বিপ্লবী বার্তা

মূল পাতা

সারাদেশ

কলাগাছ ও কচুরিপানা থেকে পরিবেশবান্ধব সুতা উৎপাদন: নোয়াখালীর সুবর্ণচরে সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত

কলাগাছ ও কচুরিপানা থেকে পরিবেশবান্ধব সুতা উৎপাদন: নোয়াখালীর সুবর্ণচরে সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত
ছবি: বিপ্লবী বার্তা

ফেলে দেওয়া কলাগাছ ও কচুরিপানা দিয়ে পরিবেশবান্ধব সুতা তৈরি করে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন নোয়াখালীর সুবর্ণচরের এক বেকার যুবক। উপকূলীয় এলাকার চর আমানুল্লাহ ইউনিয়নের এই নির্জন চরে গড়ে ওঠা এই সম্ভাবনার সুতা এখন রপ্তানি হচ্ছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে।

প্রচলিত আছে কলারুয়েনা কেটেও পাত, তাতে কাপড়, তাতে ভাত। ক্ষনার এই বচনটি যেন এখন নোয়াখালীর সুবর্ণচরের উপকূলীয় এলাকায় বাস্তবে রূপ নিয়েছে। স্থানীয় বেকার যুবক শংকর মজুমদার ইউটিউব দেখে মাত্র ১ লাখ ২০ হাজার টাকায় একটি মেশিন কিনে এই অভিনব উদ্যোগ শুরু করেন। অব্যবহৃত কলাগাছ ও কচুরিপানা থেকে সুতা তৈরির এই কর্মযজ্ঞে বর্তমানে ১০ থেকে ১৫ জন শ্রমিক কাজ করছেন। মাসে আয় করছেন কয়েক লক্ষ টাকা। 

তিনি জানান, তার তৈরী কলা গাছের সুতা দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশ থেকেও এই সুতার ব্যাপক চাহিদা আসছে। বিভিন্ন দেশ থেকে যোগাযোগ করে প্রতি মাসে প্রায় ১০০ টন করে সুতা চাওয়া হচ্ছে তবে পর্যাপ্ত পুঁজি ও মেশিনের স্বল্পতার কারণে সেই চাহিদা অনুযায়ী জোগান দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

কাজ করা এক শ্রমিক মিঠুন জানান, আমরা প্রথমে কলাগাছ সংরক্ষণ করি পরে কলাগাছ থেকে সুতা তৈরি করা হয়। সুতা তৈরি করার পর ওয়াশ করা হয়, ওয়াশ করার পর এগুলাকে রৌদ্র দেওয়া হয়।রৌদ্র দেওয়ার পর এগুলাকে প্যাকেটিং করা হয়। আর প্যাকেটিং করার পর এগুলাকে কাজিকুর রপ্তানি করা হয়।

যেভাবে তৈরি হয় এই সুতা: উদ্যোক্তার সহকর্মীরা জানান, প্রথমে কলাগাছ ও কচুরিপানা সংগ্রহ করে তা থেকে কাঁচামাল তৈরি করা হয়। এরপর মেশিনের মাধ্যমে সুতা বের করে তা ভালোভাবে ধুয়ে রোদে শুকানো হয়। রোদে শুকানোর পর তা সঠিকভাবে প্যাকেটিং করে কাজীপুরসহ বিভিন্ন স্থানে রপ্তানির জন্য প্রস্তুত করা হয়।

পণ্যের বাজারদর ও ব্যবহার: বর্তমানে এখানকার কলাগাছের সুতা প্রতি কেজি ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা এবং কচুরিপানার সুতা ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। এর মধ্যে কলাগাছের সুতা চীন এবং কচুরিপানার সুতা ইউরোপের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করা হচ্ছে। এছাড়া সুতা তৈরির পর অবশিষ্ট বর্জ্য বা ওয়েস্টেড অংশগুলোও ফেলে দেওয়া হচ্ছে না। এসব বর্জ্য প্রতি কেজি ৪০ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে, যা নার্সারিতে কোকোডাস্ট তৈরিসহ গোখাদ্য হিসেবে ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে।

