মুসলমানদের জন্য ফরজ ইবাদাতগুলোর মাঝে অন্যতম আর্থিক ইবাদাত হজ। সামর্থবান মুসলমানের উপর সৃষ্টিকর্তার পক্ষ থেকে জীবনে একবার হজ করা আবশ্য কর্তব্য। ইসলামের এই আবশ্যক কর্তব্য পালনের স্বপ্ন সকল মুসলমানেরই থাকে। নিজের চোখে আল্লাহর ঘর দেখে ফরজ ইবাদাত সম্পন্ন করার স্বপ্ন ছিল হকার মতিউর রহমানের। আর্থিক সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও দীর্ঘদিন পত্রিকা বিক্রির আয় থেকে অল্প অল্প করে টাকা জমিয়ে অবশেষে চার বছর আগে হজ পালন করেন তিনি।
মতিউর রহমান, সবার কাছে পরিচিত ‘মতি ভাই’ নামে। তার বাড়ি নরসিংদীর মনোহরদী পৌরসভার হাররদিয়া গ্রামে। বর্তমানে তার বয়স প্রায় ৭৫ বছর। প্রায় ৬০ বছরেরও বেশি সময় ধরে তিনি পত্রিকা বিক্রির পেশার সঙ্গে জড়িত। বয়সের ভারে শরীর নুয়ে গেলেও থেমে নেই তার কর্মজীবন। এখনো শীত, গ্রীষ্ম, রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে প্রতিদিন মানুষের দোরগোড়ায় পত্রিকা পৌঁছে দেন তিনি।
৬০ বছর ধরে পত্রিকা বিক্রির লাভের অংশ থেকে তিল তিল করে জমানো টাকায় চার বছর আগে হজ আদায় করেছেন তিনি।
মতি ভাই জানান, তার বাবা আব্দুল হালিমও পত্রিকা বিক্রির ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বাবার হাত ধরেই ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের আগ থেকে তিনি এ পেশায় আসেন। সেই সময়ের জনপ্রিয় পত্রিকা ‘দৈনিক ইত্তেফাক’, ‘দৈনিক বাংলা’, ‘বাংলার বাণী’ ও ‘বাংলাদেশ অবজারভার’ বিক্রির মধ্য দিয়ে তার কর্মজীবন শুরু হয়।
তখনকার দিনে আগের দিনের পত্রিকা পাওয়া যেত পরের দিন। প্রথমদিকে তিনি নিজে এজেন্ট ছিলেন না। শিবপুরের আব্দুল খালেক মাস্টারের নামে আসা পত্রিকা থেকে ৭০-৮০ কপি সংগ্রহ করে বিক্রি করতেন। পাশাপাশি ডাক বিভাগের রানার হিসেবেও কাজ করেছেন। ডাকের চিঠি নিয়ে শিবপুরে যাওয়া-আসার পথে পত্রিকা এনে মনোহরদী ও পাশের কাপাসিয়ার বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করতেন তিনি।
এভাবে কিছুদিন কাজ করার পর নিজেই পত্রিকার এজেন্ট হয়ে যান। তখনকার দিনে প্রতিদিন ৫০/৬০ কি.মি সাইকেল চালিয়ে মানুষের কাছে পত্রিকা পৌঁছে দিতেন তিনি। এখনো খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠেই ফজরের নামাজ আদায়ের পর দীর্ঘ দিনের সঙ্গী সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়েন মতি ভাই।
বর্তমানে মতিউর রহমানের ছোট ছেলে সাইফুলও একই ব্যবসায় নেমেছেন। পত্রিকা বিক্রি অনেকটা তাদের পারিবারিক ব্যবসায় পরিণত হয়েছে বলা যেতে পারে।
মতিউর রহমান জানান, ১০ বছর ডাক বিভাগের চাকুরী থেকে অবসরে গিয়েছেন তিনি। তবে মানুষের দ্বারে দ্বারে পত্রিকা পৌঁছে দেওয়ার সেবা থেকে অবসর নেননি। এখনো মনোহরদীর গুরুত্বপূর্ণ অফিস, পৌরসভা অফিসসহ বিভিন্ন ব্যাংক, বীমা, এনজিও অফিস, মনোহরদী বাজারের দোকান এবং বিভিন্ন বাসা বাড়িতে পত্রিকা পৌঁছিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব আনন্দের সাথেই পালন করে যাচ্ছেন তিনি। বর্তমানে প্রতিদিন প্রায় ২০০ কপির বেশি পত্রিকা বিতরণ করেন তিনি।
মনোহরদী প্রেসক্লাবের সভাপতি হারুন অর রশিদ বলেন, “মতি ভাই অত্যন্ত সহজ-সরল, খোদাভীরু ও সাদা মনের মানুষ। শত ব্যস্ততার মাঝেও তিনি নিয়মিত নামাজ আদায় করেন। সবসময় হাসিমুখে সবার সঙ্গে কথা বলেন এবং আনন্দ নিয়ে কাজ করেন।”
মনোহরদী পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর জুয়েল বলেন, “তিনি খুব সাধারণ জীবনযাপন করেন। আর্থিকভাবে খুব স্বচ্ছল না হলেও কখনো কারও কাছে হাত পাতেন না। নিজের মতো করে সম্মানের সঙ্গে জীবন কাটাচ্ছেন।”
দীর্ঘ পরিশ্রম, সততা আর অদম্য ইচ্ছাশক্তির এক অনন্য উদাহরণ হয়ে উঠেছেন পত্রিকা হকার মতিউর রহমান।

মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৮ এপ্রিল ২০২৬
