বিপ্লবী বার্তা

মূল পাতা

সারাদেশ

৭ বছর ধরে ৩৫ শিশুর কোরআন শিক্ষার দায়িত্ব রফিকুলের

৭ বছর ধরে ৩৫ শিশুর কোরআন শিক্ষার দায়িত্ব রফিকুলের
ছবিঃ বিপ্লবী বার্তা

একদিকে মসজিদের ইমামতি, অন্যদিকে জীবিকার তাগিদে রাজমিস্ত্রির কাজ। এর মাঝেই গত সাত বছর ধরে কোনো বেতন-ভাতা ছাড়াই গ্রামের শিশুদের কোরআন ও ধর্মীয় শিক্ষা দিয়ে যাচ্ছেন মো. রফিকুল ইসলাম। নিজের সংসারেই যেখানে অভাব-অনটন নিত্যসঙ্গী, সেখানে অন্যের সন্তানদের শিক্ষার আলোয় আলোকিত করতে নীরবে একটি মকতব চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। অভাবের সংসারেও থেমে থাকেনি তাঁর এই মানবিক উদ্যোগ। বর্তমানে তাঁর কাছে নিয়মিত প্রায় ৩৫ শিশু এবং ১০ জনের মতো বয়স্ক মানুষ কোরআন শিক্ষা নিতে আসেন।

বাগেরহাটের রামপাল উপজেলার উজড়কুল ইউনিয়নের কদমদী গ্রামের বায়তুন নাজাত জামে মসজিদের ইমাম রফিকুল ইসলাম। তাঁর বাড়ি উপজেলার নং ওয়ার্ডের কদমদী পশ্চিমপাড়ায়, মাদ্রাসা বাসস্ট্যান্ডের পাশে। মসজিদের খেদমতের পাশাপাশি নিজ উদ্যোগে সেখানে একটি মকতব গড়ে তুলেছেন তিনি। কোনো পারিশ্রমিক ছাড়াই দীর্ঘ সাত বছর ধরে শিশু বয়স্কদের ধর্মীয় শিক্ষা দিয়ে আসছেন।

স্থানীয়রা জানান, ফজরের আজানের পরপরই শিশুদের নিয়ে বসেন রফিকুল ইসলাম। ভোর থেকে সকাল ৭টা পর্যন্ত চলে পাঠদান। সময় শিশুদের কোরআন পড়ার পাশাপাশি বিভিন্ন সূরা, দোয়া, আজান গজল শেখানো হয়। শিশুদের উৎসাহ বাড়াতে মাঝে মাঝে বিভিন্ন প্রতিযোগিতারও আয়োজন করেন তিনি। দিনের বেলায় রাজমিস্ত্রির কাজ করার পর রাতেও প্রায় ১০ জনের মতো বয়স্ক মানুষ তাঁর কাছে কোরআন শিক্ষা নিতে আসেন।

রফিকুল ইসলামের সংসারে বৃদ্ধ বাবা-মাসহ সাতজন সদস্য। ছোটবেলায় একটি মেয়েকে হারিয়েছেন তিনি। বর্তমানে ছোট আরেক মেয়েসহ পরিবারের সদস্যদের ভরণপোষণের দায়িত্ব তাঁর কাঁধে। সংসারের খরচ মেটাতে নিয়মিত রাজমিস্ত্রির কাজ করতে হয় তাকে। নির্মাণকাজে যে আয় হয়, তা দিয়েই কোনোভাবে চলে পরিবারের নিত্যদিনের খরচ।
সারাদিন নির্মাণকাজে শ্রম দেওয়ার পর শরীরে ক্লান্তি থাকলেও শিশুদের পড়ানোর দায়িত্বে কখনো পিছপা হন না রফিকুল। কাজের জায়গা দূরে হলেও মকতব মসজিদের দায়িত্বের সঙ্গে সময় মিলিয়ে চলার চেষ্টা করেন তিনি। এলাকায় কাজ থাকলে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের ইমামতি নিজেই করেন। আর দূরে কোথাও কাজ করতে গেলে আগে থেকেই একজন বিকল্প ব্যক্তিকে মসজিদে নামাজ পড়ানোর দায়িত্ব দিয়ে যান। কাজ শেষে ফিরে এসে আবার শিশুদের পড়ানো মসজিদের অন্যান্য দায়িত্ব পালন করেন।

