বিপ্লবী বার্তা

মূল পাতা

শিক্ষাঙ্গন

সংগ্রামের দুই দশক পেরিয়ে

আধুনিক ক্যাম্পাসের পথে কুবি

আধুনিক ক্যাম্পাসের পথে কুবি

একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গল্প শুধু ইট-পাথরের ভবন কিংবা শ্রেণিকক্ষের গল্প নয়, সেটি সময়ের সঙ্গে বদলে যাওয়া একটি ইতিহাসও। সেখানে থাকে সংগ্রাম, সীমাবদ্ধতা, অর্জন এবং ভবিষ্যতের স্বপ্ন। হাঁটি হাঁটি পা করে ২০ বছর পেরিয়ে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় এখন পা রাখছে ২১ বছরে। ছোট পরিসরের এক নবীন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ধীরে ধীরে একটি বিস্তৃত ও আধুনিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রূপ নেওয়ার গল্প যেন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরো পথচলা।

তবে কুমিল্লায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার হাতেখড়ি হুট করে দু-এক বছরের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। জানা যায়, ১৯৬০-এর দশকেই কুমিল্লায় দেশের তৃতীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা ছিল। প্রয়োজনীয় প্রস্তুতিও এগিয়েছিল অনেক দূর। কিন্তু তৎকালীন রাজনৈতিক বাস্তবতায় সেই পরিকল্পনা আর বাস্তবে রূপ পায়নি। ১৯৬৪ সালে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হয় ঠিকই, তবে সেটা কুমিল্লার পরিবর্তে প্রতিষ্ঠিত হয় চট্টগ্রামে, যা বর্তমানে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় নামে পরিচিত।

বহুদিনের আন্দোলন ও দাবির পর অবশেষে ২০০৬ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার হাত ধরে স্থাপিত হয় কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তিপ্রস্তর। একই বছরের ৮ই মে জাতীয় সংসদে আইন পাসের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়টির আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠা সম্পন্ন হ। এরপরে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। ২০০৭ সালের ২৮ মে সাতটি বিভাগ, ১৫ জন শিক্ষক এবং প্রায় ৩০০ শিক্ষার্থী নিয়ে শুরু হয় পুরোদমে অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম।

শুরুর কুবি ছিল সীমিত পরিসরের। প্রায় ৫০ একরের ছোট একটি ক্যাম্পাসেই পরিচালিত হতো শিক্ষার্থীদের ক্লাস, প্রশাসনিক কার্যক্রম এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা। সময়ের সঙ্গে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়লেও জায়গার সীমাবদ্ধতা দীর্ঘদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম বড়ো চ্যালেঞ্জ হয়ে ছিল। ক্লাসরুম সংকট, আবাসন সংকট এবং পরিবহন সমস্যা মাথায় নিয়েই প্রতিষ্ঠার ২০ বছর পেরিয়ে ২১তম বছরে পা রাখছে বিশ্ববিদ্যালয়টি।

তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলেছে দৃশ্যপট। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ে রয়েছে ৬টি অনুষদের অধীনে ১৯টি বিভাগ। শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব ১১টি নীল বাস এবং বিআরটিসির ১০টি বাসসহ মোট ২০টি বাস চলাচল করছে। এছাড়া শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য রয়েছে আলাদা পরিবহন ব্যবস্থা এবং জরুরি স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে রয়েছে দুটি অ্যাম্বুলেন্স।

আবাসন ব্যবস্থাতেও এসেছে পরিবর্তন। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য পাঁচটি আবাসিক হল রয়েছে। ছাত্রদের জন্য শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত হল, বিজয়-২৪ হল এবং কবি কাজী নজরুল ইসলাম হল; ছাত্রীদের জন্য রয়েছে নওয়াব ফয়জুন্নেসা চৌধুরানী হল এবং সুনীতি শান্তি হল। পাশাপাশি শিক্ষকদের জন্য রয়েছে ডরমেটরি সুবিধা।

অ্যাকাডেমিক কার্যক্রমের পাশাপাশি গবেষণা ও প্রযুক্তি উদ্ভাবনের ক্ষেত্রেও নিজেদের সক্ষমতার পরিচয় দিয়েছে কুবি। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের তৈরি কথা বলা রোবট ‘সিনা’, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক রোবট ‘নিকো’ এবং ‘ব্লুবেরি’ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রযুক্তি চর্চার সক্ষমতার উদাহরণ হয়ে উঠেছে।

