একসময় যোগাযোগ মানে কেবল সংবাদ ছিল না; যোগাযোগ ছিল একটি দীর্ঘ অপেক্ষার নাম। সেই হলুদ খাম কিংবা নীল ইনল্যান্ড কাগজের ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে থাকত মানুুষের আদিমতম আবেগ। চিঠি ছিল এক টুকরো কাগুজে প্রাণ, যেখানে মিশে থাকত প্রিয়জনের হাতের স্পর্শ, কালির ঘ্রাণ আর বুকের ভেতর লালন করা এক সমুদ্র ভালোবাসা।
সভ্যতার সেই ঊষালগ্ন থেকেই মানুষ তার একাকীত্বকে জয় করতে চেয়েছে শব্দের মায়ায়। প্রাচীন মিশরের প্যাপিরাস থেকে শুরু করে গ্রিস বা রোমের রাজকীয় দূত, চিঠিই বয়ে এনেছে সাম্রাজ্যের উত্থান-পতন আর বীরের গাথা। মধ্যযুগের ঘোড়সওয়ার ডাকপিয়নরা যখন ধুলো উড়িয়ে ছুটত, তখন তারা কেবল খবর বহন করত না, তারা বহন করত একেকটি ইতিহাস। সেই রাজকীয় ফরমান থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের করুণ আর্তি সবই লিপিবদ্ধ ছিল কাগজের এই নিঃশব্দ ভাষায়।
বাংলার শ্যামল প্রান্তরে একসময় ডাকপিয়ন ছিল কোনো অলৌকিক দূতের মতো। তার পায়ের শব্দে বা ঘণ্টা বাজানোর আওয়াজে বাড়ির অন্দরে অন্দরে বেজে উঠত কৌতূহলের সানাই। মায়ের সেই কম্পিত হাতের লেখা, "বাবা, তোর জন্য পিঠা বানিয়ে রেখেছি, বাড়ি ফিরবি কবে?" কিংবা বিলেত ফেরত স্বামীর কাছে নববধূর আকুলতা, "জানালার পাশে বসে আমি আজও তোমার ফেরার দিন গুনি।" চিঠি তখন কেবল সম্পর্কের সেতু ছিল না, ছিল দূরত্বের বিরুদ্ধে এক নীরব যুদ্ধ।
একটি চিঠি মানে কেবল একগুচ্ছ বর্ণমালা নয়, একটি চিঠি মানে মানুষের হৃদয়ের মানচিত্র। এতে মিশে থাকত কালির ঘ্রাণ আর হৃদয়ের রক্তক্ষরণ। তাতে লেগে থাকত পনেরো দিনের পথ পেরিয়ে আসা এক টুকরো সান্ত্বনার অপেক্ষা, কান্নার দাগে ঝাপসা হয়ে যাওয়া কোনো বিচ্ছেদের শব্দ, কিংবা মুখে বলতে না পারা প্রেমের আড়ষ্টতা। ভিনদেশের একাকীত্বে থাকা প্রবাসীর কাছে চিঠি ছিল দেশের মাটির সোঁদা গন্ধ খোঁজার মাধ্যম। ডিজিটাল বার্তা আজ মুহূর্তেই পৌঁছায়, কিন্তু তাতে সেই প্রতীক্ষার মাধুর্য নেই। চিঠি আসত ধীরলয়ে, তাই তার প্রতিটি শব্দ মনে হতো এক একটি মহামূল্যবান রত্ন।
চিঠির এই চিরন্তন আবেগকে ধারণ করতেই ২০২২ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে জন্ম নিয়েছিল ‘চিঠি চত্বর’। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক কোণে জমে থাকা অবহেলা আর ময়লার স্তূপকে পাশ কাটিয়ে একদল স্বপ্নবাজ তরুণের ছোঁয়ায় জন্ম নিয়েছিল এক টুকরো নস্টালজিক সোপান—'চিঠি চত্বর'। বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রাফিতি সংগঠন 'বৃত্ত কুবি'-র সদস্যদের নিপুণ তুলির টানে আর অক্লান্ত পরিশ্রমে প্রাণহীন সেই স্থানটি হয়ে উঠেছিল অনুভূতির এক জীবন্ত গ্যালারি।
চত্বরের মধ্যমণি হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল একটি তপ্ত লাল ডাকবাক্স, যা দেখে মনে হতো যেন নাগরিক কোলাহলের মাঝে এক শান্ত ডাকঘর। কেবল সাজসজ্জা নয়, চিঠিগুলো গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার জন্য ছিল একদল নিবেদিতপ্রাণ 'ডাকপিয়ন'। চত্বরের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ছিল আরও একদল । উদ্বোধনের আগে থেকেই 'বৃত্ত কুবি'-র ঠিকানায় জমা হতে শুরু করেছিল অজস্র চিঠি। কেউ লিখেছিল প্রিয় বন্ধুর কাছে, কেউবা অজানা কোনো অনুরাগে, যা প্রমাণ করেছিল ডিজিটাল এই যুগেও মানুষের হাহাকার আর ভালোবাসার শেষ আশ্রয় সেই চিঠির ভাঁজেই লুকিয়ে আছে।