মুসলমানদের জন্য ফরজ ইবাদাতগুলোর মাঝে অন্যতম আর্থিক ইবাদাত হজ। সামর্থবান মুসলমানের উপর সৃষ্টিকর্তার পক্ষ থেকে জীবনে একবার হজ করা আবশ্য কর্তব্য। ইসলামের এই আবশ্যক কর্তব্য পালনের স্বপ্ন সকল মুসলমানেরই থাকে। নিজের চোখে আল্লাহর ঘর দেখে ফরজ ইবাদাত সম্পন্ন করার স্বপ্ন ছিল হকার মতিউর রহমানের। আর্থিক সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও দীর্ঘদিন পত্রিকা বিক্রির আয় থেকে অল্প অল্প করে টাকা জমিয়ে অবশেষে চার বছর আগে হজ পালন করেন তিনি।
মতিউর রহমান, সবার কাছে পরিচিত ‘মতি ভাই’ নামে। তার বাড়ি নরসিংদীর মনোহরদী পৌরসভার হাররদিয়া গ্রামে। বর্তমানে তার বয়স প্রায় ৭৫ বছর। প্রায় ৬০ বছরেরও বেশি সময় ধরে তিনি পত্রিকা বিক্রির পেশার সঙ্গে জড়িত। বয়সের ভারে শরীর নুয়ে গেলেও থেমে নেই তার কর্মজীবন। এখনো শীত, গ্রীষ্ম, রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে প্রতিদিন মানুষের দোরগোড়ায় পত্রিকা পৌঁছে দেন তিনি।
৬০ বছর ধরে পত্রিকা বিক্রির লাভের অংশ থেকে তিল তিল করে জমানো টাকায় চার বছর আগে হজ আদায় করেছেন তিনি।
মতি ভাই জানান, তার বাবা আব্দুল হালিমও পত্রিকা বিক্রির ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বাবার হাত ধরেই ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের আগ থেকে তিনি এ পেশায় আসেন। সেই সময়ের জনপ্রিয় পত্রিকা ‘দৈনিক ইত্তেফাক’, ‘দৈনিক বাংলা’, ‘বাংলার বাণী’ ও ‘বাংলাদেশ অবজারভার’ বিক্রির মধ্য দিয়ে তার কর্মজীবন শুরু হয়।
তখনকার দিনে আগের দিনের পত্রিকা পাওয়া যেত পরের দিন। প্রথমদিকে তিনি নিজে এজেন্ট ছিলেন না। শিবপুরের আব্দুল খালেক মাস্টারের নামে আসা পত্রিকা থেকে ৭০-৮০ কপি সংগ্রহ করে বিক্রি করতেন। পাশাপাশি ডাক বিভাগের রানার হিসেবেও কাজ করেছেন। ডাকের চিঠি নিয়ে শিবপুরে যাওয়া-আসার পথে পত্রিকা এনে মনোহরদী ও পাশের কাপাসিয়ার বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করতেন তিনি।
এভাবে কিছুদিন কাজ করার পর নিজেই পত্রিকার এজেন্ট হয়ে যান। তখনকার দিনে প্রতিদিন ৫০/৬০ কি.মি সাইকেল চালিয়ে মানুষের কাছে পত্রিকা পৌঁছে দিতেন তিনি। এখনো খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠেই ফজরের নামাজ আদায়ের পর দীর্ঘ দিনের সঙ্গী সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়েন মতি ভাই।
বর্তমানে মতিউর রহমানের ছোট ছেলে সাইফুলও একই ব্যবসায় নেমেছেন। পত্রিকা বিক্রি অনেকটা তাদের পারিবারিক ব্যবসায় পরিণত হয়েছে বলা যেতে পারে।
মতিউর রহমান জানান, ১০ বছর ডাক বিভাগের চাকুরী থেকে অবসরে গিয়েছেন তিনি। তবে মানুষের দ্বারে দ্বারে পত্রিকা পৌঁছে দেওয়ার সেবা থেকে অবসর নেননি। এখনো মনোহরদীর গুরুত্বপূর্ণ অফিস, পৌরসভা অফিসসহ বিভিন্ন ব্যাংক, বীমা, এনজিও অফিস, মনোহরদী বাজারের দোকান এবং বিভিন্ন বাসা বাড়িতে পত্রিকা পৌঁছিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব আনন্দের সাথেই পালন করে যাচ্ছেন তিনি। বর্তমানে প্রতিদিন প্রায় ২০০ কপির বেশি পত্রিকা বিতরণ করেন তিনি।
মনোহরদী প্রেসক্লাবের সভাপতি হারুন অর রশিদ বলেন, “মতি ভাই অত্যন্ত সহজ-সরল, খোদাভীরু ও সাদা মনের মানুষ। শত ব্যস্ততার মাঝেও তিনি নিয়মিত নামাজ আদায় করেন। সবসময় হাসিমুখে সবার সঙ্গে কথা বলেন এবং আনন্দ নিয়ে কাজ করেন।”
মনোহরদী পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর জুয়েল বলেন, “তিনি খুব সাধারণ জীবনযাপন করেন। আর্থিকভাবে খুব স্বচ্ছল না হলেও কখনো কারও কাছে হাত পাতেন না। নিজের মতো করে সম্মানের সঙ্গে জীবন কাটাচ্ছেন।”
দীর্ঘ পরিশ্রম, সততা আর অদম্য ইচ্ছাশক্তির এক অনন্য উদাহরণ হয়ে উঠেছেন পত্রিকা হকার মতিউর রহমান।

আপনার মতামত লিখুন