বিপ্লবী বার্তা

মূল পাতা

এক্সক্লুসিভ

জীবনের শেষ প্রান্তেও থামেনি সংগ্রাম, মাছ কাটার আয়েই চলে ৭০ বছরের বৃদ্ধের সংসার।

জীবনের শেষ প্রান্তেও থামেনি সংগ্রাম, মাছ কাটার আয়েই চলে ৭০ বছরের বৃদ্ধের সংসার।
ছবিঃ বিপ্লবী বার্তা

বয়সের ভারে মাছের ব্যবসা ছেড়েছেন অনেক আগেই। তবে সংসারের দায়িত্ব তাকে থামতে দেয়নি। তাই ৭০ বছর বয়সেও জীবিকার তাগিদে বাজারে বসে মাছ কাটেন বাগেরহাটের কচুয়া উপজেলার আব্দুল জব্বার ব্যাপারী। সপ্তাহে চার দিন কচুয়া হাট খানজাহান আলী মাজারসংলগ্ন দরগারহাট বাজারে মাছ কাটেন তিনি। মাছ কাটার বিনিময়ে পাওয়া সামান্য আয় দিয়েই চলে তার আট সদস্যের সংসার। বয়সের ভারে শরীর নুয়ে এলেও পরিবারের মুখে দুবেলা খাবার তুলে দিতে প্রতিদিনই হাতে তুলে নেন মাছ কাটার ছুরি। শুধু সংসারের খরচই নয়, সন্তানদের পড়াশোনার ব্যয়ও বহন করতে হয় তাকে। জীবনের এই প্রান্তে এসে বিশ্রামের সময় হলেও, পরিবারের দায়িত্বের কাছে হার মেনে এখনও তাকে ছুটতে হয় বাজারে।
 
প্রায় ১০ বছর ধরে মাছ কাটার কাজ করছেন আব্দুল জব্বার ব্যাপারী। প্রতি সপ্তাহের সোমবার বৃহস্পতিবার কচুয়া হাটে এবং মঙ্গলবার শুক্রবার দরগারহাট বাজারে বসেন তিনি। সকাল থেকে বাজারের এক পাশে বসে ক্রেতাদের মাছ কাটতে কাটতে কখনো কখনো সন্ধ্যা হয়ে যায়। দিন শেষে যে সামান্য টাকা আয় হয়, তা দিয়েই কোনো রকমে চলে সংসারের খরচ।
 
একসময় কচুয়া দরগারহাট বাজারে মাছের ব্যবসা করতেন জব্বার ব্যাপারী। তখন শরীরে শক্তি ছিল, ব্যবসা করে ভালোই আয় করতেন। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কমে আসে শারীরিক সক্ষমতা। ভারী ঝুড়ি নিয়ে বাজারে ঘোরাঘুরি মাছের ব্যবসার পরিশ্রম আর করতে পারছিলেন না। কিন্তু সংসারের দায়িত্ব তো আর কমেনি। বাধ্য হয়েই প্রায় এক দশক আগে মাছ কাটার কাজকে পেশা হিসেবে বেছে নেন তিনি।
 
বর্তমানে কচুয়া হাট দরগারহাট বাজারে বসে বিভিন্ন ধরনের মাছ কেটে দেন জব্বার ব্যাপারী। বড় মাছ কিংবা ছোট মাছপ্রতিটি মাছ কাটার বিনিময়ে পাওয়া সামান্য পারিশ্রমিকই তার পরিবারের আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস। চাল-ডাল, বাজার-সদাই, নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচের পাশাপাশি সন্তানদের পড়াশোনার ব্যয়ও মেটাতে হয় এই আয় থেকে।
 
আব্দুল জব্বার ব্যাপারী বলেন,আমার বয়স এখন ৭০ বছর। আগে মাছের ব্যবসা করতাম। তখন শরীরে শক্তি ছিল, অনেক পরিশ্রম করতে পারতাম। এখন বয়স হয়েছে, আগের মতো ভারী কাজ করতে পারি না। তাই মাছ কাটার কাজ করছি।
 
তিনি বলেন,সপ্তাহে চার দিন কচুয়া হাট আর দরগারহাটে বসি। সকাল থেকে মাছ কাটতে হয়। দিন শেষে যত টাকা পাই, তা দিয়েই সংসার চালাই। আমার সংসারে আটজন মানুষ। ছেলে-মেয়েদের পড়াশোনার খরচও আছে। আয় কম হলেও কাজ না করলে সংসারে চুলা জ্বলবে না।
 
 তিনি আরও বলেন, বয়স হয়ে গেছে, শরীরেও নানা কষ্ট আছে। তারপরও বসে থাকার সুযোগ নেই। যতদিন শরীরে শক্তি আছে, ততদিন কাজ করে যেতে চাই। আমার একটাই চাওয়াছেলে-মেয়েরা যেন লেখাপড়া করে ভালোভাবে দাঁড়াতে পারে।
 
