বিপ্লবী বার্তা

মূল পাতা

জাতীয়

দেশে ৪ মাসে ধর্ষণের শিকার ১১৮ শিশু

দেশে ৪ মাসে ধর্ষণের শিকার ১১৮ শিশু
শিশু নির্যাতন। প্রতীকী ছবি

দেশে দিনের পর দিন বেড়েই চলেছে শিশু ধর্ষণ ও ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা। এই একের পর এক নৃশংস ঘটনায় শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে অভিভাবক ও সাধারণ মানুষের মধ্যে তৈরি হয়েছে গভীর উদ্বেগ। মানবাধিকার ও বেসরকারি সংস্থাগুলোর তথ্য বলছে, চলতি বছরের প্রথম সাড়ে চার মাসেই সারা দেশে অন্তত ১১৮ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। 

একই সময়ে ধর্ষণের চেষ্টার শিকার হয়েছে আরও ৪৬ শিশু। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, ধর্ষণের পর অন্তত ১৭ শিশুকে হত্যা করা হয়েছে। শুধু গত দুই সপ্তাহেই এমন চারটি মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা ও যৌন নির্যাতন বাড়ার পেছনে সামাজিক অবক্ষয়, নৈতিক সংকট এবং জবাবদিহির অভাব বড় কারণ হিসেবে কাজ করছে। তাদের মতে, কেবল আইন প্রয়োগ নয়, রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলাও জরুরি। শিশু সুরক্ষায় আলাদা কমিশন গঠন এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর সামাজিক অবস্থান নেওয়ারও দাবি উঠেছে।

সংবিধানের ২৮ ও ৩২ অনুচ্ছেদে শিশুদের জীবন, মর্যাদা ও নিরাপত্তার অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। জাতীয় শিশু নীতিতেও শিশুদের নিরাপদ ও বৈষম্যহীন পরিবেশে বেড়ে ওঠার অঙ্গীকার রয়েছে। পাশাপাশি জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদে স্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে আন্তর্জাতিকভাবেও দায়বদ্ধ বাংলাদেশ। তবে বাস্তব পরিস্থিতি সেই অঙ্গীকারের সঙ্গে মিলছে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ২০ মে পর্যন্ত শিশু নির্যাতনের চিত্র ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। প্রতিটি ঘটনা শুধু একটি শিশুর জীবনের করুণ সমাপ্তিই নয়, বরং পুরো সমাজের নিরাপত্তাহীনতা ও মানবিক সংকটের প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠছে।
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোরোগবিদ্যা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. এস এম আতিকুর রহমান বলেন, “অন্যান্য দেশে এ ধরনের অপরাধপ্রবণ মানুষকে সামাজিকভাবে চিহ্নিত করা হয়। কিন্তু আমাদের সমাজে সেই সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি। ফলে শিশুরা অনিরাপদ পরিবেশে বেড়ে উঠছে।”

তিনি আরও বলেন, “সমাজে মৃত্যুকে খুব স্বাভাবিকভাবে নেওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়েছে। এই উদাসীন মানসিকতার কারণে অপরাধীদের মধ্যে ভয় বা অনুশোচনাবোধ কমে যাচ্ছে।”

এদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক খন্দকার ফারজানা রহমান শিশু সুরক্ষায় পৃথক ‘চাইল্ড প্রোটেকশন কমিশন’ গঠনের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেছেন। তার মতে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে শিশু সুরক্ষার কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে বিশেষায়িত কাঠামো জরুরি।

তিনি বলেন, “শিশুদের বিরুদ্ধে অপরাধের ক্ষেত্রে জিরো টলারেন্স নীতি থাকতে হবে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে শিশু সুরক্ষার বিষয়টি কখনোই রাজনৈতিক অগ্রাধিকারে আসেনি।”

জাতীয় নির্বাচনের আগে ইউনিসেফের শিশু অধিকার ইশতেহারে দেশের ১২টি রাজনৈতিক দল স্বাক্ষর করলেও বাস্তবে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে শিশু সুরক্ষার প্রতিফলন কতটা আছে, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়; এটি সমাজের সামগ্রিক নৈতিকতা ও মানবিকতার পরীক্ষাও। কার্যকর আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা, রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা এবং পরিবারভিত্তিক মূল্যবোধ গড়ে তুলতে না পারলে এ ধরনের অপরাধ কমানো কঠিন হবে।