'বৃত্ত কুবি'-র স্বপ্ন ছিল আরও বিশাল। তারা চেয়েছিল এই ছোট চত্বরটি হবে চিঠি আদান-প্রদানের এক মহাকাব্যিক কেন্দ্র; যেখানে কেবল বিশ্ববিদ্যালয় নয়, পুরো বাংলাদেশের মানুষ কুবিয়ানদের সাথে চিঠির মাধ্যমে হৃদয়ের সেতুবন্ধন তৈরি করবে। চিঠি চত্বর হয়ে উঠেছিল এক টুকরো স্বপ্নবিলাস, যেখানে শব্দেরা কথা বলত কালির ভাষায়।
কিন্তু মহাকালের নিষ্ঠুর আবর্তে আজ সেই স্বপ্ন মলিন। যে জায়গাটি ময়লার স্তূপ থেকে উদ্ধার করে ফুলের মতো সাজানো হয়েছিল, কালের বিবর্তনে আজ তা আবারও সেই শ্রীহীন অবহেলার স্তূপেই পরিণত হয়েছে। রঙচটা সেই দেয়াল যেন একাকী দাঁড়িয়ে বিলাপ করছে। হারিয়ে গিয়েছে সেই তপ্ত লাল ডাকবাক্সটিও। একসময় যেখানে ছিল আড্ডা আর আবেগের গুঞ্জন, সেখানে আজ জমাট বেঁধেছে নিস্তব্ধতা আর অবজ্ঞার ধুলোবালি।
নৃবিজ্ঞান বিভাগের ২০২০-২০২১ শিক্ষাবর্ষে শিক্ষার্থী আফিয়া মাস্- উদা মিথিলা চিঠি চত্বর নিয়ে বলেন, ‘চিঠি চত্বরের জায়গাটি আবার আগের অপরিচ্ছন্ন অবস্থায় ফিরে যাওয়াটা একজন শিক্ষার্থী হিসেবে আমাকে সত্যিই হতাশ করে। একসময় আমরা এই জায়গাটিকে নতুন করে সাজানো ও পরিষ্কার অবস্থায় পেয়েছিলাম যেখানে বসা যেত, ছবি তোলা যেত, এমনকি চিঠি বাক্সে চিঠি রাখার সেই পুরনো অনুভূতিটাও ফিরে পেয়েছিলাম। মনে হয়েছিল চিঠির ঐতিহ্য যেন আবার জীবন্ত হয়ে উঠেছে। কিন্তু এখন সেই জায়গাটিই অবহেলা ও ময়লায় ঢেকে যেতে দেখে খুব খারাপ লাগে, মনে হয় আমরা আমাদের সেই সুন্দর স্মৃতি ও ঐতিহ্যটাকে ধরে রাখতে পারলাম না।
আমার মতে, একটি পরিচ্ছন্ন ক্যাম্পাস শিক্ষার্থীদের মানসিকতা ও সংস্কৃতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। পরিষ্কার ও যত্নে রাখা পরিবেশ শিক্ষার্থীদের দায়িত্বশীল ও সচেতন হতে শেখায় এবং ক্যাম্পাসের প্রতি ভালোবাসা ও সম্মিলিত দায়িত্ববোধ তৈরি করে। বিপরীতে, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ ধীরে ধীরে উদাসীনতা ও অনাগ্রহের সংস্কৃতি তৈরি করে।"
বৃত্ত কুবির বর্তমান কমিটির সভাপতি তাওহীদ হোসেন সানি বলেন, 'বৃত্ত কুবির সবচেয়ে সাড়াজাগানো উদ্যোগগুলোর একটি ছিল “চিঠি চত্বর”। একসময় মানুষ প্রিয়জনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখত চিঠির মাধ্যমে মনের কথা, আবেগ-অনুভূতি সবই লিখে দিত। এখন সবকিছু মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ, ইনবক্সে চলে যাওয়ায় সেই সংস্কৃতি প্রায় হারিয়ে গেছে। সেই অনুভূতিটা ফিরিয়ে আনতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। শিক্ষার্থীরা চিঠি লিখত, আর বৃত্ত কুবি ঠিকানামতো পৌঁছে দিত।
হারিয়ে যাওয়ার মূল কারণ ছিল সাংগঠনিক গতিশীলতার অভাব। সাবেক সভাপতি-সম্পাদক ক্যাম্পাস ছেড়ে দেওয়ায় নেতৃত্বে শূন্যতা তৈরি হয়, নতুন নেতৃত্বও ঠিকভাবে গঠিত হয়নি। পৃষ্ঠপোষকতার অভাব ও শিক্ষার্থীদের কম আগ্রহও প্রভাব ফেলেছে। বাস্তবতা হলো, চিঠি সবাই পেতে চায়; কিন্তু লিখতে বসে কয়জন?