এক সময়ে যেসব কাঁচামাল বা গাছ কেটে ফেলে দেওয়া হতো, তা দিয়ে যে মূল্যবান সুতা তৈরি করে অর্থনীতিতে অবদান রাখা সম্ভব তা এই অঞ্চলের মানুষের কাছে প্রথমে অবিশ্বাস্য মনে হয়েছিল। কিন্তু শংকরের এই সফলতায় এলাকার যুবকদের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে। প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ এই কারখানা দেখতে আসছেন এবং অনেকে এমন উদ্যোগ নেওয়ার পরিকল্পনা করছেন।

তবে স্থানীয়রা মনে করছেন, এই সম্ভাবনাময় শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে এবং এর পরিধি আরও বাড়াতে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও পর্যাপ্ত পুঁজি অত্যন্ত জরুরি। বেকারত্ব দূরীকরণ ও অর্থনৈতিক এই গুরুত্বপূর্ণ অবদানের পেছনের উদ্যোক্তাদের পাশে সরকার দাঁড়াবে এমনটাই প্রত্যাশা স্থানীয়দের। 

এ বিষেয় যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা খুরশীদ আলম বলেন, শংকর নামে একজন উদ্যোক্তা ইতিমধ্যে কলাগাছ থেকে সুতা তৈরি, কলাগাছ এবং কচুরিপানা থেকে সুতা তৈরির একটা প্রকল্প হাতে নিয়েছে। এবং তা  বাণিজ্যিকভভাবে নোয়াখালী, বগুড়া এবং দিনাজপুর বিভিন্ন জায়গাতে সেইগুলি বাজারজাত করতেছে।যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর এ ধরনের যুবকদের পাশে সবসময় আছে এবং থাকবে।

তিনি আরো বলেন,  আমি আশা করব যে শংকর মজুমদার যদি আমাদের সাথে যোগাযোগ করে  বিভিন্ন অর্থনৈতিক সংগঠন বিশেষ করে আমাদের গ্রামীণ ব্যাংক এবং আমাদের যে কর্মসংস্থান ব্যাংক আছে এগুলি থেকে তাকে কিভাবে অর্থনৈতিক সহযোগিতা দেওয়া যায় সে ব্যাপারে ইতোমধ্যে আমরা আলোচনা করেছি। 

এ দিকে সুবর্ণচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আকিব ওসমান বলেন, চর আমানউল্লাহ ইউনিয়নের একজন তরুণ উদ্যোক্তা, আমাদের পরিবেশে প্রাপ্ত খুবই একটি সহজলভ্য উপাদান কচুরিপানা এবং কলাগাছ থেকে সুতা তৈরির এক উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন প্রযুক্তির গত ব্যবহারের মাধ্যমে। এটি অত্যন্ত আশাব্যাঞ্জক একটি খবর। আমরা সুবর্ণচর উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ওনাকে শুভেচ্ছা জানাই, অভিনন্দন জানাই। 

তিনি বলেন, এ ধরনের যারা তরুণ উদ্যোক্তা আছে, যারা নতুন করে কিছু করার চেষ্টা করছেন তাদেরকে উৎসাহিত করবে।আর যারা এ ধরনের উদ্যোগকে নিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে চান, ব্যবসায়ী বিনিয়োগ করতে চান এবং যাদের বিনিয়োগ করার প্রয়োজন আছে, যাদের অর্থের প্রয়োজন আছে, আমরা উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান, সরকারি ব্যাংক যেগুলো আছে যারা বিনিয়োগ করতে লোন দিতে আগ্রহী, সে ধরনের প্রতিষ্টানের পিছনে আমরা অবশ্যই ভূমিকা রাখবো।

