শীত মৌসুম এলেই গ্রামবাংলার মাঠগুলোতে মুগ্ধতা ছড়ায় হলুদে রঙের সরিষা ক্ষেত। সরিষার ফুলে ভরে ওঠা এসব মাঠে এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন মৌচাষিরা। আধুনিক পদ্ধতিতে সরিষা ক্ষেতে স্থাপন করা বক্সে উৎপাদিত হচ্ছে শতভাগ খাঁটি ও প্রাকৃতিক মধু সংগ্রহ করছেন। এতে যেমন বাড়তি আয় হচ্ছে কৃষকদের, তেমনি পরিবেশবান্ধব এই উদ্যোগে উৎসাহিত হচ্ছেন নতুন নতুন উদ্যোক্তারা।
সরেজমিনে দেখা গেছে, উপজেলার সদর ইউনিয়নের তুরা রোড সংলগ্ন এলাকায়, ফুলবাড়ি এলাকায়, বড়াইবাড়ি এলাকায় ও বন্দবেড় ইউনিয়নের মদাব্যাপারীর ঘাট এলাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় বক্স বসিয়েছেন মৌ খামারী। এসব এলাকার সরিষা ক্ষেতের পাশে সারিবদ্ধভাবে বসানো হয়েছে মৌমাছির বক্স, ফুলের মধু সংগ্রহে ব্যস্ত মৌমাছিরা। দিনভর উড়ে বেড়াচ্ছে মাঠ জুড়ে। এসব মৌচাক থেকে সংগ্রহ করা মধু স্বাদ, গুণগত মান ও পুষ্টিগুণে বাজারের সাধারণ মধুর চেয়ে অনেক উন্নত বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
রৌমারী সদর ইউনিয়নের তুরা রোডের পাশে মৌ বক্সা বসিয়েছেন সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর থেকে আসা রাজু মিয়া।
তিনি বলেন, এই এলাকায় এসেছেন ডিসেম্বরের তিন তারিখে। তিনি সরিষা খেতর ১২০টি বক্সা বসিয়ে মধু সংগ্রহ করছেন।
আবহাওয়া ভালো থাকলে প্রতি সপ্তাহে বক্স খোলা যায়। আর আবহাওয়া খারাপ থাকলে মধু উৎপাদন কমে যায় আবার কিছু মৌমাছি মারাও যায়। এসব মধু সংগ্রহ করা হলে বাইরের ব্যবসায়ী প্রতিমাসে এসে নিয়ে যান। এছাড়ার খুচরা বাজারে প্রতি কেজি মধু ৪০০ থেকে সাড়ে ৪০০ টাকায় বিক্রি করা হয়।
তিনি জানান, সরিষা ফুলের মধু সবচেয়ে খাঁটি ও সুগন্ধি। কোনো কেমিক্যাল ব্যবহার ছাড়াই প্রাকৃতিক ভাবে মধু উৎপাদন করা যায়।
অল্প বিনিয়োগের মাধ্যমে ভালো লাভ করা যায়। বর্তমানে তার সহযোগী হিসাবে একজন লোক রয়েছেন। তাকে প্রতিমাস বেতন দিতে হয় ১০ হাজার টাকা।
একই এলাকায় শাহাজাহানের বাড়ির পাশে বক্স বসিয়ে মধু আহরণ করছেন সাতক্ষীরা জেলার ম্যামনগরের সুমন ইসলাম। তিনি জানান, প্রায় মাস খানেক আগে এখানে এসেছেন। আবহাওয়া ভালো না থাকার কারনে এ পর্যন্ত মধু সংগ্রহ করতে পারেননি। তবে আশা করছেন অল্প দিনের মধ্যে মধু সংগ্রহ করবেন বলে জানান ওই মৌ খামারী।
তুরা রোডের পাশে মৌ বক্স বসিয়েছেন কুমিল্লা শহরের সাকিব। তিনি বলেন, তিনি ২৮টি বক্স বসিয়ে মধু সংগ্রহ করছেন। আবহাওয়া খারাপ থাকলে বক্স থেকে মৌমাছি বের হয় না। এ কারনে মধু উৎপাদনও কম হয়। তবে কয়েকদিন পর আবহাওয়া ভালো হলে উৎপাদন বাড়বে।
সাতক্ষীরার শ্যামনগরের রয়েল আহমেদ মধু সংগ্রহ করতে বক্স বসিয়েছেন রৌমারীর বন্দবেড় ইউনিয়নের মদাব্যাপারীর ঘাট এলাকায়।
তিনি জানান এই এলাকায় এসেছেন নভেম্বরের ২৭ তারিখে। তিনি প্রায় ৮০টি বক্স বসিয়ে মধু সংগ্রহ করছেন। আবহাওয়ার খারাপ থাকায় একবার দুই মণ মধু সংগ্রহ করতে পরেছেন তিনি। এলাকায় এসব মধু প্রতি কেজি ৪০০-৫০০ টাকা দরে বিক্রি করেছেন। যদি আবহাওয়া ভালো থাকলে আরও বেশি দামে বিক্রি করা যেতো। একই কথা বলেন, ওই এলাকার রাস্তা পাশে মৌ বক্সা বসানো সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর থেকে আসা শুভ আহমেদ।
রৌমারী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কাইয়ুম চৌধুরীর বলেন, এই উপজেলায় চার হাজার ৮০০ হেক্টর জমিতে সরিষার চাষ করা হয়েছে। এ পর্যন্ত উপজেলার ১৬ এলাকায় দুই হাজার ৬০টি মৌ চাষে বক্স স্থাপন করেছেন চাষিরা। মধু চাষ করে একদিকে যেমন লাভবান হচ্ছেন চাষিরা, অন্যদিকে মৌমাছি সরিষার পরাগায়ণে পরোক্ষভাবে সহায়তা করে। মৌমাছির মাধ্যমে সরিষার ফলনও ১০-২০ শতাংশ বেড়ে যায় বলেও জানান তিনি।

