বিপ্লবী বার্তা

মূল পাতা

সারাদেশ

জামালপুরে কোটি টাকার আইসিইউ ১০ বছর ধরে তালাবদ্ধ

জামালপুরে কোটি টাকার আইসিইউ ১০ বছর ধরে তালাবদ্ধ
কোটি টাকার আইসিইউ তালাবদ্ধ । ছবি: বিপ্লবী বার্তা

জামালপুর, শেরপুর ও কুড়িগ্রাম জেলার কিছু অংশসহ প্রায় ২৬ লাখ মানুষের স্বাস্থ্যসেবার একমাত্র ভরসাস্থল ‘২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জামালপুর জেনারেল হাসপাতাল’। কিন্তু চরম উদাসীনতা আর দক্ষ জনবলের অভাবে হাসপাতালটিতে গত এক দশকেরও বেশি সময়ে একদিনের জন্যও চালু হয়নি কোটি টাকা মূল্যের ৪ শয্যার আইসিইউ ইউনিটটি। ফলে তালাবদ্ধ ঘরে পড়ে থেকে কোটি টাকার লাইফ সাপোর্ট যন্ত্রপাতিগুলো নষ্ট হয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত ২০২৩ সালে স্বাস্থ্য বিভাগের একটি দল এসে এগুলোকে ‘অকেজো বা বাতিল’ ঘোষণা করে গেছে। সরকারি অর্থের এমন চরম অপচয় আর কর্তৃপক্ষের দায়িত্বহীনতায় ক্ষোভে ফুঁসছেন জেলাবাসী।

লাখো মানুষের দুর্ভোগ কমাতে ও জরুরি স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে ২০১৫ সালের ৩১ জানুয়ারি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত চার শয্যার এই আইসিইউ ইউনিটের উদ্বোধন করেছিলেন তৎকালীন স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম। হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, এর মধ্যে দুটি নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) এবং দুটি উচ্চমাত্রার নির্ভরশীল (এইচডিইউ) শয্যা ছিল। ২০১৫ সালে ঢাকা থেকে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আধুনিক সব যন্ত্রপাতি কেনা হলেও এই পুরো সেবা চালু করতে মোট কত টাকা খরচ হয়েছিল, তার সঠিক হিসাব হাসপাতালের বর্তমান কর্তৃপক্ষের কাছে নেই।

সরেজমিনে হাসপাতালের মূল ভবনের দক্ষিণ পাশের ভবনের তৃতীয় তলায় গিয়ে দেখা যায়, আইসিইউ কক্ষটিতে তালা ঝুলছে। কক্ষটি খোলার পর ভেতরে দেখা যায়—এলোমেলো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে কোটি টাকার যন্ত্রপাতি, দীর্ঘদিনের অব্যবহারে ভেতরের লাইটগুলো নষ্ট এবং শয্যাগুলো ধুলোবালিতে একাকার।

কক্ষটি পরিষ্কারের দায়িত্বে থাকা পারুল বেগম আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, আমি প্রতিদিন আসি, তালা খুলে পরিষ্কার করে আবার রেখে দেই। আজ পর্যন্ত কোনো রোগী এখানে আসে নাই।”

জেলায় আইসিইউ সেবা না থাকায় গুরুতর রোগীদের জরুরি ভিত্তিতে ময়মনসিংহ বা ঢাকায় স্থানান্তর করতে হয়। কিন্তু দূরপাল্লার এই পথ পাড়ি দিতে গিয়ে অধিকাংশ সময়ই পথিমধ্যে অ্যাম্বুলেন্সেই প্রাণ হারাচ্ছেন রোগীরা। আর যারা বেসরকারি হাসপাতালে যাচ্ছেন, তাদের গুনতে হচ্ছে লাখ লাখ টাকা।

সদর উপজেলার শরিফপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা মোঃ আলমগীর হোসেন বলেন, “২০২১ সালে আমার বাবার হার্টের সমস্যা হলে চিকিৎসকেরা আইসিইউতে নিতে বলেন। জামালপুরে আইসিইউ না থাকায় ময়মনসিংহে নেওয়ার পথেই বাবা মারা যান। এখানে সেবাটি চালু থাকলে হয়তো আমার বাবা বেঁচে থাকতেন।”