রফিকুল ইসলাম বলেন, সংসারে অভাব আছে। রাজমিস্ত্রির কাজ করে কোনোভাবে পরিবার চালাই। কিন্তু গ্রামের বাচ্চারা যেন কোরআন ধর্মীয় শিক্ষা থেকে বঞ্চিত না হয়, সেই চিন্তা থেকেই মকতবটি চালিয়ে যাচ্ছি। সাত বছর ধরে কোনো বেতন নিইনি। আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই এই কাজ করছি।
 
তিনি বলেন, ফজরের আজানের পর বাচ্চাদের পড়ানো শুরু করি। সকাল ৭টা পর্যন্ত পড়ানোর পর কাজে চলে যাই। রাতে আবার বয়স্করা কোরআন শিখতে আসেন। সারাদিন কাজ করার পর শরীর ক্লান্ত থাকে, কিন্তু বাচ্চাদের পড়াতে বসলে সেই ক্লান্তি আর মনে থাকে না। তারা ভালোভাবে মানুষ হতে পারলে সেটাই আমার সবচেয়ে বড় পাওয়া।

স্থানীয় বাসিন্দা কাশেম মিয়া বলেন,রফিকুল ভাইয়ের নিজের সংসারেই অনেক কষ্ট। সারাদিন রাজমিস্ত্রির কাজ করে যে টাকা পান, তা দিয়ে সাতজনের সংসার চালানো কঠিন। তারপরও তিনি এলাকার বাচ্চাদের পড়ান। বিনিময়ে কোনো টাকা নেন না। তাঁর মতো মানুষ সমাজে খুব কম দেখা যায়।

আরেক বাসিন্দা মোঃ ইসরাফিল আকন  বলেন, অনেক সময় তাঁকে কাজ থেকে ক্লান্ত হয়ে ফিরতে দেখি। এরপরও বিশ্রাম না নিয়ে বাচ্চাদের নিয়ে বসেন। তাঁর কারণে এলাকার অনেক শিশু কোরআন প্রাথমিক ধর্মীয় শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। শুধু শিশুরাই নয়, বয়স্করাও তাঁর কাছে কোরআন শিখছেন।

স্থানীয় বাসিন্দা শৈশব শেখ বলেন,রফিকুল ইসলাম শুধু মসজিদের ইমাম নন, তিনি আমাদের এলাকার শিশুদের জন্য একজন শিক্ষকের মতো। নিজের অভাবের কথা না ভেবে সাত বছর ধরে বিনা বেতনে শিশুদের পড়াচ্ছেন। সমাজের বিত্তবান মানুষ সংশ্লিষ্টরা তাঁর পাশে দাঁড়ালে মকতবটি আরও সুন্দরভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হবে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, নিজের জীবনের অভাব-অনটনকে পাশ কাটিয়ে শিশুদের ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন দেখছেন রফিকুল ইসলাম। সংসারের খরচ জোগাতে প্রতিদিন কঠোর পরিশ্রম করেও অন্যের সন্তানদের শিক্ষার দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন তিনি। কোনো পারিশ্রমিক কিংবা আর্থিক লাভের প্রত্যাশা ছাড়াই বছরের পর বছর ধরে চালিয়ে যাচ্ছেন এই উদ্যোগ।

সাত বছরে তাঁর মকতব থেকে কত শিশু কোরআন ধর্মীয় শিক্ষার হাতেখড়ি নিয়েছে, তার হিসাবও রাখেননি তিনি। বর্তমানে প্রায় ৩৫ শিশু নিয়মিত তাঁর কাছে পড়তে আসে। পাশাপাশি প্রায় ১০ জন বয়স্ক মানুষও রাতে কোরআন শিক্ষা নেন। নিজের সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও এভাবে একটি প্রজন্মকে ধর্মীয় নৈতিক শিক্ষায় গড়ে তোলার চেষ্টা করে যাচ্ছেন তিনি।

অভাবের সংসারে থেকেও সাত বছর ধরে বিনা বেতনে ৩৫ শিশুকে কোরআন শিক্ষা দেওয়া এবং বয়স্কদেরও শেখানোর এই উদ্যোগ রফিকুল ইসলামের নীরব মানবিকতার অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে। নিজের জীবনের কষ্টের চেয়ে শিশুদের ভবিষ্যৎকেই বড় করে দেখছেন তিনি। তাঁর প্রত্যাশা একটাইএলাকার প্রতিটি শিশু যেন কোরআন নৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠে।