শুধু শিক্ষাব্যবস্থা নয়, সাংগঠনিক ও সহশিক্ষা কার্যক্রমেও সময়ের সঙ্গে সমৃদ্ধ হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়টি। ক্যাম্পাসে গড়ে উঠেছে থিয়েটার কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়, ডান্স ক্লাব, ফিল্ম সোসাইটি, বৃত্ত কুবি, অনুপ্রাস কণ্ঠচর্চা কেন্দ্র, সংগীত বিষয়ক 'প্ল্যাটফর্ম', সায়েন্স ক্লাব, প্রকৃতিবিষয়ক সংগঠন ‘অভয়ারণ্য’, স্বেচ্ছাসেবী রক্তদাতা সংগঠন ‘বন্ধু’, কুবি ছায়া জাতিসংঘ, রোভার স্কাউট, বিএনসিসি, ডিবেটিং সোসাইটি। এদের পাশাপাশি বিদ্যালয়ের সংবাদকে দেশব্যাপী ছড়িয়ে দিতে রয়েছে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় রিপোর্টার্স ইউনিটি, সাংবাদিক সমিতি, প্রেস ক্লাবের মতো পেশাদার সাংবাদিক সংগঠন। এসব সংগঠন শিক্ষার্থীদের শুধু পাঠ্যবইয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখেনি; বরং তাদের ব্যক্তিত্ব, নেতৃত্ব এবং সৃজনশীলতা বিকাশের ক্ষেত্রেও রাখছে ব্যাপক ভূমিকা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাডেমিক যাত্রার গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলকগুলোর একটি ছিল সমাবর্তন আয়োজন। প্রতিষ্ঠার প্রায় ১৪ বছর পর ২০২০ সালের ২৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হয় কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম সমাবর্তন। দীর্ঘ অপেক্ষার পর আয়োজিত এই সমাবর্তনে প্রায় ২ হাজার ৮৮৮ জন শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করেন এবং কৃতী শিক্ষার্থীদের স্বর্ণপদক প্রদান করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে দিনটি ছিল শিক্ষার্থী ও সাবেক শিক্ষার্থীদের জন্য এক আবেগঘন মুহূর্ত।

বিশ্ববিদ্যালয়ের বয়স বাড়ার সাথে সাথে পাল্লা দিয়ে পরিবর্তিত হয়েছে প্রশাসনিক নেতৃত্বও। প্রতিষ্ঠার পর থেকে এখন পর্যন্ত মোট ৯ জন উপাচার্য দায়িত্ব পালন করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন অধ্যাপক ড. গোলাম মাওলা। বিভিন্ন সময়ে দায়িত্ব পালনকারী উপাচার্যরা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাডেমিক সম্প্রসারণ, প্রশাসনিক কার্যক্রম এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্বে রয়েছেন অধ্যাপক ড. এম এম শরীফুল করীম।

তবে এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে বড়ো আলোচনার বিষয় অতীত নয়, বরং ভবিষ্যৎ। পুরোনো সীমাবদ্ধতাকে পেছনে ফেলে লালমাই পাহাড়ের পাদদেশে গড়ে উঠছে বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্প্রসারিত নতুন ক্যাম্পাস।

২০১৮ সালে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্প্রসারণ ও অধিকতর উন্নয়নের জন্য প্রায় ১ হাজার ৬৫৫ কোটি ৫০ লাখ টাকার মেগা প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে বাস্তবায়নাধীন এই প্রকল্পের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের আয়তন ৫০ একর থেকে বেড়ে প্রায় ২৪৪ দশমিক ১৯ একরে উন্নীত হচ্ছে।

নির্মাণাধীন নতুন ক্যাম্পাসে থাকছে চারটি ১০ তলাবিশিষ্ট অ্যাকাডেমিক ভবন, প্রশাসনিক ভবন, চারটি ১০ তলাবিশিষ্ট আবাসিক হল, শিক্ষক আবাসন, ডরমেটরি, ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র, আন্তর্জাতিক কমপ্লেক্স, মেডিক্যাল ও ডে-কেয়ার সেন্টার, স্পোর্টস কমপ্লেক্স, জিমনেসিয়াম, কেন্দ্রীয় মসজিদ এবং আধুনিক গবেষণাগারসহ প্রয়োজনীয় প্রায় সকল সুযোগ-সুবিধা। আগামী ২০২৭ সালের জুনের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে সেনাবাহিনী কর্তৃক নতুন ক্যাম্পাস হস্তান্তরের কথা রয়েছে। 