সুবর্ণচর কলাগাছ

আপনার মতামত লিখুন

বিপ্লবী বার্তা

সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬


কলাগাছ ও কচুরিপানা থেকে পরিবেশবান্ধব সুতা উৎপাদন: নোয়াখালীর সুবর্ণচরে সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত

প্রকাশের তারিখ : ০২ নভেম্বর ২০২৬

featured Image

ফেলে দেওয়া কলাগাছ ও কচুরিপানা দিয়ে পরিবেশবান্ধব সুতা তৈরি করে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন নোয়াখালীর সুবর্ণচরের এক বেকার যুবক। উপকূলীয় এলাকার চর আমানুল্লাহ ইউনিয়নের এই নির্জন চরে গড়ে ওঠা এই সম্ভাবনার সুতা এখন রপ্তানি হচ্ছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে।

প্রচলিত আছে কলারুয়েনা কেটেও পাত, তাতে কাপড়, তাতে ভাত। ক্ষনার এই বচনটি যেন এখন নোয়াখালীর সুবর্ণচরের উপকূলীয় এলাকায় বাস্তবে রূপ নিয়েছে। স্থানীয় বেকার যুবক শংকর মজুমদার ইউটিউব দেখে মাত্র ১ লাখ ২০ হাজার টাকায় একটি মেশিন কিনে এই অভিনব উদ্যোগ শুরু করেন। অব্যবহৃত কলাগাছ ও কচুরিপানা থেকে সুতা তৈরির এই কর্মযজ্ঞে বর্তমানে ১০ থেকে ১৫ জন শ্রমিক কাজ করছেন। মাসে আয় করছেন কয়েক লক্ষ টাকা। 

তিনি জানান, তার তৈরী কলা গাছের সুতা দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশ থেকেও এই সুতার ব্যাপক চাহিদা আসছে। বিভিন্ন দেশ থেকে যোগাযোগ করে প্রতি মাসে প্রায় ১০০ টন করে সুতা চাওয়া হচ্ছে তবে পর্যাপ্ত পুঁজি ও মেশিনের স্বল্পতার কারণে সেই চাহিদা অনুযায়ী জোগান দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

কাজ করা এক শ্রমিক মিঠুন জানান, আমরা প্রথমে কলাগাছ সংরক্ষণ করি পরে কলাগাছ থেকে সুতা তৈরি করা হয়। সুতা তৈরি করার পর ওয়াশ করা হয়, ওয়াশ করার পর এগুলাকে রৌদ্র দেওয়া হয়।রৌদ্র দেওয়ার পর এগুলাকে প্যাকেটিং করা হয়। আর প্যাকেটিং করার পর এগুলাকে কাজিকুর রপ্তানি করা হয়।

যেভাবে তৈরি হয় এই সুতা: উদ্যোক্তার সহকর্মীরা জানান, প্রথমে কলাগাছ ও কচুরিপানা সংগ্রহ করে তা থেকে কাঁচামাল তৈরি করা হয়। এরপর মেশিনের মাধ্যমে সুতা বের করে তা ভালোভাবে ধুয়ে রোদে শুকানো হয়। রোদে শুকানোর পর তা সঠিকভাবে প্যাকেটিং করে কাজীপুরসহ বিভিন্ন স্থানে রপ্তানির জন্য প্রস্তুত করা হয়।

পণ্যের বাজারদর ও ব্যবহার: বর্তমানে এখানকার কলাগাছের সুতা প্রতি কেজি ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা এবং কচুরিপানার সুতা ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। এর মধ্যে কলাগাছের সুতা চীন এবং কচুরিপানার সুতা ইউরোপের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করা হচ্ছে। এছাড়া সুতা তৈরির পর অবশিষ্ট বর্জ্য বা ওয়েস্টেড অংশগুলোও ফেলে দেওয়া হচ্ছে না। এসব বর্জ্য প্রতি কেজি ৪০ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে, যা নার্সারিতে কোকোডাস্ট তৈরিসহ গোখাদ্য হিসেবে ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে।

