বিপ্লবী বার্তা
এক সময় যে নদী ছিল উত্তাল, যার স্রোতের গর্জনে আঁতকে উঠতো তীরবর্তী হাজারও মানুষ। সেই চিরচেনা ধরলা ও বারোমাসিয়া নদীর এখন রূপ পাল্টে গেছে। জলবায়ুর পরিবর্তন আর পলি জমার কারণে নদীর নাব্য হ্রাস পাওয়ায় জেগে উঠেছে প্রায় আড়াই শতাধিক চর। এতে জীব বৈচিত্র্যের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। তবে ধু-ধু বালুচরে এখন দোল খাচ্ছে কৃষকের স্বপ্ন। নদীর বুক জুড়ে এখন সবুজের সমারোহ।
সরেজমিনে দেখা গেছে, দেশের উত্তরের জেলা কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ীতে খরস্রোতা ধরলা-বারোমাসিয়া, নীলকমল নদীসহ বিভিন্ন নদ-নদীর বুকে জেগে ওঠা চরগুলোতে চাষিরা বোরো, ভুট্টা, তামাকসহ নানামুখী ফসল উৎপাদন করে জীবন জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন। এ সব নদীর বুকে জেগে ওঠা চরাঞ্চলের চারিদিকে সবুজ ফসলেই ভরে গেছে। এ যেন সবুজের এক সমারোহ। ধরলা-বারোমাসি নদীর পানি না থাকায় মানুষজন পায়ে হেঁটে পাড়াপাড় করছেন নদী পাড়ের চাষিরা।
শুধু ধরলা বা বারোমাসি নদীতে নয়, এই দুই নদী সংলগ্ন নীলকমলসহ আশপাশের সকল নদ-নদীর বুকেও শতশত বিঘা জমিতে কৃষকরা ১২ থেকে ১৫ বছর ধরে বোরো, ভুট্টা, তামাক, বাদামসহ নানামূখী ফসল চাষাবাদে জীবন জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন।
প্রতি বছর এসব নদ-নদীর বুকে চাষাবাদ করে কৃষকদের মাঝে স্বস্তি ফিরে আসলেও নদীতে নাব্যতা সংকট দেখা দেওয়ায় ইঞ্জিনচালিত নৌকা বা ডিঙি নৌকা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহকারী জেলে পরিবারগুলো কঠিন দুশ্চিন্তায় পড়েছেন। ধরলাসহ বিভিন্ন নদ-নদীতে বোয়াল, কাতলা, রুই, টেংরা, কর্তি, ভেটকি, বৈরালীসহ নানান প্রজাতির মাছ শিকার করে তারা জীবন-জীবিকা নির্বাহ করতেন। পানি প্রবাহ না থাকায় এসব মাছের দেখা পাচ্ছেন না জেলেরা।
ধরলা পাড়ের সোনাইকাজী এলাকার কৃষক আলতাফ হোসেন ও মজিবর রহমানসহ অনেকেই জানান, এক সময় এই ধরলা নদীই আমাদের ঘর-বাড়ি, আবাদি জমি-জমাসহ সব কিছুই গিলে নিয়েছে। বহু মানুষ ধরলার তীব্র ভাঙনে নিঃস্ব হয়েছেন। সেই ধরলা নদী এখন শুকিয়ে গেছে। নেই আগের মতো রুপ যৌবন। আমরা প্রতি বছর ধরলার বুকে জেগে উঠা পলিমাটিতে বোরো চাষাবাদ করেছি। এবারো গত বছরের মতো প্রতি বিঘায় ২৫ থেকে ২৮ মণ ধান ঘরে তুলতে পারবো বলে আমাদের বিশ্বাস। তার আরও জানান, প্রত্যেকেই চার বিঘা বোরো ও তিন বিঘা ভুট্টা চাষ করে জীবন জীবিকা নির্বাহ করে আসছি। তবে এ বছর খরচটা অনেক বেশি হয়েছে। ধান ও ভুট্টার দাম ভাল না থাকলে আমাদের চাষিদের লোকসান গুনতে হবে।
একই এলাকার ইউপি সদস্য মজসেদ আলী জানান, প্রায় ১০ থেকে ১৫ বছর ধরে ধরলার বুকে বোরো, ভুট্টার চাষাবাদ করে আসছি। প্রতি বছরেই বোরো ও ভুট্টার ভালো ফলন হয়ে আসছে। আশা করছি এবছরও ভালো ফলন হবে।
বারোমাসিয়া নদী সংলগ্ন জ্যোতিন্দ্র নারায়ণ এলাকার ভুট্টা চাষি আমজাদ হোসেন, রশিদ মিয়া, চান মিয়া ও আব্দুল মজিদ জানান, বারোমাসিয়া নদীর বুকে ভুট্টা চাষাবাদ করেছেন। তারা প্রত্যেকে চার থেকে পাঁচ বিঘা জমিতে ভুট্টার চাষ করেন। আবহাওয়া অনুকূল থাকায় এবছরও বাম্পার ফলন ও ভালো দামের আশা করছেন।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোছা. নিলুফা ইয়াছমিন জানান, চলতি মৌসুমে উপজেলায় বোরো চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১০ হাজার ২০৫ হেক্টর। এ যাবদ পর্যন্ত অর্জন হয়েছে ১০ হাজার ৫০। এর মধ্যে ধরলা-বারোমাসিয়া ও নীলকমল নদীর অববাহিকায় বোরো চাষাবাদ হয়েছে ১২ হেক্টর। সেই সাথে পুরো উপজেলায় ২ হাজার ২৬৫ হেক্টর জমিতে ভুট্টা চাষাবাদ হয়েছে এবং ধরলা-বারোমাসিয়া ও নীলকমল নদীর বুকে ১ হাজার ২৫০ হেক্টর জমিতে ভুট্টা এবং তামাক ৪ হেক্টর চাষাবাদ করেছেন কৃষকরা। তিনি আরও গত বছরের ন্যায় এ বছর বোরো ও ভুট্টাসহ বিভিন্ন ফসলের ফলন ভালোই দেখা যাচ্ছে। আশা করা যাচ্ছে আবহাওয়া অনুকূল থাকলে চাষিরা বাম্পার ফলন ঘরে তুলতে পারবে। সেই সঙ্গে ভালো দামেও পাবে বলে আমার বিশ্বাস।