বিশ্ববিদ্যালয় দিবস উপলক্ষ্যে উপাচার্য ড. এম. এম. শরীফুল করিম বলেন, 'প্রতিষ্ঠার পর থেকে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা, গবেষণা, সংস্কৃতি ও সহশিক্ষা কার্যক্রমে ধারাবাহিকভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন সময়ের চ্যালেঞ্জ ও সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে বিশ্ববিদ্যালয় আজ একটি সম্ভাবনাময় উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অবকাঠামোগত উন্নয়ন, অ্যাকাডেমিক কার্যক্রমের সম্প্রসারণ, গবেষণার সুযোগ বৃদ্ধি এবং শিক্ষার্থীদের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অর্জন বিশ্ববিদ্যালয়ের অগ্রযাত্রাকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।'

তিনি আরও বলেন, 'আমার নীতি হলো ‘স্টুডেন্ট ফার্স্ট’। শিক্ষার্থীদের স্বার্থ, সুযোগ-সুবিধা এবং তাদের সার্বিক উন্নয়নকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েই বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম পরিচালিত হবে। শিক্ষার্থীরাই বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল শক্তি এবং তাদের জন্য একটি ইতিবাচক, মানসম্পন্ন ও শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করাই আমাদের প্রধান লক্ষ্য।

তিনি বলেন, 'বিশ্ববিদ্যালয়ের চলমান উন্নয়ন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে নতুন ক্যাম্পাস বাস্তবায়নের বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন, গবেষণাবান্ধব ও শিক্ষার্থীবান্ধব পরিবেশ তৈরির মাধ্যমে নতুন ক্যাম্পাস বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণার পরিধি আরও বিস্তৃত করবে। সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় আগামী দিনে দেশের অন্যতম শীর্ষ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে।'

একসময় যে বিশ্ববিদ্যালয়টি সীমিত জায়গার মধ্যে নিজেদের জায়গা খুঁজছিল, আজ সেই বিশ্ববিদ্যালয়ই নতুন পরিচয়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই যাত্রা শুধু অবকাঠামোর সম্প্রসারণের গল্প নয়; এটি সীমাবদ্ধতা থেকে সম্ভাবনায় পৌঁছানোরও গল্প। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কুবি শুধু আয়তনে বড় হয় নি, বড় হয়েছে স্বপ্নেও।

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়

আপনার মতামত লিখুন

বিপ্লবী বার্তা

বৃহস্পতিবার, ২৮ মে ২০২৬


আধুনিক ক্যাম্পাসের পথে কুবি

প্রকাশের তারিখ : ২৮ মে ২০২৬

featured Image

একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গল্প শুধু ইট-পাথরের ভবন কিংবা শ্রেণিকক্ষের গল্প নয়, সেটি সময়ের সঙ্গে বদলে যাওয়া একটি ইতিহাসও। সেখানে থাকে সংগ্রাম, সীমাবদ্ধতা, অর্জন এবং ভবিষ্যতের স্বপ্ন। হাঁটি হাঁটি পা করে ২০ বছর পেরিয়ে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় এখন পা রাখছে ২১ বছরে। ছোট পরিসরের এক নবীন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ধীরে ধীরে একটি বিস্তৃত ও আধুনিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রূপ নেওয়ার গল্প যেন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরো পথচলা।

তবে কুমিল্লায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার হাতেখড়ি হুট করে দু-এক বছরের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। জানা যায়, ১৯৬০-এর দশকেই কুমিল্লায় দেশের তৃতীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা ছিল। প্রয়োজনীয় প্রস্তুতিও এগিয়েছিল অনেক দূর। কিন্তু তৎকালীন রাজনৈতিক বাস্তবতায় সেই পরিকল্পনা আর বাস্তবে রূপ পায়নি। ১৯৬৪ সালে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হয় ঠিকই, তবে সেটা কুমিল্লার পরিবর্তে প্রতিষ্ঠিত হয় চট্টগ্রামে, যা বর্তমানে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় নামে পরিচিত।

বহুদিনের আন্দোলন ও দাবির পর অবশেষে ২০০৬ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার হাত ধরে স্থাপিত হয় কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তিপ্রস্তর। একই বছরের ৮ই মে জাতীয় সংসদে আইন পাসের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়টির আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠা সম্পন্ন হ। এরপরে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। ২০০৭ সালের ২৮ মে সাতটি বিভাগ, ১৫ জন শিক্ষক এবং প্রায় ৩০০ শিক্ষার্থী নিয়ে শুরু হয় পুরোদমে অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম।