এক সময়ে যেসব কাঁচামাল বা গাছ কেটে ফেলে দেওয়া হতো, তা দিয়ে যে মূল্যবান সুতা তৈরি করে অর্থনীতিতে অবদান রাখা সম্ভব তা এই অঞ্চলের মানুষের কাছে প্রথমে অবিশ্বাস্য মনে হয়েছিল। কিন্তু শংকরের এই সফলতায় এলাকার যুবকদের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে। প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ এই কারখানা দেখতে আসছেন এবং অনেকে এমন উদ্যোগ নেওয়ার পরিকল্পনা করছেন।

তবে স্থানীয়রা মনে করছেন, এই সম্ভাবনাময় শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে এবং এর পরিধি আরও বাড়াতে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও পর্যাপ্ত পুঁজি অত্যন্ত জরুরি। বেকারত্ব দূরীকরণ ও অর্থনৈতিক এই গুরুত্বপূর্ণ অবদানের পেছনের উদ্যোক্তাদের পাশে সরকার দাঁড়াবে এমনটাই প্রত্যাশা স্থানীয়দের। 

এ বিষেয় যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা খুরশীদ আলম বলেন, শংকর নামে একজন উদ্যোক্তা ইতিমধ্যে কলাগাছ থেকে সুতা তৈরি, কলাগাছ এবং কচুরিপানা থেকে সুতা তৈরির একটা প্রকল্প হাতে নিয়েছে। এবং তা  বাণিজ্যিকভভাবে নোয়াখালী, বগুড়া এবং দিনাজপুর বিভিন্ন জায়গাতে সেইগুলি বাজারজাত করতেছে।যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর এ ধরনের যুবকদের পাশে সবসময় আছে এবং থাকবে।

তিনি আরো বলেন,  আমি আশা করব যে শংকর মজুমদার যদি আমাদের সাথে যোগাযোগ করে  বিভিন্ন অর্থনৈতিক সংগঠন বিশেষ করে আমাদের গ্রামীণ ব্যাংক এবং আমাদের যে কর্মসংস্থান ব্যাংক আছে এগুলি থেকে তাকে কিভাবে অর্থনৈতিক সহযোগিতা দেওয়া যায় সে ব্যাপারে ইতোমধ্যে আমরা আলোচনা করেছি। 

এ দিকে সুবর্ণচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আকিব ওসমান বলেন, চর আমানউল্লাহ ইউনিয়নের একজন তরুণ উদ্যোক্তা, আমাদের পরিবেশে প্রাপ্ত খুবই একটি সহজলভ্য উপাদান কচুরিপানা এবং কলাগাছ থেকে সুতা তৈরির এক উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন প্রযুক্তির গত ব্যবহারের মাধ্যমে। এটি অত্যন্ত আশাব্যাঞ্জক একটি খবর। আমরা সুবর্ণচর উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ওনাকে শুভেচ্ছা জানাই, অভিনন্দন জানাই। 

তিনি বলেন, এ ধরনের যারা তরুণ উদ্যোক্তা আছে, যারা নতুন করে কিছু করার চেষ্টা করছেন তাদেরকে উৎসাহিত করবে।আর যারা এ ধরনের উদ্যোগকে নিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে চান, ব্যবসায়ী বিনিয়োগ করতে চান এবং যাদের বিনিয়োগ করার প্রয়োজন আছে, যাদের অর্থের প্রয়োজন আছে, আমরা উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান, সরকারি ব্যাংক যেগুলো আছে যারা বিনিয়োগ করতে লোন দিতে আগ্রহী, সে ধরনের প্রতিষ্টানের পিছনে আমরা অবশ্যই ভূমিকা রাখবো।


বিপ্লবী বার্তা

প্রকাশক
শেখ মাহমুদ উজ্জ্বল
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক
কাইয়ুম তালুকদার (কানন)
উপদেষ্টা সম্পাদক
ড. জাহিদ আহমেদ চৌধুরী

কপিরাইট © ২০২৬ । বিপ্লবী বার্তা