বিকেলের তপ্ত রোদের তীব্রতা কমতেই একসময় গ্রামের বিস্তীর্ণ মাঠগুলো মুখরিত হয়ে উঠত একদল কিশোর-তরুণের কলকাকলিতে। কারও হাতে সুতোর লাটাই, কারও চোখ আকাশের পানে। নীল আকাশে তখন উড়ছে লাল, নীল, হলুদ, সবুজ কাগজের ঘুড়ি। চিল ঘুড়ি, পতেঙ্গা ঘুড়ি, নেপালি ঘুড়ি কিংবা বড়সড় কোনো বোয়াল ঘুড়ির ডানা মেলার সে এক অপরূপ দৃশ্য। কিন্তু কালের বিবর্তনে আর আধুনিক প্রযুক্তির আগ্রাসনে আকাশ ছোঁয়া সেই আনন্দের দিনগুলো আজ যেন রূপকথার গল্প। দিনে দিনে হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের ঐতিহ্যবাহী ঘুড়ি ওড়ানোর উৎসব।
ঘুড়ি ওড়ানো কেবল একটি খেলা নয়, এটি ছিল এক বিশাল আনন্দোৎসব। শৈশবের সেই দিনগুলোতে বন্ধুবান্ধব, সহপাঠী ও সমবয়সীরা মিলেমিশে নানা রঙের কাগজ, বাঁশের কাঠি, সুতা, আঠা দিয়ে ঘুড়ি তৈরিতে মেতে উঠত। চৈত্র-বৈশাখের শুরুতে যখন মাঠ থেকে কৃষকরা ধান ঘরে তুলে নেয়, তখন মাইলের পর মাইল মাঠ ফাঁকা পড়ে থাকে। এই উন্মুক্ত মাঠগুলোই হয়ে ওঠে ঘুড়ি ওড়ানোর প্রধান মঞ্চ। আকাশে যখন একটি ঘুড়ির সুতো দিয়ে অন্য ঘুড়ির সুতো কেটে দেওয়া হতো, তখন চারদিক থেকে ভেসে আসত আনন্দের চিৎকার। কাটা ঘুড়িটির পেছনে একদল কিশোরের দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে ছুটে চলার মাঝে যে আনন্দ ছিল, তা আজকের ভিডিও, মোবাইল গেমে খুঁজে পাওয়া অসম্ভব।
শৈশবের স্মৃতি স্মরণ করে বেগমগঞ্জের আমানউল্লাহপুর ইউনিয়নের প্রবীণ বাসিন্দা নজরুল ইসলাম বলেন, এখনকার দিনের পোলাপানদের খুব একটা ঘুড়ি উড়াতে দেখি না। আমাদের শৈশবে বন্ধুবান্ধব, সহপাঠী, সমবয়সী ছেলে-মেয়ে মিলেমিশে কত রং-বেরঙের ঘুড়ি বানাতাম। বৈশাখের শুরুতে যখন মাঠ থেকে কৃষকরা ধান বাড়ি তুলে নিতো। তখন থেকে শুরু হতো ঘুড়ি উড়ানো প্রতিযোগিতা কার ঘুড়ি কত উপরে উঠেছে। আবার কয়েকজনের মিলে ঘুড়ি কাটাকাটি খেলতাম। এ খেলায় একজনের ঘুড়ির সুতা আরেকজন কেটে দিতে পারলে সে জয়ী হতো। কিন্তু এখনকার ছেলে-মেয়েদের এ খেলার প্রতি কোন আগ্রহ দেখি না।
একই ইউনিয়নের আরেক প্রবীণ বাসিন্দা বাবুল হোসেন ঘুড়ি উড়ানোতে বর্তমান প্রজন্মের আগ্রহ কমে যাওয়ার কারণ উল্লেখ করে বলেন, বর্তমান প্রযুক্তির যুগে শিশু, কিশোর, উঠতি বয়সী ছেলেপেলেরা মোবাইলে আসক্ত হয়ে পড়েছে। আগে আমরা অবসর সময় পেলে খেলাধুলা করতাম, মাঠে দৌড়াদৌড়ি করতাম, পরিবারে সময় দিতাম, আত্মীয় স্বজনদের বাড়িতে ঘুরতে যেতাম। আর এখন ছেলে মেয়ে সুযোগ পেলে মিডিয়াতে তাদের মূল্যবান সময় নষ্ট করে। এমন অনেকেই আমি দেখেছি বন্ধুরা মিলে আড্ডা দিচ্ছে সে সময়ও পাশে থেকে অন্য বন্ধু মোবাইল চালাচ্ছে। এ অভ্যাস গুলো থেকে বর্তমান প্রজন্ম কে সচেতন করা প্রয়োজন।
হারিয়ে যাওয়া এই ঐতিহ্যকে শুধু স্মৃতির পাতায় বন্দি রাখলে চলবে না। বর্তমান প্রজন্মকে এই আসক্তি থেকে রক্ষা করতে এবং আমাদের লোকজ সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখতে ঘুড়ি ওড়ানোর মতো উৎসবগুলোকে ফিরিয়ে আনতে হবে। বাবা-মা ও সমাজকে উদ্যোগী হয়ে শিশুদের খেলার মাঠমুখী করতে হবে। আকাশে আবার ঘুড়ি উড়ুক, ডানা মেলুক আমাদের হারিয়ে যাওয়া শৈশব।

শনিবার, ২৭ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৭ জুন ২০২৬