কচুয়া হাটের এক মাছ ব্যবসায়ী মাসুদ শেখ বলেন, জব্বার ব্যাপারী দীর্ঘদিন ধরে এই হাটে মাছ কাটেন। বয়স ৭০ বছর হলেও নিয়মিত বাজারে আসেন। শরীরে কষ্ট থাকলেও সংসারের জন্য তাকে কাজ করতে হয়।
 
দরগারহাট বাজারের এক ক্রেতা মোমিন শেখ বলেন, অনেক বছর ধরে তাকে মাছ কাটতে দেখছি। বয়স হয়েছে, কিন্তু এখনো কাজ করে যাচ্ছেন। মাছ কাটার বিনিময়ে সামান্য টাকা পান। সেই টাকা দিয়েই পরিবারের খরচ চালান।
 
স্থানীয় এক বাসিন্দা বসু চক্রবর্তী বলেন,জব্বার ব্যাপারীর মতো অনেক বয়স্ক মানুষ এখনো অভাবের কারণে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন। বয়সের কারণে তাদের বিশ্রাম নেওয়ার কথা থাকলেও সংসারের দায়িত্বে তাদের কাজ করতে হচ্ছে। সমাজের বিত্তবান মানুষ জনপ্রতিনিধিরা ধরনের অসহায় শ্রমজীবী মানুষের পাশে দাঁড়ালে তাদের কষ্ট কিছুটা কমবে।
 
৭০ বছর বয়সেও আব্দুল জব্বার ব্যাপারীর জীবনের চিত্র যেন এক কঠিন বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। বয়স তাকে থামিয়ে দিতে চাইলেও সংসারের দায়িত্ব তাকে প্রতিদিন বাজারে টেনে আনে। মাছ কাটার বিনিময়ে পাওয়া সামান্য আয়ে আট সদস্যের সংসার চালানোর পাশাপাশি সন্তানদের ভবিষ্যতের স্বপ্নও বয়ে চলেছেন তিনি। তার কাছে কাজ শুধু জীবিকার মাধ্যম নয়এটাই পরিবারের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার শেষ অবলম্বন।

আপনার মতামত লিখুন

বিপ্লবী বার্তা

রোববার, ৩০ আগস্ট ২০২৬


জীবনের শেষ প্রান্তেও থামেনি সংগ্রাম, মাছ কাটার আয়েই চলে ৭০ বছরের বৃদ্ধের সংসার।

প্রকাশের তারিখ : ৩০ আগস্ট ২০২৬

featured Image

বয়সের ভারে মাছের ব্যবসা ছেড়েছেন অনেক আগেই। তবে সংসারের দায়িত্ব তাকে থামতে দেয়নি। তাই ৭০ বছর বয়সেও জীবিকার তাগিদে বাজারে বসে মাছ কাটেন বাগেরহাটের কচুয়া উপজেলার আব্দুল জব্বার ব্যাপারী। সপ্তাহে চার দিন কচুয়া হাট খানজাহান আলী মাজারসংলগ্ন দরগারহাট বাজারে মাছ কাটেন তিনি। মাছ কাটার বিনিময়ে পাওয়া সামান্য আয় দিয়েই চলে তার আট সদস্যের সংসার। বয়সের ভারে শরীর নুয়ে এলেও পরিবারের মুখে দুবেলা খাবার তুলে দিতে প্রতিদিনই হাতে তুলে নেন মাছ কাটার ছুরি। শুধু সংসারের খরচই নয়, সন্তানদের পড়াশোনার ব্যয়ও বহন করতে হয় তাকে। জীবনের এই প্রান্তে এসে বিশ্রামের সময় হলেও, পরিবারের দায়িত্বের কাছে হার মেনে এখনও তাকে ছুটতে হয় বাজারে।
 
প্রায় ১০ বছর ধরে মাছ কাটার কাজ করছেন আব্দুল জব্বার ব্যাপারী। প্রতি সপ্তাহের সোমবার বৃহস্পতিবার কচুয়া হাটে এবং মঙ্গলবার শুক্রবার দরগারহাট বাজারে বসেন তিনি। সকাল থেকে বাজারের এক পাশে বসে ক্রেতাদের মাছ কাটতে কাটতে কখনো কখনো সন্ধ্যা হয়ে যায়। দিন শেষে যে সামান্য টাকা আয় হয়, তা দিয়েই কোনো রকমে চলে সংসারের খরচ।
 
