আস্থার সংকটে পরাজয়: চুয়াডাঙ্গায় দুটি আসনে বিএনপির ঘাটিতে ধস
ছবিঃ বিপ্লবীবার্তা

টানা প্রায় পনেরো বছর ক্ষমতার বাইরে থাকার পর নতুন উদ্দীপনায় ঘুরে দাড়ানোর প্রত্যাশা ছিল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল এর চুয়াডাঙ্গা নেতাকর্মীদের মধ্যে। জেলার দুই সংসদীয় আসন ঘিরে তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত তৈরি হয়েছিল আশাবাদের আবহ। কিন্তু ভোটের চূড়ান্ত ফলাফল সেই আশায় জল ঢেলে দিয়েছে। নির্বাচনী মাঠের হিসাব-নিকাশ বলছে, জনসমর্থনের ঘাটতির চেয়ে বেশি ক্ষতি করেছে অভ্যন্তরীণ কোন্দল, বিতর্কিত মুখের সক্রিয়তা, দেরিতে প্রার্থী ঘোষণা এবং সাংগঠনিক শৈথিল্য।


নাম প্রকাশ্যে অনিচ্ছুক অনেক কর্মীরা মন্তব্য চুয়াডাঙ্গা দীর্ঘদিন ধরেই বিএনপির ঘাটি হিসেবে পরিচিত। কিন্তু বাস্তবতা হলো,জেলা সম্মেলন হলেও পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনে দীর্ঘসূত্রতা, নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব এবং ব্যক্তি-অভিমান দলীয় কাঠামোকে ভেতর থেকে দুর্বল করেছে। নির্বাচনের সময় এই ভাঙন স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বিভক্ত গ্রুপগুলোকে এক ছাতার নিচে আনার উদ্যোগ দৃশ্যমান ছিল না। ফলে অনেক প্রভাবশালী পরিবার ও নীরব কর্মী মাঠে সক্রিয় হননি।


চুয়াডাঙ্গা-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য প্রয়াত সহিদুল ইসলাম বিশ্বাসের পরিবারের সদস্য ও কেন্দ্রীয় কৃষক দলের নেতা মিলিমা ইসলাম বিশ্বাস অভিযোগ করেন, স্থানীয়ভাবে বিতর্কিত ও চাদাবাজির অভিযোগে অভিযুক্ত কিছু ব্যক্তিকে নির্বাচনী প্রচারে সামনে আনা হয়েছিল। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এসব মুখের কারণে সাধারণ ভোটারের মধ্যে আস্থাহীনতা তৈরি হয়। এমনকি তার পরিবারের ওপর হামলা-ভাঙচুরের অভিযোগ থাকলেও দলীয়ভাবে দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় ক্ষোভ বাড়ে।


২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পালাবদলের পর জেলার রাজনীতিতে যে শূন্যতা তৈরি হয়, তা পূরণে বিএনপি দ্রুত সাংগঠনিকভাবে গুছিয়ে উঠতে পারেনি,এমন মত জেলা নেতাদেরই। অভিযোগ রয়েছে, ওই সময়ের কিছু বেপরোয়া কর্মকাণ্ড চাদাবাজি, দখল ও প্রভাব বিস্তার, পরবর্তী নির্বাচনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। ভোটারদের একটি অংশ মনে করেছে, শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় দল কঠোর হয়নি।


জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ মিল্টন বলেন, প্রতিপক্ষ অনেক আগেই প্রার্থী ঘোষণা করে মাঠে কাজ শুরু করলেও বিএনপি প্রার্থী চূড়ান্ত করতে দেরি করেছে। এতে সমন্বয় গড়ে তোলার সময় কমে যায়। তার মতে, ভোটারদের মনোভাব সঠিকভাবে অনুধাবন করতে না পারা ছিল বড় ভুল।


চুয়াডাঙ্গা-১ আসনে শরীফুজ্জামান শরীফ এবং চুয়াডাঙ্গা-২ আসনে বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান (বাবু) প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। দলীয় ভেতরে অনেকে মনে করছেন, প্রার্থী নির্ধারণে স্থানীয় বাস্তবতা ও তৃণমূলের মতামত যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি। বিশেষ করে চুয়াডাঙ্গা-১ আসনে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস বা ‘ওভার কনফিডেন্স’ নির্বাচনী কৌশলে ঢিলেঢালা ভাব তৈরি করে। এছাড়া, নিষ্ক্রিয় বা অভিমানী নেতাকর্মীদের শেষ মুহূর্তে আস্থায় না এনে দায়িত্ব বণ্টনে সীমাবদ্ধতা রাখা হয়। এতে ভোটের দিন মাঠপর্যায়ের ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা তৈরি হয়।


চুয়াডাঙ্গার ভোটাররা এবার দলীয় পরিচয়ের চেয়ে প্রার্থীর ভাবমূর্তি ও সংগঠনের শৃঙ্খলাকে গুরুত্ব দিয়েছেন। যেসব এলাকায় বিতর্কিত ব্যক্তিরা প্রচারে সক্রিয় ছিলেন, সেখানে বিএনপির ভোট প্রত্যাশার তুলনায় কমেছে বলে স্থানীয় সূত্রের দাবি।


আরও একটি বিষয় সামনে এসেছে, দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকায় তৃণমূলের আর্থিক ও সাংগঠনিক সক্ষমতা কমে গেছে। প্রতিদ্বন্দ্বী পক্ষ আগে থেকেই শক্ত ঘাটি তৈরি করায় বিএনপিকে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে বেগ পেতে হয়েছে।


চুয়াডাঙ্গার দুই আসনে পরাজয় বিএনপির জন্য কেবল নির্বাচনী ব্যর্থতা নয়; এটি সাংগঠনিক পুনর্গঠনের জরুরি সংকেত,এমন মত দলীয় অভ্যন্তরেই জোরালো হচ্ছে। জেলা পর্যায়ে পূর্ণাঙ্গ কমিটি, শৃঙ্খলা জোরদার, বিতর্কিত মুখের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা এবং তৃণমূলকে ঐক্যবদ্ধ করা,এসব না হলে ভবিষ্যৎ নির্বাচনে ঘুরে দাড়ানো কঠিন হবে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।


সব মিলিয়ে, জনপ্রিয়তার দাবি থাকলেও বাস্তবের নির্বাচনী গণিতে বিএনপি চুয়াডাঙ্গায় হোচট খেয়েছে নিজের ঘরের দুর্বলতায়। এখন প্রশ্ন,এই ফলাফল কি আত্মসমালোচনার পথ খুলে দেবে, নাকি পুরোনো দ্বন্দ্বই ভবিষ্যতের পথ রুদ্ধ করবে?