আপনার মতামত লিখুন

বিপ্লবী বার্তা

রোববার, ৩০ আগস্ট ২০২৬


৭ বছর ধরে ৩৫ শিশুর কোরআন শিক্ষার দায়িত্ব রফিকুলের

প্রকাশের তারিখ : ৩০ আগস্ট ২০২৬

featured Image

একদিকে মসজিদের ইমামতি, অন্যদিকে জীবিকার তাগিদে রাজমিস্ত্রির কাজ। এর মাঝেই গত সাত বছর ধরে কোনো বেতন-ভাতা ছাড়াই গ্রামের শিশুদের কোরআন ও ধর্মীয় শিক্ষা দিয়ে যাচ্ছেন মো. রফিকুল ইসলাম। নিজের সংসারেই যেখানে অভাব-অনটন নিত্যসঙ্গী, সেখানে অন্যের সন্তানদের শিক্ষার আলোয় আলোকিত করতে নীরবে একটি মকতব চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। অভাবের সংসারেও থেমে থাকেনি তাঁর এই মানবিক উদ্যোগ। বর্তমানে তাঁর কাছে নিয়মিত প্রায় ৩৫ শিশু এবং ১০ জনের মতো বয়স্ক মানুষ কোরআন শিক্ষা নিতে আসেন।

বাগেরহাটের রামপাল উপজেলার উজড়কুল ইউনিয়নের কদমদী গ্রামের বায়তুন নাজাত জামে মসজিদের ইমাম রফিকুল ইসলাম। তাঁর বাড়ি উপজেলার নং ওয়ার্ডের কদমদী পশ্চিমপাড়ায়, মাদ্রাসা বাসস্ট্যান্ডের পাশে। মসজিদের খেদমতের পাশাপাশি নিজ উদ্যোগে সেখানে একটি মকতব গড়ে তুলেছেন তিনি। কোনো পারিশ্রমিক ছাড়াই দীর্ঘ সাত বছর ধরে শিশু বয়স্কদের ধর্মীয় শিক্ষা দিয়ে আসছেন।

স্থানীয়রা জানান, ফজরের আজানের পরপরই শিশুদের নিয়ে বসেন রফিকুল ইসলাম। ভোর থেকে সকাল ৭টা পর্যন্ত চলে পাঠদান। সময় শিশুদের কোরআন পড়ার পাশাপাশি বিভিন্ন সূরা, দোয়া, আজান গজল শেখানো হয়। শিশুদের উৎসাহ বাড়াতে মাঝে মাঝে বিভিন্ন প্রতিযোগিতারও আয়োজন করেন তিনি। দিনের বেলায় রাজমিস্ত্রির কাজ করার পর রাতেও প্রায় ১০ জনের মতো বয়স্ক মানুষ তাঁর কাছে কোরআন শিক্ষা নিতে আসেন।

রফিকুল ইসলামের সংসারে বৃদ্ধ বাবা-মাসহ সাতজন সদস্য। ছোটবেলায় একটি মেয়েকে হারিয়েছেন তিনি। বর্তমানে ছোট আরেক মেয়েসহ পরিবারের সদস্যদের ভরণপোষণের দায়িত্ব তাঁর কাঁধে। সংসারের খরচ মেটাতে নিয়মিত রাজমিস্ত্রির কাজ করতে হয় তাকে। নির্মাণকাজে যে আয় হয়, তা দিয়েই কোনোভাবে চলে পরিবারের নিত্যদিনের খরচ।
সারাদিন নির্মাণকাজে শ্রম দেওয়ার পর শরীরে ক্লান্তি থাকলেও শিশুদের পড়ানোর দায়িত্বে কখনো পিছপা হন না রফিকুল। কাজের জায়গা দূরে হলেও মকতব মসজিদের দায়িত্বের সঙ্গে সময় মিলিয়ে চলার চেষ্টা করেন তিনি। এলাকায় কাজ থাকলে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের ইমামতি নিজেই করেন। আর দূরে কোথাও কাজ করতে গেলে আগে থেকেই একজন বিকল্প ব্যক্তিকে মসজিদে নামাজ পড়ানোর দায়িত্ব দিয়ে যান। কাজ শেষে ফিরে এসে আবার শিশুদের পড়ানো মসজিদের অন্যান্য দায়িত্ব পালন করেন।

রফিকুল ইসলাম বলেন, সংসারে অভাব আছে। রাজমিস্ত্রির কাজ করে কোনোভাবে পরিবার চালাই। কিন্তু গ্রামের বাচ্চারা যেন কোরআন ধর্মীয় শিক্ষা থেকে বঞ্চিত না হয়, সেই চিন্তা থেকেই মকতবটি চালিয়ে যাচ্ছি। সাত বছর ধরে কোনো বেতন নিইনি। আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই এই কাজ করছি।
 
