জুলাই বিপ্লবে ছাত্রবিরোধী ৮ শিক্ষককে সিনেটে আমন্ত্রণ, উত্তপ্ত চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী পর্ষদ ৩৬তম বার্ষিক সিনেট সভাকে কেন্দ্র করে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে চবি ক্যাম্পাস। ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ঐতিহাসিক আন্দোলনের সময় শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে মৌন মিছিলে অংশ নেওয়া আওয়ামীপন্থী ৮ জন বিতর্কিত অধ্যাপকসহ অন্যান্য আওয়ামীপন্থী সিনেট সদস্যদের এই অধিবেশনে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানানোর ঘটনায় ক্যাম্পাসে তীব্র ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।প্রশাসনের এই পদক্ষেপের প্রতিবাদে এবং ফ্যাসিস্টের দোসর শিক্ষকদের সিনেটে প্রবেশ ঠেকাতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (চাকসু), জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল, জাতীয় ছাত্রশক্তি এবং ‘ভয়েস অব স্টুডেন্টস’ একযোগে রাজপথে নেমে ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক ও প্রতিবাদী কর্মসূচি পালন করেছে।জুলাই-আগস্টের রক্তাক্ত গণঅভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতার ওপর চালানো গণহত্যার পক্ষে অবস্থান নিয়ে যেসব শিক্ষক চবি ক্যাম্পাসে মৌন মিছিল করেছিলেন, তারা হলেন- ফরেস্ট্রি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সেস ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মো. দানেশ মিয়া, ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. অলক পাল, পাবলিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (লোকপ্রশাসন) বিভাগের অধ্যাপক সিরাজ উদ দৌল্লাহ, একই বিভাগের অধ্যাপক ড. খসরুল আলম কুদ্দুসী, আইন বিভাগের অধ্যাপক এ. বি. এম. আবু নোমান, ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক ড. সুকান্ত ভট্টাচার্য, পদার্থবিজ্ঞান (ফিজিক্স) বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ নাসিম হাসান এবং ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মাহবুবুল হক। শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা ও নিপীড়নের সমর্থক হিসেবে পরিচিত এসব শিক্ষকের সিনেট সভায় যোগদানের খবর ছড়িয়ে পড়লে ক্ষোভে ফেটে পড়ে সাধারণ শিক্ষার্থীরা।ঘোষিত সময়সূচি অনুযায়ী শনিবার বেলা ১১টায় চবির বার্ষিক সিনেট সভা শুরু হওয়ার কথা ছিল। তবে এর আগেই সকাল সাড়ে ১০টা থেকে চবি প্রশাসনিক ভবনের মূল ফটকের সামনে অবস্থান কর্মসূচি শুরু করে শাখা ছাত্রদল ও শাখা ছাত্রশক্তির বিপুল সংখ্যক নেতা-কর্মী। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তড়িঘড়ি করে ছাত্রনেতাদের সাথে আলোচনায় বসে। পরে মৌন মিছিলে অংশ নেওয়া বিতর্কিত শিক্ষকরা কোনোভাবেই সিনেট অধিবেশনে অংশ নেবেন না বলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে লিখিত ও মৌখিক প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়।চবি শাখা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ আল নোমান বলেন, "চবির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম সিনেটে ফ্যাসিবাদের সহযোগী দোসর শিক্ষকদের অংশগ্রহণের বিষয়টি জানতে পেরে আমরা সাথে সাথেই অবস্থান কর্মসূচি পালন করার ঘোষণা দিই। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের সাথে আমাদের ফলপ্রসূ কথা হয়েছে। তারা আমাদের স্পষ্ট ভাষায় আশ্বস্ত করেছেন যে, জুলাই আন্দোলনে হামলা ও মৌন মিছিলে অংশ নেওয়া কোনো শিক্ষকই এই সিনেটে অংশ নিতে পারবেন না। প্রশাসনের আশ্বাসের প্রেক্ষিতে আমরা সাময়িকভাবে কর্মসূচি স্থগিত করেছি।"তবে প্রশাসনের কেবল আশ্বাসে সন্তুষ্ট না হয়ে চবি প্রশাসনিক ভবনের সামনে অবস্থান কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার শক্ত ঘোষণা দেয় শাখা ছাত্রশক্তি। সংগঠনটির শাখা সাধারণ সম্পাদক মো. ইসমাইল নিজেদের কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়ে বলেন, "শিক্ষার্থীদের রক্তে রঞ্জিত জুলাই আন্দোলনের বিরোধিতাকারী কোনো ফ্যাসিস্ট শিক্ষক যেন আমাদের বাইপাস করে কোনোভাবেই সিনেট ভবনে প্রবেশ করতে না পারে, তা নিশ্চিত করতেই আমরা আমাদের অবস্থান কর্মসূচি নিরবচ্ছিন্নভাবে চালিয়ে যাব।"