হাসপাতালের দীর্ঘদিনের অ্যাম্বুলেন্সচালক শফিকুল ইসলাম আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, বহু বছর ধরে এই হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্স চালাই। কত মুমূর্ষু রোগীকে ময়মনসিংহ আর ঢাকায় নিয়ে গেছি তার হিসাব নেই। অনেক সময় চোখের সামনেই অ্যাম্বুলেন্সের ভেতর কত মানুষের মৃত্যু দেখেছি, তা ভাষায় বোঝানো যাবে না। আইসিইউ থাকলে হয়তো এত মানুষকে পথেই মরতে হতো না।

ইসলামপুরের পাথর্শী ইউনিয়নের ফাতেমা বেগম জানান, মেয়ের সিজারের পর আইসিইউর প্রয়োজন হলে সরকারি হাসপাতালে সুবিধা না পেয়ে বাধ্য হয়ে বেসরকারি ক্লিনিকে ভর্তি করান। পরে নিজের গহনা বিক্রি করে সেই অতিরিক্ত বিল পরিশোধ করতে হয়েছে তাকে।

জামালপুর জেনারেল হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য জাহাঙ্গীর সেলিম এই সংকটের জন্য স্বাস্থ্য বিভাগের চরম উদাসীনতাকে দায়ী করে বলেন, “যন্ত্রপাতি দেওয়া হলেও দক্ষ জনবল দেওয়া হয়নি। এমন উদাসীনতা আমরা আর দেখতে চাই না।”

এ বিষয়ে হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা: মো: মাহফুজুর রহমান সোহান জানান, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, প্রশিক্ষিত টেকনিশিয়ান ও পর্যাপ্ত জনবলের অভাবে আইসিইউটি চালু করা সম্ভব হয়নি। উল্টো, ২০২৩ সালে ঢাকা থেকে স্বাস্থ্য বিভাগের একটি দল এসে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর এই আইসিইউ ও যন্ত্রপাতিগুলোকে অকেজো বা বাতিল বলে ঘোষণা করে গেছে।

কোটি টাকার যন্ত্রপাতি একদিনের জন্যও ব্যবহার না করে এভাবে ‘বাতিল’ ঘোষণার পেছনে কার দায় এখন সেই প্রশ্নই তুলছেন জেলার ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ।

আইসিইউ তালাবদ্ধ

আপনার মতামত লিখুন

বিপ্লবী বার্তা

শনিবার, ১৬ মে ২০২৬


জামালপুরে কোটি টাকার আইসিইউ ১০ বছর ধরে তালাবদ্ধ

প্রকাশের তারিখ : ১৬ মে ২০২৬

featured Image

জামালপুর, শেরপুর ও কুড়িগ্রাম জেলার কিছু অংশসহ প্রায় ২৬ লাখ মানুষের স্বাস্থ্যসেবার একমাত্র ভরসাস্থল ‘২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জামালপুর জেনারেল হাসপাতাল’। কিন্তু চরম উদাসীনতা আর দক্ষ জনবলের অভাবে হাসপাতালটিতে গত এক দশকেরও বেশি সময়ে একদিনের জন্যও চালু হয়নি কোটি টাকা মূল্যের ৪ শয্যার আইসিইউ ইউনিটটি। ফলে তালাবদ্ধ ঘরে পড়ে থেকে কোটি টাকার লাইফ সাপোর্ট যন্ত্রপাতিগুলো নষ্ট হয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত ২০২৩ সালে স্বাস্থ্য বিভাগের একটি দল এসে এগুলোকে ‘অকেজো বা বাতিল’ ঘোষণা করে গেছে। সরকারি অর্থের এমন চরম অপচয় আর কর্তৃপক্ষের দায়িত্বহীনতায় ক্ষোভে ফুঁসছেন জেলাবাসী।



লাখো মানুষের দুর্ভোগ কমাতে ও জরুরি স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে ২০১৫ সালের ৩১ জানুয়ারি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত চার শয্যার এই আইসিইউ ইউনিটের উদ্বোধন করেছিলেন তৎকালীন স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম। হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, এর মধ্যে দুটি নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) এবং দুটি উচ্চমাত্রার নির্ভরশীল (এইচডিইউ) শয্যা ছিল। ২০১৫ সালে ঢাকা থেকে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আধুনিক সব যন্ত্রপাতি কেনা হলেও এই পুরো সেবা চালু করতে মোট কত টাকা খরচ হয়েছিল, তার সঠিক হিসাব হাসপাতালের বর্তমান কর্তৃপক্ষের কাছে নেই।