একসময় কচুয়া দরগারহাট বাজারে মাছের ব্যবসা করতেন জব্বার ব্যাপারী। তখন শরীরে শক্তি ছিল, ব্যবসা করে ভালোই আয় করতেন। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কমে আসে শারীরিক সক্ষমতা। ভারী ঝুড়ি নিয়ে বাজারে ঘোরাঘুরি মাছের ব্যবসার পরিশ্রম আর করতে পারছিলেন না। কিন্তু সংসারের দায়িত্ব তো আর কমেনি। বাধ্য হয়েই প্রায় এক দশক আগে মাছ কাটার কাজকে পেশা হিসেবে বেছে নেন তিনি।
 
বর্তমানে কচুয়া হাট দরগারহাট বাজারে বসে বিভিন্ন ধরনের মাছ কেটে দেন জব্বার ব্যাপারী। বড় মাছ কিংবা ছোট মাছপ্রতিটি মাছ কাটার বিনিময়ে পাওয়া সামান্য পারিশ্রমিকই তার পরিবারের আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস। চাল-ডাল, বাজার-সদাই, নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচের পাশাপাশি সন্তানদের পড়াশোনার ব্যয়ও মেটাতে হয় এই আয় থেকে।
 
আব্দুল জব্বার ব্যাপারী বলেন,আমার বয়স এখন ৭০ বছর। আগে মাছের ব্যবসা করতাম। তখন শরীরে শক্তি ছিল, অনেক পরিশ্রম করতে পারতাম। এখন বয়স হয়েছে, আগের মতো ভারী কাজ করতে পারি না। তাই মাছ কাটার কাজ করছি।
 
তিনি বলেন,সপ্তাহে চার দিন কচুয়া হাট আর দরগারহাটে বসি। সকাল থেকে মাছ কাটতে হয়। দিন শেষে যত টাকা পাই, তা দিয়েই সংসার চালাই। আমার সংসারে আটজন মানুষ। ছেলে-মেয়েদের পড়াশোনার খরচও আছে। আয় কম হলেও কাজ না করলে সংসারে চুলা জ্বলবে না।
 
 তিনি আরও বলেন, বয়স হয়ে গেছে, শরীরেও নানা কষ্ট আছে। তারপরও বসে থাকার সুযোগ নেই। যতদিন শরীরে শক্তি আছে, ততদিন কাজ করে যেতে চাই। আমার একটাই চাওয়াছেলে-মেয়েরা যেন লেখাপড়া করে ভালোভাবে দাঁড়াতে পারে।
 
কচুয়া হাটের এক মাছ ব্যবসায়ী মাসুদ শেখ বলেন, জব্বার ব্যাপারী দীর্ঘদিন ধরে এই হাটে মাছ কাটেন। বয়স ৭০ বছর হলেও নিয়মিত বাজারে আসেন। শরীরে কষ্ট থাকলেও সংসারের জন্য তাকে কাজ করতে হয়।
 
দরগারহাট বাজারের এক ক্রেতা মোমিন শেখ বলেন, অনেক বছর ধরে তাকে মাছ কাটতে দেখছি। বয়স হয়েছে, কিন্তু এখনো কাজ করে যাচ্ছেন। মাছ কাটার বিনিময়ে সামান্য টাকা পান। সেই টাকা দিয়েই পরিবারের খরচ চালান।
 
স্থানীয় এক বাসিন্দা বসু চক্রবর্তী বলেন,জব্বার ব্যাপারীর মতো অনেক বয়স্ক মানুষ এখনো অভাবের কারণে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন। বয়সের কারণে তাদের বিশ্রাম নেওয়ার কথা থাকলেও সংসারের দায়িত্বে তাদের কাজ করতে হচ্ছে। সমাজের বিত্তবান মানুষ জনপ্রতিনিধিরা ধরনের অসহায় শ্রমজীবী মানুষের পাশে দাঁড়ালে তাদের কষ্ট কিছুটা কমবে।
 
৭০ বছর বয়সেও আব্দুল জব্বার ব্যাপারীর জীবনের চিত্র যেন এক কঠিন বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। বয়স তাকে থামিয়ে দিতে চাইলেও সংসারের দায়িত্ব তাকে প্রতিদিন বাজারে টেনে আনে। মাছ কাটার বিনিময়ে পাওয়া সামান্য আয়ে আট সদস্যের সংসার চালানোর পাশাপাশি সন্তানদের ভবিষ্যতের স্বপ্নও বয়ে চলেছেন তিনি। তার কাছে কাজ শুধু জীবিকার মাধ্যম নয়এটাই পরিবারের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার শেষ অবলম্বন।


বিপ্লবী বার্তা

প্রকাশক
শেখ মাহমুদ উজ্জ্বল
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক
কাইয়ুম তালুকদার (কানন)
উপদেষ্টা সম্পাদক
ড. জাহিদ আহমেদ চৌধুরী

কপিরাইট © ২০২৬ । বিপ্লবী বার্তা