অন্যদিকে, ফ্যাসিবাদের দোসরদের উপস্থিতি এবং শিক্ষার্থীদের প্রত্যক্ষ গণতান্ত্রিক প্রতিনিধিত্ব না থাকার প্রতিবাদ জানিয়ে আয়োজিত সিনেট অধিবেশন সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করে আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলন করেছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (চাকসু)।সংবাদ সম্মেলনে চাকসুর ভিপি ইব্রাহিম হোসেন রনি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের অপকৌশলের তীব্র সমালোচনা করে বলেন, "বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ এই নীতিনির্ধারণী ফোরামে নিয়ম অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের নির্বাচিত ৫ জন সিনেট প্রতিনিধির অংশ নেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু দুঃখজনকভাবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন অপকৌশল অবলম্বন করে চাকসু ও সিনেট নির্বাচন ঝুলিয়ে রেখেছে, যার ফলে শিক্ষার্থীরা তাদের মৌলিক গণতান্ত্রিক প্রতিনিধিত্ব থেকে চরমভাবে বঞ্চিত হচ্ছে। একদিকে শিক্ষার্থীদের বাদ দেওয়া হয়েছে, আর অন্যদিকে গত ১৭ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনের সুবিধাভোগী শিক্ষক, জুলাই-আগস্টে শিক্ষার্থীদের ওপর গণহত্যার সমর্থনে মৌন মিছিল করা শিক্ষক এবং খুনি হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনার চক্রান্তে লিপ্ত শিক্ষকদের নিয়ে এই সিনেট সভার আয়োজন করা হয়েছে। এই অনৈতিক সিনেট অধিবেশন চাকসু সম্পূর্ণভাবে বয়কট ও প্রত্যাখ্যান করছে।"একই সংবাদ সম্মেলনে চাকসুর পক্ষ থেকে শিক্ষার্থীদের মৌলিক অধিকার ও চবির সার্বিক উন্নয়নের লক্ষে এক খোলা চিঠির মাধ্যমে ১৯ দফা সুনির্দিষ্ট দাবি উপস্থাপন করা হয়। চাকসুর দাবিগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- অবিলম্বে পরবর্তী চাকসু, হল সংসদ ও সিনেট নির্বাচনের জন্য বাজেট বরাদ্দ ও বার্ষিক পরিচালন বাজেট নিশ্চিতকরণ; সকল আবাসিক হল সংস্কার ও আধুনিকায়ন; আলাওল ও এ. এফ. রহমান হলের এক্সটেনশন ভবন দ্রুত নির্মাণ; ক্যাম্পাসের আবাসন সক্ষমতা ৩০ শতাংশে উন্নীত করা এবং আবাসন সংকটে থাকা ৩ হাজার শিক্ষার্থীকে মাসিক আবাসন ভাতা প্রদান; যাতায়াত ব্যবস্থার উন্নয়নে নতুন শাটল ট্রেন ও অতিরিক্ত বগি সংযোজন এবং শহরগামী অন্তত ১০টি বাস চালু করা; ক্যাম্পাসে বিশ্বমানের টিএসসি-মুক্তমঞ্চ, কেন্দ্রীয় অডিটোরিয়াম, আধুনিক স্টেডিয়াম ও আধুনিক কেন্দ্রীয় মসজিদ নির্মাণ; সব ক্লাসরুম ও ডিজিটাল লাইব্রেরি আধুনিকায়নের পাশাপাশি হাই-স্পিড ইন্টারনেট সুবিধা নিশ্চিত করা; কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি ও হলের রিডিং রুম শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত (এসি) করা; চবি মেডিকেল সেন্টারকে পূর্ণাঙ্গ ৩০ শয্যার হাসপাতালে রূপান্তর ও পাঁচটি নতুন অ্যাম্বুলেন্স প্রদান; ছাত্রী জিমনেসিয়াম ও বিশেষায়িত টার্ফ নির্মাণ; গবেষণা খাতে অর্থ বরাদ্দ বহুগুণ বৃদ্ধি; সম্পূর্ণ একাডেমিক অটোমেশন দ্রুত সম্পন্ন করা; নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সার্বক্ষণিক সিসিটিভি ও পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা; ভর্তুকি দিয়ে কেন্দ্রীয় ক্যাফেটেরিয়ায় স্বল্পমূল্যে মানসম্মত খাবার নিশ্চিতকরণ; চবির প্রতিনিধিত্বকারী আহত খেলোয়াড়দের চিকিৎসা সহায়তা এবং বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের জন্য পূর্ণাঙ্গ মানসিক স্বাস্থ্য কাউন্সিল/সেন্টার পরিচালনা ও স্বতন্ত্র বাজেট বরাদ্দ করা।একই সময়ে প্রশাসনিক ভবনের সামনে বেলা ১১টায় জুলাই আন্দোলনের বিরোধী শিক্ষক ও ফ্যাসিবাদী দোসরদের নিয়ে সিনেট সভা করার প্রতিবাদে ব্যানার ও প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন কর্মসূচি নিয়ে উপস্থিত হন সাধারণ শিক্ষার্থীদের প্ল্যাটফর্ম 'ভয়েস অব স্টুডেন্টস'-এর নেতা-কর্মীরা। তারা বিতর্কিত শিক্ষকদের সিনেটে প্রবেশের বিরুদ্ধে নানা স্লোগান দেন। একপর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা সেখানে এসে আন্দোলনকারীদের আশ্বস্ত করেন যে অভিযুক্ত কোনো শিক্ষক সিনেট কক্ষে প্রবেশ করবেন না। প্রশাসনের এই সুস্পষ্ট অঙ্গীকারের পর ভয়েস অব স্টুডেন্টসের নেতৃবৃন্দ তাদের প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন ও প্রতিবাদ কর্মসূচি সাময়িকভাবে স্থগিত ঘোষণা করেন।