শিশু ধর্ষণ শিশু হত্যা শিশু নিরাপত্তা সহিংসতা

আপনার মতামত লিখুন

বিপ্লবী বার্তা

শনিবার, ২৩ মে ২০২৬


দেশে ৪ মাসে ধর্ষণের শিকার ১১৮ শিশু

প্রকাশের তারিখ : ২৩ মে ২০২৬

featured Image

দেশে দিনের পর দিন বেড়েই চলেছে শিশু ধর্ষণ ও ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা। এই একের পর এক নৃশংস ঘটনায় শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে অভিভাবক ও সাধারণ মানুষের মধ্যে তৈরি হয়েছে গভীর উদ্বেগ। মানবাধিকার ও বেসরকারি সংস্থাগুলোর তথ্য বলছে, চলতি বছরের প্রথম সাড়ে চার মাসেই সারা দেশে অন্তত ১১৮ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। 

একই সময়ে ধর্ষণের চেষ্টার শিকার হয়েছে আরও ৪৬ শিশু। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, ধর্ষণের পর অন্তত ১৭ শিশুকে হত্যা করা হয়েছে। শুধু গত দুই সপ্তাহেই এমন চারটি মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা ও যৌন নির্যাতন বাড়ার পেছনে সামাজিক অবক্ষয়, নৈতিক সংকট এবং জবাবদিহির অভাব বড় কারণ হিসেবে কাজ করছে। তাদের মতে, কেবল আইন প্রয়োগ নয়, রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলাও জরুরি। শিশু সুরক্ষায় আলাদা কমিশন গঠন এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর সামাজিক অবস্থান নেওয়ারও দাবি উঠেছে।

সংবিধানের ২৮ ও ৩২ অনুচ্ছেদে শিশুদের জীবন, মর্যাদা ও নিরাপত্তার অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। জাতীয় শিশু নীতিতেও শিশুদের নিরাপদ ও বৈষম্যহীন পরিবেশে বেড়ে ওঠার অঙ্গীকার রয়েছে। পাশাপাশি জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদে স্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে আন্তর্জাতিকভাবেও দায়বদ্ধ বাংলাদেশ। তবে বাস্তব পরিস্থিতি সেই অঙ্গীকারের সঙ্গে মিলছে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ২০ মে পর্যন্ত শিশু নির্যাতনের চিত্র ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। প্রতিটি ঘটনা শুধু একটি শিশুর জীবনের করুণ সমাপ্তিই নয়, বরং পুরো সমাজের নিরাপত্তাহীনতা ও মানবিক সংকটের প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠছে।
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোরোগবিদ্যা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. এস এম আতিকুর রহমান বলেন, “অন্যান্য দেশে এ ধরনের অপরাধপ্রবণ মানুষকে সামাজিকভাবে চিহ্নিত করা হয়। কিন্তু আমাদের সমাজে সেই সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি। ফলে শিশুরা অনিরাপদ পরিবেশে বেড়ে উঠছে।”

তিনি আরও বলেন, “সমাজে মৃত্যুকে খুব স্বাভাবিকভাবে নেওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়েছে। এই উদাসীন মানসিকতার কারণে অপরাধীদের মধ্যে ভয় বা অনুশোচনাবোধ কমে যাচ্ছে।”

এদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক খন্দকার ফারজানা রহমান শিশু সুরক্ষায় পৃথক ‘চাইল্ড প্রোটেকশন কমিশন’ গঠনের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেছেন। তার মতে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে শিশু সুরক্ষার কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে বিশেষায়িত কাঠামো জরুরি।

তিনি বলেন, “শিশুদের বিরুদ্ধে অপরাধের ক্ষেত্রে জিরো টলারেন্স নীতি থাকতে হবে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে শিশু সুরক্ষার বিষয়টি কখনোই রাজনৈতিক অগ্রাধিকারে আসেনি।”

জাতীয় নির্বাচনের আগে ইউনিসেফের শিশু অধিকার ইশতেহারে দেশের ১২টি রাজনৈতিক দল স্বাক্ষর করলেও বাস্তবে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে শিশু সুরক্ষার প্রতিফলন কতটা আছে, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়; এটি সমাজের সামগ্রিক নৈতিকতা ও মানবিকতার পরীক্ষাও। কার্যকর আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা, রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা এবং পরিবারভিত্তিক মূল্যবোধ গড়ে তুলতে না পারলে এ ধরনের অপরাধ কমানো কঠিন হবে।


বিপ্লবী বার্তা

প্রকাশক
শেখ মাহমুদ উজ্জ্বল
সম্পাদক
ড. জাহিদ আহমেদ চৌধুরী
নির্বাহী সম্পাদক
কাইয়ুম তালুকদার (কানন)

কপিরাইট © ২০২৬ । বিপ্লবী বার্তা