শুরুর কুবি ছিল সীমিত পরিসরের। প্রায় ৫০ একরের ছোট একটি ক্যাম্পাসেই পরিচালিত হতো শিক্ষার্থীদের ক্লাস, প্রশাসনিক কার্যক্রম এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা। সময়ের সঙ্গে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়লেও জায়গার সীমাবদ্ধতা দীর্ঘদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম বড়ো চ্যালেঞ্জ হয়ে ছিল। ক্লাসরুম সংকট, আবাসন সংকট এবং পরিবহন সমস্যা মাথায় নিয়েই প্রতিষ্ঠার ২০ বছর পেরিয়ে ২১তম বছরে পা রাখছে বিশ্ববিদ্যালয়টি।

তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলেছে দৃশ্যপট। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ে রয়েছে ৬টি অনুষদের অধীনে ১৯টি বিভাগ। শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব ১১টি নীল বাস এবং বিআরটিসির ১০টি বাসসহ মোট ২০টি বাস চলাচল করছে। এছাড়া শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য রয়েছে আলাদা পরিবহন ব্যবস্থা এবং জরুরি স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে রয়েছে দুটি অ্যাম্বুলেন্স।

আবাসন ব্যবস্থাতেও এসেছে পরিবর্তন। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য পাঁচটি আবাসিক হল রয়েছে। ছাত্রদের জন্য শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত হল, বিজয়-২৪ হল এবং কবি কাজী নজরুল ইসলাম হল; ছাত্রীদের জন্য রয়েছে নওয়াব ফয়জুন্নেসা চৌধুরানী হল এবং সুনীতি শান্তি হল। পাশাপাশি শিক্ষকদের জন্য রয়েছে ডরমেটরি সুবিধা।

অ্যাকাডেমিক কার্যক্রমের পাশাপাশি গবেষণা ও প্রযুক্তি উদ্ভাবনের ক্ষেত্রেও নিজেদের সক্ষমতার পরিচয় দিয়েছে কুবি। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের তৈরি কথা বলা রোবট ‘সিনা’, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক রোবট ‘নিকো’ এবং ‘ব্লুবেরি’ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রযুক্তি চর্চার সক্ষমতার উদাহরণ হয়ে উঠেছে।

শুধু শিক্ষাব্যবস্থা নয়, সাংগঠনিক ও সহশিক্ষা কার্যক্রমেও সময়ের সঙ্গে সমৃদ্ধ হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়টি। ক্যাম্পাসে গড়ে উঠেছে থিয়েটার কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়, ডান্স ক্লাব, ফিল্ম সোসাইটি, বৃত্ত কুবি, অনুপ্রাস কণ্ঠচর্চা কেন্দ্র, সংগীত বিষয়ক 'প্ল্যাটফর্ম', সায়েন্স ক্লাব, প্রকৃতিবিষয়ক সংগঠন ‘অভয়ারণ্য’, স্বেচ্ছাসেবী রক্তদাতা সংগঠন ‘বন্ধু’, কুবি ছায়া জাতিসংঘ, রোভার স্কাউট, বিএনসিসি, ডিবেটিং সোসাইটি। এদের পাশাপাশি বিদ্যালয়ের সংবাদকে দেশব্যাপী ছড়িয়ে দিতে রয়েছে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় রিপোর্টার্স ইউনিটি, সাংবাদিক সমিতি, প্রেস ক্লাবের মতো পেশাদার সাংবাদিক সংগঠন। এসব সংগঠন শিক্ষার্থীদের শুধু পাঠ্যবইয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখেনি; বরং তাদের ব্যক্তিত্ব, নেতৃত্ব এবং সৃজনশীলতা বিকাশের ক্ষেত্রেও রাখছে ব্যাপক ভূমিকা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাডেমিক যাত্রার গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলকগুলোর একটি ছিল সমাবর্তন আয়োজন। প্রতিষ্ঠার প্রায় ১৪ বছর পর ২০২০ সালের ২৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হয় কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম সমাবর্তন। দীর্ঘ অপেক্ষার পর আয়োজিত এই সমাবর্তনে প্রায় ২ হাজার ৮৮৮ জন শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করেন এবং কৃতী শিক্ষার্থীদের স্বর্ণপদক প্রদান করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে দিনটি ছিল শিক্ষার্থী ও সাবেক শিক্ষার্থীদের জন্য এক আবেগঘন মুহূর্ত।

বিশ্ববিদ্যালয়ের বয়স বাড়ার সাথে সাথে পাল্লা দিয়ে পরিবর্তিত হয়েছে প্রশাসনিক নেতৃত্বও। প্রতিষ্ঠার পর থেকে এখন পর্যন্ত মোট ৯ জন উপাচার্য দায়িত্ব পালন করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন অধ্যাপক ড. গোলাম মাওলা। বিভিন্ন সময়ে দায়িত্ব পালনকারী উপাচার্যরা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাডেমিক সম্প্রসারণ, প্রশাসনিক কার্যক্রম এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্বে রয়েছেন অধ্যাপক ড. এম এম শরীফুল করীম।