সরেজমিনে হাসপাতালের মূল ভবনের দক্ষিণ পাশের ভবনের তৃতীয় তলায় গিয়ে দেখা যায়, আইসিইউ কক্ষটিতে তালা ঝুলছে। কক্ষটি খোলার পর ভেতরে দেখা যায়—এলোমেলো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে কোটি টাকার যন্ত্রপাতি, দীর্ঘদিনের অব্যবহারে ভেতরের লাইটগুলো নষ্ট এবং শয্যাগুলো ধুলোবালিতে একাকার।


কক্ষটি পরিষ্কারের দায়িত্বে থাকা পারুল বেগম আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, আমি প্রতিদিন আসি, তালা খুলে পরিষ্কার করে আবার রেখে দেই। আজ পর্যন্ত কোনো রোগী এখানে আসে নাই।”



জেলায় আইসিইউ সেবা না থাকায় গুরুতর রোগীদের জরুরি ভিত্তিতে ময়মনসিংহ বা ঢাকায় স্থানান্তর করতে হয়। কিন্তু দূরপাল্লার এই পথ পাড়ি দিতে গিয়ে অধিকাংশ সময়ই পথিমধ্যে অ্যাম্বুলেন্সেই প্রাণ হারাচ্ছেন রোগীরা। আর যারা বেসরকারি হাসপাতালে যাচ্ছেন, তাদের গুনতে হচ্ছে লাখ লাখ টাকা।


সদর উপজেলার শরিফপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা মোঃ আলমগীর হোসেন বলেন, “২০২১ সালে আমার বাবার হার্টের সমস্যা হলে চিকিৎসকেরা আইসিইউতে নিতে বলেন। জামালপুরে আইসিইউ না থাকায় ময়মনসিংহে নেওয়ার পথেই বাবা মারা যান। এখানে সেবাটি চালু থাকলে হয়তো আমার বাবা বেঁচে থাকতেন।”


হাসপাতালের দীর্ঘদিনের অ্যাম্বুলেন্সচালক শফিকুল ইসলাম আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, বহু বছর ধরে এই হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্স চালাই। কত মুমূর্ষু রোগীকে ময়মনসিংহ আর ঢাকায় নিয়ে গেছি তার হিসাব নেই। অনেক সময় চোখের সামনেই অ্যাম্বুলেন্সের ভেতর কত মানুষের মৃত্যু দেখেছি, তা ভাষায় বোঝানো যাবে না। আইসিইউ থাকলে হয়তো এত মানুষকে পথেই মরতে হতো না।


ইসলামপুরের পাথর্শী ইউনিয়নের ফাতেমা বেগম জানান, মেয়ের সিজারের পর আইসিইউর প্রয়োজন হলে সরকারি হাসপাতালে সুবিধা না পেয়ে বাধ্য হয়ে বেসরকারি ক্লিনিকে ভর্তি করান। পরে নিজের গহনা বিক্রি করে সেই অতিরিক্ত বিল পরিশোধ করতে হয়েছে তাকে।



জামালপুর জেনারেল হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য জাহাঙ্গীর সেলিম এই সংকটের জন্য স্বাস্থ্য বিভাগের চরম উদাসীনতাকে দায়ী করে বলেন, “যন্ত্রপাতি দেওয়া হলেও দক্ষ জনবল দেওয়া হয়নি। এমন উদাসীনতা আমরা আর দেখতে চাই না।”


এ বিষয়ে হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা: মো: মাহফুজুর রহমান সোহান জানান, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, প্রশিক্ষিত টেকনিশিয়ান ও পর্যাপ্ত জনবলের অভাবে আইসিইউটি চালু করা সম্ভব হয়নি। উল্টো, ২০২৩ সালে ঢাকা থেকে স্বাস্থ্য বিভাগের একটি দল এসে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর এই আইসিইউ ও যন্ত্রপাতিগুলোকে অকেজো বা বাতিল বলে ঘোষণা করে গেছে।


কোটি টাকার যন্ত্রপাতি একদিনের জন্যও ব্যবহার না করে এভাবে ‘বাতিল’ ঘোষণার পেছনে কার দায় এখন সেই প্রশ্নই তুলছেন জেলার ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ।


বিপ্লবী বার্তা

প্রকাশক
শেখ মাহমুদ উজ্জ্বল
সম্পাদক
ড. জাহিদ আহমেদ চৌধুরী
নির্বাহী সম্পাদক
কাইয়ুম তালুকদার (কানন)

কপিরাইট © ২০২৬ । বিপ্লবী বার্তা