বিকেলের তপ্ত রোদের তীব্রতা কমতেই একসময় গ্রামের বিস্তীর্ণ মাঠগুলো মুখরিত হয়ে উঠত একদল কিশোর-তরুণের কলকাকলিতে। কারও হাতে সুতোর লাটাই, কারও চোখ আকাশের পানে। নীল আকাশে তখন উড়ছে লাল, নীল, হলুদ, সবুজ কাগজের ঘুড়ি। চিল ঘুড়ি, পতেঙ্গা ঘুড়ি, নেপালি ঘুড়ি কিংবা বড়সড় কোনো বোয়াল ঘুড়ির ডানা মেলার সে এক অপরূপ দৃশ্য। কিন্তু কালের বিবর্তনে আর আধুনিক প্রযুক্তির আগ্রাসনে আকাশ ছোঁয়া সেই আনন্দের দিনগুলো আজ যেন রূপকথার গল্প। দিনে দিনে হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের ঐতিহ্যবাহী ঘুড়ি ওড়ানোর উৎসব।
ঘুড়ি ওড়ানো কেবল একটি খেলা নয়, এটি ছিল এক বিশাল আনন্দোৎসব। শৈশবের সেই দিনগুলোতে বন্ধুবান্ধব, সহপাঠী ও সমবয়সীরা মিলেমিশে নানা রঙের কাগজ, বাঁশের কাঠি, সুতা, আঠা দিয়ে ঘুড়ি তৈরিতে মেতে উঠত। চৈত্র-বৈশাখের শুরুতে যখন মাঠ থেকে কৃষকরা ধান ঘরে তুলে নেয়, তখন মাইলের পর মাইল মাঠ ফাঁকা পড়ে থাকে। এই উন্মুক্ত মাঠগুলোই হয়ে ওঠে ঘুড়ি ওড়ানোর প্রধান মঞ্চ। আকাশে যখন একটি ঘুড়ির সুতো দিয়ে অন্য ঘুড়ির সুতো কেটে দেওয়া হতো, তখন চারদিক থেকে ভেসে আসত আনন্দের চিৎকার। কাটা ঘুড়িটির পেছনে একদল কিশোরের দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে ছুটে চলার মাঝে যে আনন্দ ছিল, তা আজকের ভিডিও, মোবাইল গেমে খুঁজে পাওয়া অসম্ভব।
শৈশবের স্মৃতি স্মরণ করে বেগমগঞ্জের আমানউল্লাহপুর ইউনিয়নের প্রবীণ বাসিন্দা নজরুল ইসলাম বলেন, এখনকার দিনের পোলাপানদের খুব একটা ঘুড়ি উড়াতে দেখি না। আমাদের শৈশবে বন্ধুবান্ধব, সহপাঠী, সমবয়সী ছেলে-মেয়ে মিলেমিশে কত রং-বেরঙের ঘুড়ি বানাতাম। বৈশাখের শুরুতে যখন মাঠ থেকে কৃষকরা ধান বাড়ি তুলে নিতো। তখন থেকে শুরু হতো ঘুড়ি উড়ানো প্রতিযোগিতা কার ঘুড়ি কত উপরে উঠেছে। আবার কয়েকজনের মিলে ঘুড়ি কাটাকাটি খেলতাম। এ খেলায় একজনের ঘুড়ির সুতা আরেকজন কেটে দিতে পারলে সে জয়ী হতো। কিন্তু এখনকার ছেলে-মেয়েদের এ খেলার প্রতি কোন আগ্রহ দেখি না।
একই ইউনিয়নের আরেক প্রবীণ বাসিন্দা বাবুল হোসেন ঘুড়ি উড়ানোতে বর্তমান প্রজন্মের আগ্রহ কমে যাওয়ার কারণ উল্লেখ করে বলেন, বর্তমান প্রযুক্তির যুগে শিশু, কিশোর, উঠতি বয়সী ছেলেপেলেরা মোবাইলে আসক্ত হয়ে পড়েছে। আগে আমরা অবসর সময় পেলে খেলাধুলা করতাম, মাঠে দৌড়াদৌড়ি করতাম, পরিবারে সময় দিতাম, আত্মীয় স্বজনদের বাড়িতে ঘুরতে যেতাম। আর এখন ছেলে মেয়ে সুযোগ পেলে মিডিয়াতে তাদের মূল্যবান সময় নষ্ট করে। এমন অনেকেই আমি দেখেছি বন্ধুরা মিলে আড্ডা দিচ্ছে সে সময়ও পাশে থেকে অন্য বন্ধু মোবাইল চালাচ্ছে। এ অভ্যাস গুলো থেকে বর্তমান প্রজন্ম কে সচেতন করা প্রয়োজন।
হারিয়ে যাওয়া এই ঐতিহ্যকে শুধু স্মৃতির পাতায় বন্দি রাখলে চলবে না। বর্তমান প্রজন্মকে এই আসক্তি থেকে রক্ষা করতে এবং আমাদের লোকজ সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখতে ঘুড়ি ওড়ানোর মতো উৎসবগুলোকে ফিরিয়ে আনতে হবে। বাবা-মা ও সমাজকে উদ্যোগী হয়ে শিশুদের খেলার মাঠমুখী করতে হবে। আকাশে আবার ঘুড়ি উড়ুক, ডানা মেলুক আমাদের হারিয়ে যাওয়া শৈশব।

আপনার মতামত লিখুন