষ হচ্ছে। আমরা প্রতিদিন দেখি, খুব ভোরে উঠে মসজিদের মকতবে কিতাব পড়তে যায়। অন্য শিশুদের বাবা-মা তাদের নিয়ে
আসে, কিন্তু ওর তো কেউ
নেই। এর মধ্যে আবার
থ্যালাসেমিয়া হয়েছে। নিয়মিত রক্ত দিতে হয়। এক মাস রক্ত
না দিলে ওর অবস্থা খুব
খারাপ হয়ে যায়। ওর পেটও অনেক
বড় হয়ে গেছে। ওর নানা রাজমিস্ত্রির
কাজ করে—সংসার চালাবে, নাকি নাতির চিকিৎসা করবে? আমরা চাই সরকার ও বিত্তবানরা ওর
পাশে দাঁড়ান।
আরেক স্থানীয় বাসিন্দা মোঃ হামিদ বলেন, আমাদের বাচ্চাদের সঙ্গেই আবু বক্কর মকতবে পড়াশোনা করে। এখানে অনেক শিশু পড়লেও ও একমাত্র এতিম। বাবা-মা কেউ নেই, আবার শারীরিকভাবেও অসুস্থ। ছেলেটা খুব মেধাবী, পড়াশোনায় মনোযোগী। তার গলার কণ্ঠও অনেক সুন্দর। আমরা চাই সরকার শিশুটির চিকিৎসার বিষয়ে একটু নজর দিক।
আবু বক্করের শিক্ষক মোঃ রফিকুল ইসলাম বলেন, আমার এই মকতবে ৩৫ জন ছাত্রছাত্রী রয়েছে। তাদের মধ্যে সবচেয়ে মেধাবী ছাত্রদের একজন আবু বক্কর। মাত্র সাড়ে চার বছর বয়সে সে ১৫টি সূরা মুখস্থ করেছে। খুব মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করে। সুন্দর কণ্ঠে গজল গাইতে পারে, সূরা পড়তে পারে। সবচেয়ে দুঃখের বিষয় হলো, ওর মা নেই, বাবাও নেই। ওর খোঁজ নেওয়ার মতো শুধু নানা-নানি আছেন। এর মধ্যে থ্যালাসেমিয়া রোগে আক্রান্ত হয়েছে। ওর শরীরে রক্ত থাকে না, নিয়মিত রক্ত দিতে হয়। এত ছোট একটি এতিম শিশুর পাশে আমাদের সবার দাঁড়ানো উচিত।
এ বিষয়ে রামপাল উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মোঃ শাহিনুর রহমান বলেন, বিষয়টি আমাদের নজরে এলে শিশুটির পরিবারের সঙ্গে কথা বলে তার বর্তমান অবস্থা ও চিকিৎসাসংক্রান্ত তথ্য যাচাই করা হবে। সমাজসেবা অধিদপ্তরের প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী শিশুটি কোনো সহায়তার আওতায় আসার সুযোগ রয়েছে কি না, তা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করা হবে। একই সঙ্গে শিশুটির চিকিৎসা ও রক্তের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি মানবিকভাবে দেখার জন্য সমাজের বিত্তবান ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোর প্রতি আহ্বান জানাই।
শিক্ষক, স্থানীয় বাসিন্দা ও স্বজনদের ভাষ্য, শারীরিক অসুস্থতার সঙ্গে লড়াই করেও পড়াশোনা ও ধর্মীয় শিক্ষায় এগিয়ে যাচ্ছে আবু বক্কর। তার বয়সী শিশুরা যখন বাবা-মায়ের আদর-স্নেহে বেড়ে উঠছে, তখন সে নানা-নানির সীমিত সামর্থ্যের মধ্যে বেঁচে থাকার লড়াই করছে।
স্থানীয়দের দাবি, থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত এই মেধাবী এতিম শিশুটির চিকিৎসায় সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি সমাজের বিত্তবান ও মানবিক মানুষরা এগিয়ে এলে তার নিয়মিত চিকিৎসা ও রক্তের ব্যবস্থা করা সম্ভব হবে।

আপনার মতামত লিখুন