তবে আমরা থেমে নেই। ঈদের পর নতুনভাবে চমক নিয়ে ফিরতে চাই।
সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ সোহরাব উদ্দিন বলেন, “চিঠি চত্বর হারিয়ে গেল—কারণটা বলতে গেলে একটু পেছনে যেতে হয়। এখন দেখা যাচ্ছে, সমগ্র কমিউনিটি দীর্ঘদিন কোনো ধারাবাহিক প্রক্রিয়ায় থাকতে চায় না। প্রথম দিন দশজন থাকে, পরে আটজন, সাতজন দশ দিন পর গাছে পানি দেওয়ার কাউকে পাওয়া যায় না। আমরা ভালো কাজের চেয়ে তার প্রচার বেশি করি; কিন্তু নিয়মিত থাকি না।
চিঠি চত্বরের পরিকল্পনা ছিল প্রতি বৃহস্পতিবার গান, সপ্তাহান্তে চিঠি পৌঁছে দেওয়া। বিশ্বাস ছিল, কাগজে লেখা একটি চিঠির আবেদন আলাদা। ‘আমাকে ক্ষমা করে দিও’—এক টুকরো চিরকুটই অনেক ভুল বোঝাবুঝি মিটিয়ে দিতে পারে। এটি ছিল মানুষের মনের কথা প্রকাশের একটি মাধ্যম।
কিন্তু এই কাজের জন্য নিয়মিত প্রক্রিয়া ও দায়িত্ব দরকার ছিল। চিঠি কম হলেও পৌঁছে দিতে সময় বের করতে হতো। সেই ধারাবাহিকতা ধরে রাখা যায়নি।
আমি সবসময় ভালো কাজের সঙ্গে আছি; ছাত্রদের নিয়ে কাজ করতেই পছন্দ করি। তবে একটি উদ্যোগ শুরু করে বন্ধ করে দিলে মানুষ আঘাত পায়। পুরো ক্যাম্পাসে লেখালেখিপ্রিয়দের মধ্যে যে অনুপ্রেরণা তৈরি হয়েছিল, সেটি থেমে গেছে।
তাই আবার শুরু করতে হলে ভেবে-চিন্তে করতে হবে। কারণ আবার বন্ধ হলে এটি সংগঠনের জন্য নেতিবাচক দৃষ্টান্ত হয়ে যাবে উদ্যোগ নেয়, কিন্তু ধারাবাহিকভাবে চালিয়ে যেতে পারে না।”
চিঠি চত্বর হয়তো আজ হারিয়ে গেছে, কিন্তু তার সেই অল্প কদিনের পথচলা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে এক অমর স্মৃতি হয়ে থাকবে। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, আমরা যতটা দ্রুত ডিজিটাল হতে চেয়েছি, ততটা দ্রুত হয়তো নিজের শেকড় আর আবেগগুলোকে আগলে রাখতে শিখিনি।
চিঠি চত্বর কি কেবলই একটি চত্বর ছিল? না, এটি ছিল একদল তরুণের হার না মানা জেদ আর হাজারো মানুষের অপ্রকাশিত কথার দলিল। আজ চত্বরটি হয়তো ময়লার স্তূপে ঢাকা পড়েছে, কিন্তু সেই লাল ডাকবাক্সে ফেলে আসা অনুভূতিগুলো আজও কুবিয়ানদের স্মৃতিতে সতেজ।

মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৮ এপ্রিল ২০২৬
একসময় যোগাযোগ মানে কেবল সংবাদ ছিল না; যোগাযোগ ছিল একটি দীর্ঘ অপেক্ষার নাম। সেই হলুদ খাম কিংবা নীল ইনল্যান্ড কাগজের ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে থাকত মানুুষের আদিমতম আবেগ। চিঠি ছিল এক টুকরো কাগুজে প্রাণ, যেখানে মিশে থাকত প্রিয়জনের হাতের স্পর্শ, কালির ঘ্রাণ আর বুকের ভেতর লালন করা এক সমুদ্র ভালোবাসা।