তবে এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে বড়ো আলোচনার বিষয় অতীত নয়, বরং ভবিষ্যৎ। পুরোনো সীমাবদ্ধতাকে পেছনে ফেলে লালমাই পাহাড়ের পাদদেশে গড়ে উঠছে বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্প্রসারিত নতুন ক্যাম্পাস।

২০১৮ সালে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্প্রসারণ ও অধিকতর উন্নয়নের জন্য প্রায় ১ হাজার ৬৫৫ কোটি ৫০ লাখ টাকার মেগা প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে বাস্তবায়নাধীন এই প্রকল্পের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের আয়তন ৫০ একর থেকে বেড়ে প্রায় ২৪৪ দশমিক ১৯ একরে উন্নীত হচ্ছে।

নির্মাণাধীন নতুন ক্যাম্পাসে থাকছে চারটি ১০ তলাবিশিষ্ট অ্যাকাডেমিক ভবন, প্রশাসনিক ভবন, চারটি ১০ তলাবিশিষ্ট আবাসিক হল, শিক্ষক আবাসন, ডরমেটরি, ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র, আন্তর্জাতিক কমপ্লেক্স, মেডিক্যাল ও ডে-কেয়ার সেন্টার, স্পোর্টস কমপ্লেক্স, জিমনেসিয়াম, কেন্দ্রীয় মসজিদ এবং আধুনিক গবেষণাগারসহ প্রয়োজনীয় প্রায় সকল সুযোগ-সুবিধা। আগামী ২০২৭ সালের জুনের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে সেনাবাহিনী কর্তৃক নতুন ক্যাম্পাস হস্তান্তরের কথা রয়েছে। 

বিশ্ববিদ্যালয় দিবস উপলক্ষ্যে উপাচার্য ড. এম. এম. শরীফুল করিম বলেন, 'প্রতিষ্ঠার পর থেকে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা, গবেষণা, সংস্কৃতি ও সহশিক্ষা কার্যক্রমে ধারাবাহিকভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন সময়ের চ্যালেঞ্জ ও সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে বিশ্ববিদ্যালয় আজ একটি সম্ভাবনাময় উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অবকাঠামোগত উন্নয়ন, অ্যাকাডেমিক কার্যক্রমের সম্প্রসারণ, গবেষণার সুযোগ বৃদ্ধি এবং শিক্ষার্থীদের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অর্জন বিশ্ববিদ্যালয়ের অগ্রযাত্রাকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।'

তিনি আরও বলেন, 'আমার নীতি হলো ‘স্টুডেন্ট ফার্স্ট’। শিক্ষার্থীদের স্বার্থ, সুযোগ-সুবিধা এবং তাদের সার্বিক উন্নয়নকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েই বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম পরিচালিত হবে। শিক্ষার্থীরাই বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল শক্তি এবং তাদের জন্য একটি ইতিবাচক, মানসম্পন্ন ও শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করাই আমাদের প্রধান লক্ষ্য।

তিনি বলেন, 'বিশ্ববিদ্যালয়ের চলমান উন্নয়ন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে নতুন ক্যাম্পাস বাস্তবায়নের বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন, গবেষণাবান্ধব ও শিক্ষার্থীবান্ধব পরিবেশ তৈরির মাধ্যমে নতুন ক্যাম্পাস বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণার পরিধি আরও বিস্তৃত করবে। সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় আগামী দিনে দেশের অন্যতম শীর্ষ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে।'

একসময় যে বিশ্ববিদ্যালয়টি সীমিত জায়গার মধ্যে নিজেদের জায়গা খুঁজছিল, আজ সেই বিশ্ববিদ্যালয়ই নতুন পরিচয়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই যাত্রা শুধু অবকাঠামোর সম্প্রসারণের গল্প নয়; এটি সীমাবদ্ধতা থেকে সম্ভাবনায় পৌঁছানোরও গল্প। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কুবি শুধু আয়তনে বড় হয় নি, বড় হয়েছে স্বপ্নেও।


বিপ্লবী বার্তা

প্রকাশক
শেখ মাহমুদ উজ্জ্বল
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক
কাইয়ুম তালুকদার (কানন)
উপদেষ্টা সম্পাদক
ড. জাহিদ আহমেদ চৌধুরী

কপিরাইট © ২০২৬ । বিপ্লবী বার্তা