তিনি বলেন, ফজরের আজানের পর বাচ্চাদের পড়ানো শুরু করি। সকাল ৭টা পর্যন্ত পড়ানোর পর কাজে চলে যাই। রাতে আবার বয়স্করা কোরআন শিখতে আসেন। সারাদিন কাজ করার পর শরীর ক্লান্ত থাকে, কিন্তু বাচ্চাদের পড়াতে বসলে সেই ক্লান্তি আর মনে থাকে না। তারা ভালোভাবে মানুষ হতে পারলে সেটাই আমার সবচেয়ে বড় পাওয়া।

স্থানীয় বাসিন্দা কাশেম মিয়া বলেন,রফিকুল ভাইয়ের নিজের সংসারেই অনেক কষ্ট। সারাদিন রাজমিস্ত্রির কাজ করে যে টাকা পান, তা দিয়ে সাতজনের সংসার চালানো কঠিন। তারপরও তিনি এলাকার বাচ্চাদের পড়ান। বিনিময়ে কোনো টাকা নেন না। তাঁর মতো মানুষ সমাজে খুব কম দেখা যায়।

আরেক বাসিন্দা মোঃ ইসরাফিল আকন  বলেন, অনেক সময় তাঁকে কাজ থেকে ক্লান্ত হয়ে ফিরতে দেখি। এরপরও বিশ্রাম না নিয়ে বাচ্চাদের নিয়ে বসেন। তাঁর কারণে এলাকার অনেক শিশু কোরআন প্রাথমিক ধর্মীয় শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। শুধু শিশুরাই নয়, বয়স্করাও তাঁর কাছে কোরআন শিখছেন।

স্থানীয় বাসিন্দা শৈশব শেখ বলেন,রফিকুল ইসলাম শুধু মসজিদের ইমাম নন, তিনি আমাদের এলাকার শিশুদের জন্য একজন শিক্ষকের মতো। নিজের অভাবের কথা না ভেবে সাত বছর ধরে বিনা বেতনে শিশুদের পড়াচ্ছেন। সমাজের বিত্তবান মানুষ সংশ্লিষ্টরা তাঁর পাশে দাঁড়ালে মকতবটি আরও সুন্দরভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হবে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, নিজের জীবনের অভাব-অনটনকে পাশ কাটিয়ে শিশুদের ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন দেখছেন রফিকুল ইসলাম। সংসারের খরচ জোগাতে প্রতিদিন কঠোর পরিশ্রম করেও অন্যের সন্তানদের শিক্ষার দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন তিনি। কোনো পারিশ্রমিক কিংবা আর্থিক লাভের প্রত্যাশা ছাড়াই বছরের পর বছর ধরে চালিয়ে যাচ্ছেন এই উদ্যোগ।

সাত বছরে তাঁর মকতব থেকে কত শিশু কোরআন ধর্মীয় শিক্ষার হাতেখড়ি নিয়েছে, তার হিসাবও রাখেননি তিনি। বর্তমানে প্রায় ৩৫ শিশু নিয়মিত তাঁর কাছে পড়তে আসে। পাশাপাশি প্রায় ১০ জন বয়স্ক মানুষও রাতে কোরআন শিক্ষা নেন। নিজের সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও এভাবে একটি প্রজন্মকে ধর্মীয় নৈতিক শিক্ষায় গড়ে তোলার চেষ্টা করে যাচ্ছেন তিনি।

অভাবের সংসারে থেকেও সাত বছর ধরে বিনা বেতনে ৩৫ শিশুকে কোরআন শিক্ষা দেওয়া এবং বয়স্কদেরও শেখানোর এই উদ্যোগ রফিকুল ইসলামের নীরব মানবিকতার অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে। নিজের জীবনের কষ্টের চেয়ে শিশুদের ভবিষ্যৎকেই বড় করে দেখছেন তিনি। তাঁর প্রত্যাশা একটাইএলাকার প্রতিটি শিশু যেন কোরআন নৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠে।


বিপ্লবী বার্তা

প্রকাশক
শেখ মাহমুদ উজ্জ্বল
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক
কাইয়ুম তালুকদার (কানন)
উপদেষ্টা সম্পাদক
ড. জাহিদ আহমেদ চৌধুরী

কপিরাইট © ২০২৬ । বিপ্লবী বার্তা