সভ্যতার সেই ঊষালগ্ন থেকেই মানুষ তার একাকীত্বকে জয় করতে চেয়েছে শব্দের মায়ায়। প্রাচীন মিশরের প্যাপিরাস থেকে শুরু করে গ্রিস বা রোমের রাজকীয় দূত, চিঠিই বয়ে এনেছে সাম্রাজ্যের উত্থান-পতন আর বীরের গাথা। মধ্যযুগের ঘোড়সওয়ার ডাকপিয়নরা যখন ধুলো উড়িয়ে ছুটত, তখন তারা কেবল খবর বহন করত না, তারা বহন করত একেকটি ইতিহাস। সেই রাজকীয় ফরমান থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের করুণ আর্তি সবই লিপিবদ্ধ ছিল কাগজের এই নিঃশব্দ ভাষায়।
বাংলার শ্যামল প্রান্তরে একসময় ডাকপিয়ন ছিল কোনো অলৌকিক দূতের মতো। তার পায়ের শব্দে বা ঘণ্টা বাজানোর আওয়াজে বাড়ির অন্দরে অন্দরে বেজে উঠত কৌতূহলের সানাই। মায়ের সেই কম্পিত হাতের লেখা, "বাবা, তোর জন্য পিঠা বানিয়ে রেখেছি, বাড়ি ফিরবি কবে?" কিংবা বিলেত ফেরত স্বামীর কাছে নববধূর আকুলতা, "জানালার পাশে বসে আমি আজও তোমার ফেরার দিন গুনি।" চিঠি তখন কেবল সম্পর্কের সেতু ছিল না, ছিল দূরত্বের বিরুদ্ধে এক নীরব যুদ্ধ।
একটি চিঠি মানে কেবল একগুচ্ছ বর্ণমালা নয়, একটি চিঠি মানে মানুষের হৃদয়ের মানচিত্র। এতে মিশে থাকত কালির ঘ্রাণ আর হৃদয়ের রক্তক্ষরণ। তাতে লেগে থাকত পনেরো দিনের পথ পেরিয়ে আসা এক টুকরো সান্ত্বনার অপেক্ষা, কান্নার দাগে ঝাপসা হয়ে যাওয়া কোনো বিচ্ছেদের শব্দ, কিংবা মুখে বলতে না পারা প্রেমের আড়ষ্টতা। ভিনদেশের একাকীত্বে থাকা প্রবাসীর কাছে চিঠি ছিল দেশের মাটির সোঁদা গন্ধ খোঁজার মাধ্যম। ডিজিটাল বার্তা আজ মুহূর্তেই পৌঁছায়, কিন্তু তাতে সেই প্রতীক্ষার মাধুর্য নেই। চিঠি আসত ধীরলয়ে, তাই তার প্রতিটি শব্দ মনে হতো এক একটি মহামূল্যবান রত্ন।
চিঠির এই চিরন্তন আবেগকে ধারণ করতেই ২০২২ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে জন্ম নিয়েছিল ‘চিঠি চত্বর’। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক কোণে জমে থাকা অবহেলা আর ময়লার স্তূপকে পাশ কাটিয়ে একদল স্বপ্নবাজ তরুণের ছোঁয়ায় জন্ম নিয়েছিল এক টুকরো নস্টালজিক সোপান—'চিঠি চত্বর'। বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রাফিতি সংগঠন 'বৃত্ত কুবি'-র সদস্যদের নিপুণ তুলির টানে আর অক্লান্ত পরিশ্রমে প্রাণহীন সেই স্থানটি হয়ে উঠেছিল অনুভূতির এক জীবন্ত গ্যালারি।
চত্বরের মধ্যমণি হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল একটি তপ্ত লাল ডাকবাক্স, যা দেখে মনে হতো যেন নাগরিক কোলাহলের মাঝে এক শান্ত ডাকঘর। কেবল সাজসজ্জা নয়, চিঠিগুলো গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার জন্য ছিল একদল নিবেদিতপ্রাণ 'ডাকপিয়ন'। চত্বরের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ছিল আরও একদল । উদ্বোধনের আগে থেকেই 'বৃত্ত কুবি'-র ঠিকানায় জমা হতে শুরু করেছিল অজস্র চিঠি। কেউ লিখেছিল প্রিয় বন্ধুর কাছে, কেউবা অজানা কোনো অনুরাগে, যা প্রমাণ করেছিল ডিজিটাল এই যুগেও মানুষের হাহাকার আর ভালোবাসার শেষ আশ্রয় সেই চিঠির ভাঁজেই লুকিয়ে আছে।
'বৃত্ত কুবি'-র স্বপ্ন ছিল আরও বিশাল। তারা চেয়েছিল এই ছোট চত্বরটি হবে চিঠি আদান-প্রদানের এক মহাকাব্যিক কেন্দ্র; যেখানে কেবল বিশ্ববিদ্যালয় নয়, পুরো বাংলাদেশের মানুষ কুবিয়ানদের সাথে চিঠির মাধ্যমে হৃদয়ের সেতুবন্ধন তৈরি করবে। চিঠি চত্বর হয়ে উঠেছিল এক টুকরো স্বপ্নবিলাস, যেখানে শব্দেরা কথা বলত কালির ভাষায়।
কিন্তু মহাকালের নিষ্ঠুর আবর্তে আজ সেই স্বপ্ন মলিন। যে জায়গাটি ময়লার স্তূপ থেকে উদ্ধার করে ফুলের মতো সাজানো হয়েছিল, কালের বিবর্তনে আজ তা আবারও সেই শ্রীহীন অবহেলার স্তূপেই পরিণত হয়েছে। রঙচটা সেই দেয়াল যেন একাকী দাঁড়িয়ে বিলাপ করছে। হারিয়ে গিয়েছে সেই তপ্ত লাল ডাকবাক্সটিও। একসময় যেখানে ছিল আড্ডা আর আবেগের গুঞ্জন, সেখানে আজ জমাট বেঁধেছে নিস্তব্ধতা আর অবজ্ঞার ধুলোবালি।
নৃবিজ্ঞান বিভাগের ২০২০-২০২১ শিক্ষাবর্ষে শিক্ষার্থী আফিয়া মাস্- উদা মিথিলা চিঠি চত্বর নিয়ে বলেন, ‘চিঠি চত্বরের জায়গাটি আবার আগের অপরিচ্ছন্ন অবস্থায় ফিরে যাওয়াটা একজন শিক্ষার্থী হিসেবে আমাকে সত্যিই হতাশ করে। একসময় আমরা এই জায়গাটিকে নতুন করে সাজানো ও পরিষ্কার অবস্থায় পেয়েছিলাম যেখানে বসা যেত, ছবি তোলা যেত, এমনকি চিঠি বাক্সে চিঠি রাখার সেই পুরনো অনুভূতিটাও ফিরে পেয়েছিলাম। মনে হয়েছিল চিঠির ঐতিহ্য যেন আবার জীবন্ত হয়ে উঠেছে। কিন্তু এখন সেই জায়গাটিই অবহেলা ও ময়লায় ঢেকে যেতে দেখে খুব খারাপ লাগে, মনে হয় আমরা আমাদের সেই সুন্দর স্মৃতি ও ঐতিহ্যটাকে ধরে রাখতে পারলাম না।
আমার মতে, একটি পরিচ্ছন্ন ক্যাম্পাস শিক্ষার্থীদের মানসিকতা ও সংস্কৃতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। পরিষ্কার ও যত্নে রাখা পরিবেশ শিক্ষার্থীদের দায়িত্বশীল ও সচেতন হতে শেখায় এবং ক্যাম্পাসের প্রতি ভালোবাসা ও সম্মিলিত দায়িত্ববোধ তৈরি করে। বিপরীতে, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ ধীরে ধীরে উদাসীনতা ও অনাগ্রহের সংস্কৃতি তৈরি করে।"
বৃত্ত কুবির বর্তমান কমিটির সভাপতি তাওহীদ হোসেন সানি বলেন, 'বৃত্ত কুবির সবচেয়ে সাড়াজাগানো উদ্যোগগুলোর একটি ছিল “চিঠি চত্বর”। একসময় মানুষ প্রিয়জনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখত চিঠির মাধ্যমে মনের কথা, আবেগ-অনুভূতি সবই লিখে দিত। এখন সবকিছু মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ, ইনবক্সে চলে যাওয়ায় সেই সংস্কৃতি প্রায় হারিয়ে গেছে। সেই অনুভূতিটা ফিরিয়ে আনতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। শিক্ষার্থীরা চিঠি লিখত, আর বৃত্ত কুবি ঠিকানামতো পৌঁছে দিত।
হারিয়ে যাওয়ার মূল কারণ ছিল সাংগঠনিক গতিশীলতার অভাব। সাবেক সভাপতি-সম্পাদক ক্যাম্পাস ছেড়ে দেওয়ায় নেতৃত্বে শূন্যতা তৈরি হয়, নতুন নেতৃত্বও ঠিকভাবে গঠিত হয়নি। পৃষ্ঠপোষকতার অভাব ও শিক্ষার্থীদের কম আগ্রহও প্রভাব ফেলেছে। বাস্তবতা হলো, চিঠি সবাই পেতে চায়; কিন্তু লিখতে বসে কয়জন?
তবে আমরা থেমে নেই। ঈদের পর নতুনভাবে চমক নিয়ে ফিরতে চাই।
সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ সোহরাব উদ্দিন বলেন, “চিঠি চত্বর হারিয়ে গেল—কারণটা বলতে গেলে একটু পেছনে যেতে হয়। এখন দেখা যাচ্ছে, সমগ্র কমিউনিটি দীর্ঘদিন কোনো ধারাবাহিক প্রক্রিয়ায় থাকতে চায় না। প্রথম দিন দশজন থাকে, পরে আটজন, সাতজন দশ দিন পর গাছে পানি দেওয়ার কাউকে পাওয়া যায় না। আমরা ভালো কাজের চেয়ে তার প্রচার বেশি করি; কিন্তু নিয়মিত থাকি না।
চিঠি চত্বরের পরিকল্পনা ছিল প্রতি বৃহস্পতিবার গান, সপ্তাহান্তে চিঠি পৌঁছে দেওয়া। বিশ্বাস ছিল, কাগজে লেখা একটি চিঠির আবেদন আলাদা। ‘আমাকে ক্ষমা করে দিও’—এক টুকরো চিরকুটই অনেক ভুল বোঝাবুঝি মিটিয়ে দিতে পারে। এটি ছিল মানুষের মনের কথা প্রকাশের একটি মাধ্যম।
কিন্তু এই কাজের জন্য নিয়মিত প্রক্রিয়া ও দায়িত্ব দরকার ছিল। চিঠি কম হলেও পৌঁছে দিতে সময় বের করতে হতো। সেই ধারাবাহিকতা ধরে রাখা যায়নি।
আমি সবসময় ভালো কাজের সঙ্গে আছি; ছাত্রদের নিয়ে কাজ করতেই পছন্দ করি। তবে একটি উদ্যোগ শুরু করে বন্ধ করে দিলে মানুষ আঘাত পায়। পুরো ক্যাম্পাসে লেখালেখিপ্রিয়দের মধ্যে যে অনুপ্রেরণা তৈরি হয়েছিল, সেটি থেমে গেছে।
তাই আবার শুরু করতে হলে ভেবে-চিন্তে করতে হবে। কারণ আবার বন্ধ হলে এটি সংগঠনের জন্য নেতিবাচক দৃষ্টান্ত হয়ে যাবে উদ্যোগ নেয়, কিন্তু ধারাবাহিকভাবে চালিয়ে যেতে পারে না।”
চিঠি চত্বর হয়তো আজ হারিয়ে গেছে, কিন্তু তার সেই অল্প কদিনের পথচলা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে এক অমর স্মৃতি হয়ে থাকবে। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, আমরা যতটা দ্রুত ডিজিটাল হতে চেয়েছি, ততটা দ্রুত হয়তো নিজের শেকড় আর আবেগগুলোকে আগলে রাখতে শিখিনি।
চিঠি চত্বর কি কেবলই একটি চত্বর ছিল? না, এটি ছিল একদল তরুণের হার না মানা জেদ আর হাজারো মানুষের অপ্রকাশিত কথার দলিল। আজ চত্বরটি হয়তো ময়লার স্তূপে ঢাকা পড়েছে, কিন্তু সেই লাল ডাকবাক্সে ফেলে আসা অনুভূতিগুলো আজও কুবিয়ানদের স্মৃতিতে সতেজ।

আপনার মতামত লিখুন